Published : 23 Jun 2026, 02:06 PM
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারে পালাবদলের দেড় মাসের মধ্যেই কলকাতার একটি উল্লেখযোগ্য রাস্তার নাম বদলে দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে, পার্ক সার্কাসের সেভেন পয়েন্ট থেকে ডন বস্কো সার্কেল পর্যন্ত ৫০০ মিটার দীর্ঘ রাস্তাটি এতদিন সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ নামে পরিচিত ছিল। কলকাতা পুরসভা সেই রাস্তার নাম পাল্টে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’ করেছে।
পুরসভার ওই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেছেন, এটি শুধুমাত্র নাম পরিবর্তন নয়, ইতিহাসের এক ‘গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন’।
এক এক্স পোস্টে শুভেন্দু লিখেছেন, “পশ্চিমবঙ্গ দিবসের পবিত্র লগ্নে কলকাতা পুরসভা যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমি তার ভূয়সী প্রশংসা করছি। অতীতে ঘটে যাওয়া একটি ঐতিহাসিক অবিচার সংশোধনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
“কয়েক দশক ধরে কলকাতার একটি প্রধান রাস্তার নাম এমন একজনের নামে ছিল, যিনি নিছক রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন।”
শুভেন্দু যার দিকে ইঙ্গিত করেছেন, তিনি অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। পরে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।
১৯৪৬ সালের ভয়াবহ দাঙ্গার সময়ে সোহরাওয়ার্দীই প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দাঙ্গা থামাতে ব্যর্থতার জন্য ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ তকে দায়ী করে থাকেন। আর হিন্দুত্ববাদীরা সোহরাওয়ার্দীকে বলে 'কলকাতার কসাই'।
অন্যদিকে যার নামে সড়কটির নতুন নাম হয়েছে, সেই গোপালচন্দ্র মুখার্জি অনেকের কাছে ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে পরিচিত, কারণ পেশায় তিনি ছিলেন একজন মাংস বিক্রেতা। ছেচল্লিশের দাঙ্গার সময় তিনি চরমপন্থি হিন্দুদের একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন।
সে সময় মুসলমানদের হত্যার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে ছিল। এখন বিজেপি তাকে নানাভাবে জনপ্রিয় করার চেষ্টা চালাচ্ছে। শুভেন্দুর দাবি, সেই দাঙ্গার সময় হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের প্রাণ বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিলেন গোপাল।
তিনি লিখেছেন, সময় এসেছে ভুল সংশোধন করে পশ্চিমবঙ্গের ‘প্রকৃত নায়কদের’ স্মরণ করার। তবে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহল ও ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ এক এক্স পোস্টে লিখেছেন, “আমার মনে হয়, কলকাতা পুরসভা বড় ভুল করেছে। রাস্তাটি ড. স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামে, যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য, একজন প্রখ্যাত ফিজিশিয়ান, শিক্ষাবিদ। ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের মুখ্য় স্বাস্থ্য আধিকারিক ছিলেন। রাজনীতিতেও যোগ দিয়েছিলেন, বাংলার বিধান পরিষদের সদস্য হন। আর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তদানীন্তন প্রশাসনের প্রধান।”
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ড. সোহরাওয়ার্দীর ভাইপো জানিয়ে দুজনের ছবিও পোস্ট করেছেন কুণাল।
তিনি লিখেছেন, “সম্মানীয় মুখ্যমন্ত্রীর উচিত বিষয়টি যাচাই করে দেখা। সেই মতো রেকর্ড দেখতে বলা উচিত কলকাতা পুরসভাকে। ভুলবশত যদি ভাইপোর জন্য কাকাকে শাস্তি দেওয়া হয়, তা দুর্ভাগ্যজনক হবে। নতুন যে নামটি আনা হয়েছে, তা নিয়ে কিছু বলার নেই আমার। কিন্তু যে কারণ দেখিয়ে নামটি মোছা হল, তা ঠিকভাবে বিবেচনা করে দেখা উচিত। দু'জনের ছবি দিয়ে দিলাম।”
আনন্দবাজার লিখেছে, হাসান সোহরাওয়ার্দী ১৯৩০ সালের ৮ অগাস্ট থেকে ১৯৩৪ সালের ৭ অগাস্ট পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। বাংলার গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে বাঁচাতে স্বাধীনতা সংগ্রামী বীণা বসুর হাত থেকে তিনি অস্ত্র কেড়ে নিয়েছিলেন। সেই কারণে ১৯৩২ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে ‘নাইট’ উপাধি দেয়।
কলকাতার ইতিহাস গবেষক গৌতম বসুমল্লিকের দাবি, ১৯৩৩ সালের ২০ এপ্রিল কলকাতা পুরসভা একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে ওই রাস্তার নামকরণ করে ‘সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ’।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক অমিত দেও বলছেন, যার নামে রাস্তা, তিনি অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নন।
“তিনি শিক্ষাবিদ এবং বহু ভাষাবিদ হাসান সোহরাওয়ার্দী। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন।’’
হাসান সোহরাওয়ার্দী ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম উপাচার্য। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের দ্বিতীয় মুসলিম ব্যক্তি হিসেবে ইংল্যান্ডের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনসের ফেলো নির্বাচিত হন।
শিক্ষাক্ষেত্রের পাশাপাশি তিনি বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। ১৯২৩ থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত তিনি কাউন্সিলের ডেপুটি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।
কলকাতার পার্ক সার্কাস ও কসাইপাড়া লেইনকে যুক্ত করা ওই সড়কেই ছিল তার বাসভবন। ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে ওই বাড়ি ছিল ভারতের বহু রাজনৈতিক নেতার আড্ডাস্থল। সেখানে এখন রয়েছে কলকাতায় বাংলাদেশ উপদূতাবাসের গ্রন্থাগার ও তথ্য কেন্দ্র।
তবে আনন্দবাজার লিখেছে গৌতম বসুমল্লিক বা অমিত দের দাবি নিয়েও সংশয় রয়েছে। জীবদ্দশাতেই হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামে কলকাতার রাস্তার নামকরণ হয়েছিল, এ তত্ত্ব অনেকে মানছেন না।
সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়, ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসাবে কাজ করে আসা অধ্যাপক সোমা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো আরও অনেকে উপাচার্য হয়েছেন। তাদের সকলের নামে কি একটি করে রাস্তা রয়েছে? বেছে বেছে একজন সোহরাওয়ার্দীর নামেই রাস্তার নামকরণ কেন? আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ছিলাম। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোনও নথি খুঁজে পাইনি, যাতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তাব গ্রহণ করেছে যে, এই উপাচার্যের নামে রাস্তা হওয়া উচিত।’’
তবে বিভ্রান্তি এর পরেও যাচ্ছে না। কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন আধিকারিক, পথের নামকরণ উপদেষ্টা পরিষদের প্রাক্তন সদস্য অজিতকুমার বসু কলকাতার নথিপত্র নিয়ে গবেষণার পর একটি বই প্রকাশ করেন।
‘কলিকাতার রাজপথ/ সমাজে ও সংস্কৃতিতে’ নামের সেই বইয়ে তিনি ১৯৩৩ সালের যে লিখিত প্রস্তাবের কথা বলেছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে— মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সোহরাওয়ার্দীর নামে ওই রাস্তার নামকরণ হয়েছিল।
আনন্দবাজার লিখেছে, ওবায়দুল্লাহ সোহরাওয়ার্দীও একজন শিক্ষাবিদ এবং হাসান বা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সম্ভবত তারই বংশধর। ফলে ওই সড়কের নাম আসলে কার নামে ছিল, সেই ধন্ধ মিটছে না।