Published : 31 Dec 2025, 08:17 AM
বিশ্বজুড়ে সংঘাত আরও বেড়েছে ২০২৫ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ বছরই বিভিন্ন অঞ্চলে রেকর্ড সংখ্যক সংঘাতের সাক্ষী হয়েছে বিশ্ব। তাতে বেড়েছে অস্থিরতা।
গাজা, ইউক্রেইন ও সুদান ছিল এ বছর বড় সংঘাতের কেন্দ্র। পাশাপাশি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো (ডিআরসি), মিয়ানমার এবং কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তেও উত্তেজনাও উত্তাপ ছড়িয়েছে।
চতুর্থ বছরে প্রবেশ করেছে রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ। এই যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেও হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে রাশিয়া।
ইসরায়েল-ইরানের সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করে যুক্তরাষ্ট্র এবছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। ভেনেজুয়েলার নৌযানগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে, গাজায় ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ আবসানে একটি যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানো গেলেও থামেনি রক্তক্ষয়।
দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা উত্তেজনার জেরে বছরের মাঝামাঝি সময়ে কয়েকটি সংক্ষিপ্ত লড়াইয়ের সূচনা হয়।
মে মাসে ভারত-পাকিস্তান, জুনে ইরান-ইসরায়েল এবং জুলাইয়ে কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ডের মধ্যে সংঘাত তীব্র হয়। মাঝখানে যুদ্ধবিরতির পর বছরের শেষ দিকে ডিসেম্বরে আবার দুই দেশের কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়।
বাংলাদেশ, আর্মেনিয়া, বুলগেরিয়া, ডি আর কঙ্গো, একুয়েডর, ফ্রান্স, জর্জিয়া, জার্মানি, হাইতি, পেরু, সোমালিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া এ বছরও ছিল অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়ুন সুক ইয়লকে গ্রেপ্তার ও অভিশংসনের মাধ্যমে পদ থেকে সরানো হয়।

জিন-জির নেতৃত্বে এবছর প্রতিবাদের ঢেউও দেখেছে বিশ্ব। বিক্ষোভের মুখে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ দেখেছে- আলজেরিয়া, বুলগেরিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশও। নেপাল ছাড়াও মাদাগাস্কারে সরকারের পতন ঘটেছে।
আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও জার্মানির মত অনেকগুলো দেশে নতুন নেতা ক্ষমতায় এসেছেন। জাপান ও নামিবিয়ায় প্রথম নারী সরকারপ্রধান অভিষিক্ত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতা নিয়েছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ক্ষমতায় ফেরার প্রথম ১০০ দিনেই বিশ্বকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছেন একের পর এক পদক্ষেপ নিয়ে। এর মধ্যে কয়েক দফায় চড়া শুল্ক আরোপ আর স্থগিত করে সব দেশকে তিনি ব্যতিব্যস্ত করে রাখেন।
অধিকাংশ দেশের ওপর বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করে বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে টালমাটাল অবস্থার সৃষ্টি করেন ট্রাম্প। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধ নতুন মাত্রা পায়।
বছরের শেষে এসেও মার্কিন–চীন বাণিজ্যযুদ্ধ শেষ হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মার্কিন চ্যাটজিটিপির চীনা প্রতিদ্বন্দ্বী ডিপসিকের চ্যাটবট বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলেছে এ বছর।

ট্রাম্পের শুল্কবোমা
২১ জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফেরার পর প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প নজিরবিহীন বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেন। তাতে গত ১০০ বছরের মধ্যে বিশ্ব বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়।
বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রে তাদের রপ্তানিপণ্যের ওপর শুল্কের চাপে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই এই হার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
জুলাই মাসের শেষ দিকে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ডজনখানেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে অন্যায্য বাণিজ্যনীতির মাধ্যমে ফাঁসিয়েছে। সে কারণে তাদের ওপর নতুন শুল্কারোপ হবে। অগাস্টে সেই শুল্ক কার্যকর হয়।
বলিভিয়া, একুয়েডর, আইসল্যান্ড, নাইজেরিয়াসহ অনেক দেশের শুল্কহার দাঁড়ায় ১৫ শতাংশ। আবার শ্রীলঙ্কা, তাইওয়ান ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর শুল্ক দাঁড়ায় ২০ শতাংশে। এই শুল্কের কোপে ছিল বাংলাদেশও।
অন্য দেশগুলোর মধ্যে- পাকিস্তানের ওপর ১৯ শতাংশ, আফগানিস্তানের ওপর ১৫, ইন্দোনেশিয়ার ওপর ১৯, মালয়েশিয়ার ওপর ১৯, মিয়ানমারের ওপর ৪০, ফিলিপিন্সের ওপর ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প।
সবচেয়ে বেশি উচ্চ শুল্কের কোপ পড়ে যাদের ওপর, তার মধ্যে ব্রাজিল ছিল অন্যতম, শুল্ক ছিল ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে, শুরুতে ভারতের জন্য শুল্কহার ছিল ২৫ শতাংশ।
কিন্তু রাশিয়ার তেল কেনার কারণ দেখিয়ে পরে তা দ্বিগুণ করা হয়। যেসব দেশকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি, তাদের ওপরও একচেটিয়া ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প।
গত এপ্রিলে সব দেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপের পর তিন মাসের জন্য তা স্থগিত করেছিলেন ট্রাম্প। শুরুতে ‘৯০ দিনে ৯০ চুক্তি’ করতে চেয়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত তা পূরণ না হলেও কিছু প্রাথমিক সমঝোতা করতে সক্ষম হন তিনি। বিশেষত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে। একই ধরনের চুক্তি হয় যুক্তরাজ্য, ভিয়েতনাম, ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়া ও জাপানের সঙ্গে।
চীন দীর্ঘদিন ধরেই ছিল ট্রাম্পের লক্ষ্যবস্তু। প্রথমেই তিনি ফেন্টানিল পাচার ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগে বেইজিংকে শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত শতকরা ১৪৫ ভাগ শুল্কারোপ করে চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যযুদ্ধে জড়ান তিনি। চীনের বিভিন্ন পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ হওয়ার পর চীনও আমদানি করা মার্কিন পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক বসায়।
ফলে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে শুরু হয় বাণিজ্যযুদ্ধ। তবে শুল্কবোমা দিয়ে চীনের প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমাতে পারলেও যুক্তরাষ্ট্র সামগ্রিকভাবে তেমন একটা সুবিধা করে উঠতে পারেনি এবার।
কারণ বাস্তবতা হচ্ছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর আগেই যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি কমতির দিকে ছিল। পরের কয়েক মাসে সেই পতন আরও তীব্র হয়েছে। কিন্তু চীন অন্যভাবে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য কমে গেলেও চলতি বছর চীনের মোট রপ্তানি বেড়েছে অনেকটাই। কারণ, চীন শুধু রপ্তানির ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্য আননি, বরং আমদানিতেও নতুন উৎস খুঁজেছে। মার্কিন পণ্যের বিকল্প হিসেবে অন্যান্য দেশ থেকে পণ্য আমদানি বাড়িয়েছে দেশটি।
কানাডার শুল্ক এবছর বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশে, আগে ছিল ২৫ শতাংশ। কানাডাও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। ওদিকে, মেক্সিকোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা ২৫ শতাংশ শুল্ক ৯০ দিন পর্যন্ত অপরিবর্তিত রাখা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র তাদের আমদানি করা সব পণ্যের ওপর বড় আকারে শুল্ক আরোপ করায় বিশ্বজুড়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবছর।
তবে ট্রাম্পের দাবি ছিল, তিনি বিশ্বে আটটি যুদ্ধের পাঁচটিই থামিয়েছেন শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে। তিনি বলেছিলেন, শুল্ক নীতিই তার প্রশাসনের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্ত্র।
মাত্র ১০ মাসে ৮ যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। এর মধ্যে ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক হুমকি ‘ধ্বংস’, গাজার যুদ্ধে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা’ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ‘৩ হাজার বছরের মধ্যে প্রথম শান্তি’ আনার দাবি করেছেন।

সংঘাত দেশে দেশে
২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে সশস্ত্র সংঘাতের তীব্রতা বেড়েছে। দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত-পাকিস্তান- দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ বেধে যাওয়া নিয়ে বিশ্বে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা তৈরি হয়েছিল গত মে মাসে।
ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় ইসরায়েলি বিমান হামলার মধ্য দিয়ে গত জুনের সংঘাত নতুন মাত্রা পায়। রুয়ান্ডা এবং ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোয় প্রায় এক দশক শান্তি বিরাজ করলেও তার ব্যাঘাত ঘটে চলতি বছর।
সে সময় রুয়ান্ডা সমর্থিত এম ২৩ সশস্ত্র গোষ্ঠী কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে হামলা শুরু করে। জুলাইয়ে সংঘাত শুরু হয় থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে। ডিসেম্বরে আবার দুই দেশ সংঘর্ষে জড়ায়। ওদিকে, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে সর্বসাম্প্রতিক সংঘাত শুরু হয়ে ১৯ সেপ্টেম্বর।
আজারবাইজান বাহিনী ছিটমহল পুনর্দখলে বড় অভিযান শুরু করে এবং দ্রুততার সঙ্গে অভিযান শেষ করে। নীল নদের শাখা নদী ব্লু নাইল ড্যাম (বাধ) তৈরি করছে ইথিওপিয়া। এ নিয়ে যুদ্ধের মুখোমুখি হয় ইথিওপিয়া ও মিশর, এর মধ্যে পড়ে সুদানও।
গত শতকের ৯০'র দশকে বলকান যুদ্ধের কারণে সার্বিয়া-কসোভোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও ঘনীভূত হয়েছিল।
গাজা, ইউক্রেইন, সিরিয়া, মিয়ানমার এমনকি সিরিয়াতেও এবছর সশস্ত্র সংঘাত বাড়তে দেখা গেছে। বড় ধরনের সংঘাত হয়েছে পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মধ্যেও। এর মধ্যে বহু সংঘাতই থামানোর জন্য শান্তির অগ্রদূতের ভূমিকা নিতে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রকে।
বিশ্বব্যাপী এই সংঘাতগুলোর অন্তত সাতটি বন্ধের কৃতিত্ব নিজেকেই দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে বাস্তাবে দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য এলেও অনেক ক্ষেত্রেই সাফল্য রয়ে গেছে অধরা।
বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নীতি ও পদক্ষেপ (যেমন সামরিক হস্তক্ষেপ বা চাপ প্রয়োগ) বরং বিশ্বজুড়ে সংঘাতের তীব্রতা ও অস্থিরতা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।

গাজায় শান্তি কতদূর
ফিলিস্তিনের ছিটমহল গাজা এখনও বেসামরিক নাগরিকদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
২০২৫ সালে শুরুতে হওয়া একটি স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ফিলিস্তিনি ছিটমহলটিতে আবার তীব্র হামলা শুরু করে ইসরায়েল, যা ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করে।
ইসরায়েল-ইরান এবং ইসরায়েল ও লেবাননের হিজবুল্লাহর মধ্যে উত্তেজনার কারণে পুরো অঞ্চল বড় ধরনের সংকটের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
জানুয়ারির মাঝামাঝি ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস যুদ্ধ শেষ করার, ইসরায়েলি জিম্মি ও ফিলিস্তিনি বন্দি বিনিময় এবং গাজায় আন্তর্জাতিক ত্রাণ অনুমোদনের লক্ষ্যে একটি যুদ্ধবিরতির চুক্তি অনুমোদন করে।
১৯ জানুয়ারিতে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। কিন্তু ১৮ মার্চ অপ্রত্যাশিতভাবে ইসরায়েল আবার গাজায় হামলা শুরু করলে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ হয়।
৪ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে এক চুক্তির মধ্য দিয়ে গাজা ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নেবে আর মার্কিন সামরিক বাহিনী যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা পুনর্গঠনের দায়িত্বে থাকবে।
কিন্তু বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ১৮ মার্চ গাজায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও হামলা চালায় ইসরায়েল। এতে শিশুসহ অন্তত ৫৯১ জন নিহত হন। ফলে জানুয়ারিতে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে যায়।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ও অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধী বেনজামিন নেতানিয়াহু ৩ এপ্রিল এক রাষ্ট্রীয় সফরে বুদাপেস্টে গিয়ে নামার পর হাঙ্গেরি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত থেকে বের হয়ে যায়।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশে পদক্ষেপ নেয় তারা।
২২ অগাস্ট জাতিসংঘের খাদ্য নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক সংস্থা গাজা সিটির অনাহারের মাত্রা সর্বোচ্চ এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক স্তর পঞ্চম ধাপের বলে জানালে সেখানে দুর্ভিক্ষাবস্থা নিশ্চিত হয়।
আইপিসি জানায়, নগরীটিতে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ ‘অনাহার, চরম দৈন্যদশা ও মৃত্যুর’ মুখে আছে। ৯ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল কাতারের রাজধানী দোহায় হামাসের নেতৃবৃন্দের ওপর হামলা চালায়।
একই মাসের মাঝামাঝি জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েল গণহত্যা সংঘটিত করেছে।
২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া ফিলিস্তিনকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। একদিন পর ফ্রান্সও তাদের পথ অনুসরণ করেন।
১ অক্টোবর ইসরায়েল গাজার ফিলিস্তিনিদের জন্য অনেকগুলো নৌযানে করে জলপথে বহন করে আনা মানবিক ত্রাণবাহী বহর ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’কে আন্তর্জাতিক জলসীমায় আটকে দেয় আর ৪৭ দেশ থেকে আসা ৪৪৩ জন আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করে।
৯ অক্টোবর ইসরায়েল ও হামাস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রস্তাবিত ২০ দফা গাজা শান্তি চুক্তির প্রথম পর্ব মেনে নেয়, এতে পুরো দুই বছর ধরে সংঘাত চলার পর যুদ্ধবিরতির পথ খোলে।
এর পরদিন ১০ অক্টোবর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গাজায় যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। চুক্তি অনুযায়ী হামাস ১৩ অক্টোবর গাজা থেকে জীবিত ২০ ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার পর বিনিময়ে ইসরায়েল ২৫০ জন দণ্ডপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি বন্দি ও গাজা যুদ্ধ চলাকালে আটক আরও ১৭০০ ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেয়।
ট্রাম্পের প্রস্তাবে হওয়া যুদ্ধবিরতি এরপর থেকে অব্যাহত থাকলেও গাজায় ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা বন্ধ করেনি ইসরায়েল। ফলে যুদ্ধবিরতি নিয়ে একটি অস্বস্তি ও শঙ্কা রয়ে গেছে।

ইউক্রেইন যুদ্ধ চলছেই
ইউক্রেইনে যুদ্ধ ২০২৫ সালে চতুর্থ বছরে প্রবেশ করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ২০২৫ সালের প্রথম দশ মাসেই বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা ২০২৪ সালের পুরো বছরের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।
বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর নতুন করে বড় ধরনের হামলার ফলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ যুদ্ধ শেষ করার জন্য তার নিজস্ব ধরনে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন, যা নিয়ে তিনি বেশ আশাবাদী।
১৮ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ঘোষণা করেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্স্থাপন করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। সৌদি আরবে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চার ঘণ্টাব্যাপী একটি শীর্ষ সম্মেলন থেকে এ ঘোষণা আসে।
২৮ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। এই বৈঠকে ট্রাম্প ও ভ্যান্স জেলেনস্কির তীব্র সমালোচনা করেন, কথার বাণে জর্জরিত করে প্রায় অপদস্থ করেন।
কেন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেইনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে সমর্থন যোগাবে সেই প্রশ্ন তারা তোলেন এবং যুদ্ধ বন্ধ করার প্রস্তাব করেন। ফলে দেশ দুটির মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বেড়ে যায়।
পরের সপ্তাহে ৩ মার্চ ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেইনে সামরিক সহায়তা দেওয়া স্থগিত করে। এরপর ৩০ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেইন খনিজ সম্পদ চুক্তি স্বাক্ষর করে। এভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি নিজেদের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকারের বিনিময়ে প্রতিরক্ষা ও পুনর্গঠনে মার্কিন বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করে।
১ জুন ইউক্রেইন রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ‘অপারেশন স্পাইডারওয়েব’ নামের এক বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালায়। এই হামলায় রাশিয়ার বিমান বাহিনীর ৪০টিরও বেশি আকাশযান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১৫ অগাস্ট যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা রাজ্যের অ্যাঙ্করিজে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন। বৈঠকে তারা ইউক্রেইন যুদ্ধ কীভাবে শেষ করা যায় তার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেইন যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টায় কিইভকে ধারাবাহিকভাবে চাপে রেখেছে, আবার সময় সময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের পক্ষও নিয়েছে। এতে ইউক্রেইনে বেড়েছে রাশিয়ার হামলার তীব্রতা।
তবে ট্রাম্পের ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে বছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র নেটো সদস্যদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির অনুরূপ ইউক্রেইনকে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির প্রস্তাব দেয়। আর ইউক্রেইনও অবিলম্বে নেটোতে যোগ দেওয়া দাবি থেকে সরে আসে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, চূড়ান্ত চুক্তিতে রাশিয়া ইউক্রেইনের ক্ষেত্রে পশ্চিমা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং দেশটির ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের বিষয়টি মেনে নেবে।
কিন্তু ১৯ ডিসেম্বর বছর শেষের বার্ষিক সাংবাদিক সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে পুতিন, ইউক্রেইন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার দাবি করা শর্তগুলোর বিষয়ে আপসের কোনও প্রস্তাব দেননি। ফলে যুদ্ধ বন্ধে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এখনও ধরা দেয়নি।

ভারত-পাকিস্তান সংঘাত
পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা এখনও বিপজ্জনক পর্যায়েই রয়েছে। এবছর মে মাসে দুই দেশের মধ্যকার বড় ধরনের সংঘাত পুরোদস্তুর যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ায়।
ওই সময় জম্মু ও কাশ্মীরে জঙ্গি হামলার জের ধরে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ভারত। ৬ মে রাতে ২৫ মিনিট ধরে পাকিস্তানের নয়টি লক্ষ্যবস্তুতে ভারত হামলা চালায়, যেগুলোকে ‘সন্ত্রাসীদের আস্তানা’ বলেছে দেশটি।
প্রতিবাদে পাকিস্তানও গোলাবর্ষণসহ সামরিকভাবে জবাব দিয়েছে। কাশ্মীরের পেহেলগামে হামলায় ২৬ জনের প্রাণহানিকে কেন্দ্র করে ওই যুদ্ধের দামামা বেজে উঠে পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী দুই দেশে।
পাকিস্তান দাবি করেছে, তারা আকাশে যুদ্ধে ভারতের ৫টি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে, যার মধ্যে তিনটি ফ্রান্সের তৈরি রাফাল। নয়া দিল্লিও পাকিস্তানের ‘কিছু বিমান’ ভূপাতিত করার দাবি করেছে।
ইসলামাবাদ কোনও বিমান হারানোর কথা অস্বীকার করলেও বলেছে, তাদের একাধিক বিমানঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়ার মুখে থাকা এই সংঘাতের অবসান হয় এক যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে।
অকস্মাৎ ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুদেশের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। যুদ্ধরত দুই পক্ষের আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, দুদেশই অবিলম্বে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাতব্যাপী দীর্ঘ আলোচনার ফলে এটি সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেন ট্রাম্প।
এই হামলা চালানোর আগে ভারত একতরফাভাবে সিমলা চুক্তি ও সিন্ধু নদের পানি বণ্টন চুক্তি স্থগিত করে। যুদ্ধ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কার মুখে ১০ মে দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।

ইসরায়েল-ইরান সংঘাত
১৩ জুন ইরানের ডজনখানেক পারমাণবিক স্থাপনা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা এবং সামরিক কমান্ডারদের লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালায় ইসরায়েল।
তাতে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের প্রধান হোসেইন সালামিসহ বহু সামরিক কমান্ডার নিহত হন। ওই দিনই স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় ইসরায়েল লক্ষ্য করে দূরপাল্লার ‘শত শত’ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান। তেহরান দাবি করে, তারা ইসরায়েলের সামরিক-শিল্প কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালিয়েছে, যেগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করে।
ওই দিন থেকে পরদিন পর্যন্ত ইরান ও ইসরায়েল প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে থাকে। দুই দেশেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়; সাধারণ মানুষ ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
১৯৮০ এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর একদিনে এত বড় আক্রমণ আর দেখেনি ইরান।
দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি আক্রমণ অব্যাহত থাকার মধ্যেই ২২ জুন রাতে ইরানের ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইস্ফাহান পারমাণবিক কেন্দ্রে বি-৫২ বোমারু বিমান থেকে বাঙ্কার ব্লাস্টার বোমা হামলা চাললিয়ে সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করে যুক্তরাষ্ট্র।
এর জবাবে ২৩ জুন কাতার ও ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। ২৪ জুন ইরান ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। তার আগে দিয়ে ট্রাম্প এক পোস্টে জানিয়েছিলেন, ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি শুরু করবে।

সিরিয়ায় সহিংসতা
২০২৪ সালের শেষ দিকে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ায় রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। ক্ষমতার এই অনিশ্চয়তা দেশটিকে নতুন করে অস্থিরতা ও মানবিক সংকটের ঝুঁকিতে ফেলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত বৃদ্ধির পেছনে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক ও নেটো-রাশিয়া উত্তেজনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, সম্পদের সংকট, সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিস্তার এবং অবৈধ অস্ত্র প্রবাহও সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে। ১৩ জুলাই সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকায় সশস্ত্র দ্রুজদের সঙ্গে বেদুইন গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষ শুরু হয়।
এই সংঘর্ষের মধ্যে সেখানে ডিসেম্বরে মার্কিন বাহিনীর ওপরও প্রাণঘাতী হামলা হয়। হামলায় দুই মার্কিন সেনা ও একজন মার্কিন বেসামরিক দোভাষী নিহত হওয়ার ঘটনায় জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) হুঁশিয়ার করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
পরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী সিরিয়ায় আইএস লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। এসব হামলা সিরিয়ার বিস্তৃত বাদিয়া মরুভূমিতে আইএস এর ওপর পরিচালিত হয়েছে। এর মধ্যে হোমস, দেইর আজ জোর ও রাক্কা প্রদেশ ছিল। সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও আইএস এর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।

থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্ত সংঘর্ষ
২৪ জুলাই থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্ত বিরোধ বিস্তৃত হয়ে সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়। পরবর্তী চার দিন ধরে চলা এই সংঘাতে অন্তত ৩৯ জন নিহত ও এক লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প মালয়েশিয়ার সহায়তায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি করান। অক্টোবরে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। এর দুই সপ্তাহের মধ্যেই থাইল্যান্ড চুক্তি স্থগিত করে। এরপর ডিসেম্বরেই আবার সংঘর্ষ শুরু হয়।
এই সংঘর্ষেও দুই পক্ষ মিলিয়ে অন্তত ৩৬ জন নিহত ও বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেতকের ভাষ্য ছিল, “যুদ্ধবিরতি কাজ করছে না। এখন দায়িত্ব কম্বোডিয়ার।” এরপর পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে তা বছরের শেষ সময়ে এসেও স্পষ্ট হয়নি।

মিয়ানমারে সংঘাত
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে সংঘাত ও মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। ২০২৫ সালে দেশটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সংকটগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
বছরের প্রথম দিকে দেশটির জান্তা সরকার বিদ্রোহীদের কাছে অনেক ভূখণ্ড হারালেও শেষ দিকে সরকারি বাহিনী ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। ডিসেম্বরে মিয়ানমার জান্তা ভোট অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয় এবং তার আগে ব্যাপক ধরপাকড় ও নিপীড়ন চালায়।
নির্বাচনে জনগণকে ভোট দিতে বাধ্য করতে জান্তা সহিংসতা চালিয়েছে এবং ভয়ভীতিও প্রদর্শন করেছে বলে অভিযোগ আসে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ থেকে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার তুর্ক এর মতে, নির্বাচন ঘিরে স্পষ্টতই সহিংসতা ও দমন–পীড়নের পরিবেশ বিরাজ করেছে, যেখানে জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশ, সংগঠন বা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার প্রয়োগের কোনও পরিবেশ ছিল না।
আর্মেনিয়া-আজারবাইজান
নাগার্নো-কারাবাখ অঞ্চল নিয়ে দুদেশের মধ্যে প্রায় চল্লিশ বছর ধরে দ্বন্দ্ব চলছে। মার্চে দুই দেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা নাগার্নো-কারাবাখ নিয়ে এই দীর্ঘ সংঘাতের অবসান চায়।
এরপর গত ৮ অগাস্ট যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হোয়াইাট হাউজে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ৩৭ বছরের পুরনো নাগরনো-কারাবাখ বিরোধের অবসান হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তখন বলেন, কয়েক দশকের সংঘাতের পর আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান স্থায়ী শান্তির জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে দীর্ঘদিনের শত্রু দেশ দুটির মধ্যে চুক্তির সূক্ষ্ম নানা বিষয় এবং বাধ্যবাধকতার স্বরূপ অস্পষ্ট রয়ে গেছে।

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত সংঘর্ষ:
আফগানিস্তান সীমান্তের কাছে পাকিস্তানের একটি সামরিক পোস্টে গত ১৬ মার্চ ভোরে অজ্ঞাত জঙ্গিদের হামলায় সাত সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনার প্রতিক্রিয়া ১৮ মার্চ আফগানিস্তানে পাকিস্তানের জোড়া বিমান হামলায় ৪৫ জন নিহত হয়।
পাকিস্তানের বিমান হামলার জবাবে দেশটির সেনাবাহিনীর ওপর ভারি অস্ত্রের হামলা চালায় আফগান তালেবানের নিরাপত্তা বাহিনী। অক্টোবরে আবার দুই দেশ সীমান্তে ব্যাপক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
১২ অক্টোবর কাবুল দাবি করে, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের বাহিনীগুলোর মধ্যে সীমান্তে রাতভর গোলাগুলির সময় তারা ৫৮ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছে।
আগের সপ্তাহে পাকিস্তানের চালানো বিমান হামলার প্রতিশোধ নিতে এই পাল্টা হামলা চালানো হয় বলে কাবুলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়। পরদিন সীমান্তে দুই দেশের বাহিনীগুলো ব্যাপক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
সংঘর্ষ বিস্তৃত হওয়ার মুখে সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলেও দুপক্ষের মধ্যে কোনও শান্তিচুক্তি হয়নি। গত বছর তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে থাকা দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত উত্তেজনার একটি উৎস হয়ে উঠেছে।
পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, তালেবান ক্ষমতায় আসার পর আফগানিস্তানে অবস্থান নিয়ে থাকা জঙ্গিরা নতুন উদ্যমে পাকিস্তানে হামলা শুরু করেছে। অপরদিকে, কোনও জঙ্গিকে আশ্রয় দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন আফগানিস্তানের কর্মকর্তারা।

সুদানে রক্তক্ষয়ী সংঘাত
২০২৫ সালের এপ্রিলে তৃতীয় বছরে গড়িয়েছে সুদানের গৃহযুদ্ধ। সরকারি বাহিনী সুদানিজ আর্মড ফোর্সেস (এসএএফ) ও বিদ্রোহী আধা সামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়েই মূলত এ গৃহযুদ্ধ।
এই সংঘাত এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় উদ্বাস্তু সংকটে পরিণত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, কোটি মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। কিছু এলাকায় গণহত্যার আশঙ্কার কথাও বলছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
গত ২৬ অক্টোবর গৃহযুদ্ধকবলিত সুদানের এল ফাশের শহরে এক নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটে। দেশটির আধা-সামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) প্রায় ২৫০০ বা আরও বেশি বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে।
আল–ফাশের ছিল সুদানের সরকারি সেনাদের সর্বশেষ শক্তিশালী ঘাঁটি। আল–ফাশেরের মধ্য দিয়ে প্রায় পুরো দারফুর অঞ্চল আরএসএফ-এর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। শহরটি আরএসএফ বাহিনী নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর সেখানে তারা এই হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
অশান্ত সুদানের কোরদোফান অঞ্চলের আবেই এলাকায় এবছর ডিসেম্বরে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের হামলায় বাংলাদেশের ছয় সেনাসদস্য নিহত ও আটজন আহত হওয়ারও ঘটনা ঘটেছে।

কঙ্গোয় সংঘাত
ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (ডিআরসি) পূর্বাঞ্চলে সংঘাত এবছর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এম২৩ বিদ্রোহী গোষ্ঠী বেশ কয়েকটি বড় শহর দখল করেছে। রুয়ান্ডা-সমর্থিত এম২৩-এর সহিংস অভিযানের ক্ষত বহনকারী বহু মানুষ পঙ্গুত্ব বয়ে বেড়াচ্ছে।
চলতি বছরের শুরুতে এম২৩ দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাদেশিক রাজধানী দখলের লক্ষ্যে ঝটিকা অভিযান শুরু করলে এম২৩ যোদ্ধা ও কঙ্গোলিজ সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়।
এই লড়াই আরও বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হাজারো মানুষ হতাহতের এক অভিযানের পর গোমা ও বুকাভু— উভয় শহরই এম২৩-এর দখলে চলে যায়।
৪ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রুয়ান্ডা ও ডিআর কঙ্গোর নেতাদের মধ্যে শান্তিচুক্তি সই হলেও ওই অঞ্চলে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং এর প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সাহেল অঞ্চলে সশস্ত্র বিদ্রোহ
২০১১ সালের আরব বসন্ত থেকে পশ্চিম আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে যুদ্ধ চলছে। বিশেষ করে মালি, নাইজার এবং বুরকিনা ফাসো- এই তিন দেশে তীব্র সংঘাত সাহেল যুদ্ধ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
দেশ তিনটিতে সশস্ত্র বিদ্রোহ আরও তীব্র হয়েছে এ বছর। জিহাদি গোষ্ঠীগুলো প্রভাব বিস্তার করছে, যার ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে শরণার্থী সংকট তৈরি হচ্ছে।
আল-কায়েদা পশ্চিম আফ্রিকা শাখা জামা’আত নুসরাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন (জেএনআইএম), কেন্দ্রীয় সাহেল অঞ্চল জুড়ে সামরিক কার্যক্রম কয়েকগুণ বৃদ্ধি করেছে। নভেম্বরের দিকে কয়েক সপ্তাহে হামলা বেড়ে যায়, যার মধ্যে সেনাবাহিনীর বহরেও আক্রমণ ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র- ভেনেজুয়েলা উত্তেজনা
২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলা উপকূলের কাছে ক্যারিবীয় সাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি বেসামরিক নৌযানে হামলা চালিয়ে সেটি ধ্বংস করে দেয়। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কথিত মাদকবিরোধী লড়াই শুরু করে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে।
এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে ভেনেজুয়েলার উপকূলের ক্যারিবীয় অঞ্চল ও প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলে অন্তত ২৬টি সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌযানে হামলা চালিয়ে প্রায় ১০০ জনকে হত্যা করে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
বিতর্কিত এই মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করার আগেই ক্যারিবীয় অঞ্চলে ডজনখানেক যুদ্ধজাহাজ, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, পারমাণবিক শক্তিচালিত ডুবোজাহাজসহ কয়েক হাজার সেনা মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেয় দেশটির বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী।
ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র যে পরিমাণ সামরিক শক্তিবৃদ্ধি করেছে তা মাদকবিরোধী অভিযানের তুলনায় অনেক বেশি। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সরকারকে শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতা থেকে সরানোই ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য।
ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি নাটকীয় গতিতে জোরদার হতে থাকায় যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়ছে। ট্রাম্পের অভিযোগ, মাদুরোর সঙ্গে মাদক পাচার ও অপরাধী চক্রের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। তবে মাদুরো এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

অভিবাসন নিয়ে তোলপাড়
ডনাল্ড ট্রাম্পের নেওয়া কঠোর অভিবাসন নীতি নিয়েও এবছর দেশে-বিদেশে তুমুল সমালোচনা এবং সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। অবৈধ অভিবাসীদের শিকলে হাত পা বেঁধে বিভিন্ন দেশে ফেরত পাঠানোর ঘটনা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাপক ধরপাকড় অভিযান ঘিরে দেশের ভেতরে সহিংস প্রতিবাদ-বিক্ষোভও হয়েছে। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে প্যারামাউন্ট এলাকায় ফেডারেল অভিবাসন এজেন্টদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এ সময় দাঙ্গা পোশাক ও গ্যাস মাস্ক পরা নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাস ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট অবশ্য তার প্রশাসনকে অবৈধ অভিবাসীদের নিয়ে কঠোর নীতি গ্রহণের জন্য কৃতিত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, দ্বিতীয় মেয়াদে এখন পর্যন্ত কোনও অবৈধ অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারেনি।
দেশে দেশে মার্কিন বৈদেশিক সহায়তা বন্ধ করেও ট্রাম্প বহু মানুষকে বিপদগ্রস্ত করেছেন এবছর। ২১ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয়বার শপথ নেওয়ার দিনেই একটি কার্যনির্বাহী আদেশ জারি করে ইউএসএইড বন্ধ করেন ট্রাম্প।
বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা এবং গণতান্ত্রিক উন্নয়নের কাজ চলছিল এই সহায়তায়। এ সহায়তা বন্ধ হওয়ায় বিশেষ করে, সুদান এবং গাজায় দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে।
তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২০ কোটি ডলার আর্থিক অনুদানও এবছর স্থগিত করেন ট্রাম্প। তার এ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে মামলাও করে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়। সব মিলিয়ে পুরো সিস্টেমকেই ওলটপালট করে দিয়েছেন ট্রাম্প।

ক্ষমতার পালাবদল
ডনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট, যিনি মাঝখানে চার বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর এবছর ফের নির্বাচিত হয়ে ফিরে এসেছেন। তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় পাওয়া সবচেয়ে বয়স্ক প্রার্থী।
জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথের পর একই মাসের ২৯ তারিখে সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ পান বিদ্রোহী নেতা আহমেদ আল শারা। দেশটির আগের প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পতনের পর কিছুদিন এ পদটি খালি ছিল।
কানাডায় ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ফেডারেল নির্বাচনে ব্যাংক অব কানাডার সাবেক গভর্নর মার্ক কার্নি নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। নির্বাচনে তার দল লিবারেল পার্টি টানা চতুর্থবারের মতো জয় পেলেও সংখ্যালঘু সরকার গঠন করতে বাধ্য হয়। এর আগে মার্চে জাস্টিন ট্রুডো দেশটির প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
মে মাসের প্রথম দিকে অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নেতা অ্যান্টনি আলবানিজ ফের নির্বাচনে জয়ী হন। এবার পার্লামেন্টে তার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আরও বৃদ্ধি পায়। একই মাসের ৬ তারিখে জার্মানির ফেডারেল নির্বাচনে জয়ী হয়ে চ্যান্সেলর নির্বাচিত হন ফ্রিডরিখ মেরৎস।
জুলাই থেকে অগাস্টের মধ্যে থাইল্যান্ডে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হয়। ৩০ অগাস্ট দেশটির সাংবিধানিক আদালত প্রধানমন্ত্রী পায়েতংতার্ন সিনাওয়াত্রাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণ করে।
কম্বোডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের সঙ্গে ফাঁস হওয়া এক ফোন কলের সূত্র ধরে ‘নৈতিক অসদাচরণের’ অপরাধে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

২১ অক্টোবর জাপানের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন সানায়ে তাকাইচি। তার দল একটি গুরুত্বপূর্ণ জোটের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করার পর জাপানের পার্লামেন্ট তাকাইচিকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিশ্চিত করে।
নভেম্বরের ২৩ তারিখে গিনি-বিসাউয়ে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সরকারিভাবে ফলাফল ঘোষণার একদিন আগেই সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন প্রেসিডেন্ট উমারো সিসোকো এমবালো।
এর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি ইন্দোনেশিয়াজুড়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। সরকারের বিভিন্ন ভূমিকায় সামরিক বাহিনীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য একটি আইন করার প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ শুরু হয়।
পিকেকে নামে পরিচিত কুর্দি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী ও রাজনৈতিক সংগঠন কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি ১২ মে দলের বিলুপ্তি ঘোষণা করে। এর আগে তুরস্কের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতির কথা জানিয়ে অস্ত্র বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিল তারা।

৮ সেপ্টেম্বর হিমালয় কোলের দেশ নেপালজুড়ে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। জেন-জি প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন এই প্রবল গণঅভ্যুত্থানে পরদিন দেশটির প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। এই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে সহিংসতায় অন্তত ২২ জন নিহত কয়েকশ মানুষ আহত হন।
১২ সেপ্টেম্বর নেপালের সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশিলা কার্কি একটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সামাজিক মাধ্যমে এক ভোটাভুটির মাধ্যমে কার্কিকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত হয়।
অক্টোবরে মাদাগাস্কারে জেন-জি নেতৃত্বাধীন ধারাবাহিক বিক্ষোভে ক্ষমতাচ্যুত হন প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি রাজোয়েলিনা। এর পরপরই দেশটির সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে এবং বাহিনীর কর্মকর্তা মাইকেলে র্যান্ড্রিয়ানরিনা প্রেসিডেন্ট হন।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়ুন সুক ইয়লকে গ্রেপ্তার ও অভিশংসনের মাধ্যমে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ১৫ জানুয়ারি দক্ষিণ কোরিয়ার অভিশংসিত প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলকে সফলভাবে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। এর আগে তাকে গ্রেপ্তারের আরেকটি চেষ্টা বিফল হয়েছিল।
ফিলিপিন্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতার্তেকে গ্রেপ্তার করা হয় ১১ মার্চ। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পরোয়ানায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
১১ সেপ্টেম্বর ব্রাজিলের ফেডারেল আদালত সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোকে ২০২২ সালে হওয়া এক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার জন্য দোষী সাব্যস্ত করে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেয়।

নতুন পোপ চতুর্দশ লিও
পোপ ফ্রান্সিস গত ২১ এপ্রিল ৮৮ বছর বয়সে ভ্যাটিকানের নিজ বাসভবনে মারা যাওয়ার পর শুরু হয় নতুন পোপ নির্বাচনের প্রক্রিয়া। এরপর ৮ মে ভ্যাটিকানের সিস্টিন চ্যাপেলের চিমনি থেকে বের হওয়া সাদা ধোঁয়া দেয় নতুন পোপ নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার বার্তা।
এর কিছুক্ষণ পরই জানা যায়, ইতিহাস গড়ে বিশ্বের ১৪০ কোটি ক্যাথলিকের নতুন ধর্মগুরু নির্বাচিত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কার্ডিনাল রবার্ট ফ্রান্সিস প্রেভোস্ট। তিনি পরিচিত হন পোপ চতুর্দশ লিও নামে। রবার্ট ফ্রান্সিসই প্রথম কার্ডিনাল, যিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পোপ নির্বাচিত হন।
হামলা-সহিংসতা
২০২৫ সালের প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানার নিউ অর্লিন্স শহরে ও ইউরোপের দেশ মন্টিনিগ্রোর সেতিনয়ে শহরে দুটি হামলার ঘটনা ঘটে।
নিউ অর্লিন্সে চলন্ত গাড়ি নিয়ে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়া ও গুলিবর্ষণের এক ঘটনায় হামলাকারীসহ ৫০ জন নিহত ও আরও ৫৭ জন আহত হন। আর সেতিনয়ে শহরে নির্বিচার গুলির ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও আরও তিনজন আহত হন।
এরপর ৪ ফেব্রুয়ারি সুইডেনের অ্যারেব্রু শহরে ক্যাম্পাস রিসবের্গা নামের এক বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্রে বন্দুকধারীর গুলিতে অন্তত ১১ জন নিহত ও আরও ১৫ জন আহত হন। এটি সুইডেনের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী নির্বিচার গুলিবর্ষণের ঘটনা।
পরে মার্চের ১১ তারিখে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির বিচ্ছিন্নতাবাদীরা রেললাইন উড়িয়ে দিয়ে পেশোয়ার থেকে কোয়েটাগামী জাফর এক্সপ্রেস ট্রেন ছিনতাই করে নিরাপত্তা সদস্য ও বেসামরিকসহ ৪৫০ জন যাত্রীকে জিম্মি করে।

২২ এপ্রিল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট নামের একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত জঙ্গিরা ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র পেহেলগামের বেইসারান উপত্যকায় পর্যটকদের ওপর হামলা চালিয়ে ২৬ জনকে হত্যা ও অন্তত ২০ জনকে আহত করে।
২৬ এপ্রিল কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ভ্যাঙ্কুভার শহরে ফের চলন্ত গাড়ি নিয়ে হামলার একটি ঘটনা ঘটে। বার্ষিক লাপু লাপু দিবস উৎসবে চালানো এ হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত ও ২০ জন আহত হন। জুনের প্রথমদিকে অস্ট্রিয়ার গ্রাৎস শহরের একটি স্কুলে বন্দুকধারীর হামলায় ১০ জন নিহত ও আরও ৩০ জন আহত হন।
সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাবশালী মিত্র ও কট্টর ডানপন্থি কর্মী চার্লি কার্ককে ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের এক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠান চলাকালে গুলি করে হত্যা করা হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়।
এর দুই দিন পর ব্রাজিলের রিও দি জেনেইরোতে অপরাধী সংগঠন কমান্ডো ভেরমেলো বিরুদ্ধে ‘অপারেশন কন্টেইনমেন্ট’ নামের একটি পুলিশি অভিযানে ১২০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন। এটি ব্রাজিলের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী পুলিশি অভিযান।

৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার একটি অবৈধ পানশালায় বন্দুকধারীদের গুলিতে তিন শিশুসহ ১১ জন নিহত ও আরও ১৪ জন আহত হন। বছরের শেষ দিকে এসে আরেকটি নির্বিচার বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটে অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বন্ডাই বিচে।
১৪ ডিসেম্বর, রোববারের এ ঘটনায় ইহুদিদের হানুক্কা উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যৌথ হামলা চালায় এক ৫০ বছর বয়সী পিতা ও তার ২৪ বছর বয়সী পুত্র। তাদের হামলায় ১৫ জন নিহত ও আরও প্রায় ৪০ জন আহত হন।
ঘটনাস্থলে পুলিশের গুলিতে পিতা সাজিদ আকরাম নিহত ও তার ছেলে নাভিদ আকরাম গুরুতর আহত হন। অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে এটা সবচেয়ে প্রাণঘাতী বন্দুক হামলার ঘটনা।
দুর্বিপাক- দুর্ঘটনা
সারা বছর ধরে বিভিন্ন দুর্বিপাক-দুর্ঘটনায় বিপর্যস্ত হয়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ। যারা শুরু বছরের প্রথম মাসেই।
২১ জানুয়ারি তুরস্কের স্কি রিসোর্ট কারতালকায়ার একটি হোটেলে আগুন লেগে ৭৮ জনের মৃত্যু হয়। এরপর একই মাসের ২৯ তারিখে মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারের সঙ্গে পিএসএ এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের সংঘর্ষে দুটো আকাশযানই যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির পটোম্যাক নদীতে বিধ্বস্ত হয়। এতে হেলিকপ্টারটির তিন ও উড়োজাহাজটির ৬৪ আরোহীর সবাই প্রাণ হারান।
এরপর ১৬ মার্চ নর্থ মেসিডোনিয়ার কোচানি শহরে এক নৈশক্লাবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত ৫৯ জন নিহত ও ১৫৫ জন আহত হন।
৮ এপ্রিল ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের রাজধানী সান্টো ডোমিঙ্গোর আরেকটি নৈশক্লাবের ছাদ ধসে প্রখ্যাত জনপ্রিয় গায়ক রুবি পেরেজসহ অন্তত ২৩১ জন নিহত হন।
একই মাসের ২৬ এপ্রিল ইরানের বন্দর আব্বাস অঞ্চলের শহীদ রাজায়ি বন্দরে প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণে অন্তত ৭০ জন নিহত ও আরও ১০০০ জনেরও বেশি আহত হন।

দুই মাস পর ১২ জুন ভারতীয় এয়ারলাইন্স এয়ার ইন্ডিয়ার লন্ডনগামী একটি বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজ উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই ভারতের গুজরাট রাজ্যের আহমেদাবাদে বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় উড়োজাহাজটির ২২৯ জন যাত্রী, ১২ জন ক্রু এবং নিচে একটি ছাত্রবাসে থাকা ১৯ জন নিহত হন। মাত্র একজন যাত্রী কোনোরকমে রক্ষা পান।
পরের মাসের ২১ জুলাই বাংলাদেশের ঢাকায় বিমান বাহিনীর একটি চেংদু জে-৭ প্রশিক্ষণ বিমান এফ-৭ বিজিআই উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের ওপর বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় পাইলটসহ ৩১ জন নিহত হন।
এর তিনদিন পর ২৪ জুলাই রাশিয়ার সাইবেরিয়ার পূর্বাঞ্চলে আঙ্গারা এয়ারলাইন্সের একটি আন্তোনোভ অ্যান-২৪ উড়োজাহাজ ফ্লাইট ২৩১১ বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় ৪৮ আরোহীর সবাই নিহত হন।
পরের মাসের ১৯ অগাস্ট ইরান থেকে শরণার্থীদের নিয়ে ফেরার সময় আফগানিস্তানের হেরাত প্রদেশে একটি বাসের সঙ্গে ট্রাক ও মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে অন্তত ৭৯ জন নিহত হন।
সেপ্টেম্বরের ৩ তারিখে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে ঐতিহ্যবাহী ক্যাবল কার গ্লোরিয়া ফানিকুলার লাইনচ্যুত হয়ে পাশের একটি ভবনে আছড়ে পরে। এতে ১৬ জন নিহত ও আরও ২১ জন আহত হন।
পরের মাসের ১৯ অক্টোবর প্যারিসের বিখ্যাত ল্যুভ জাদুঘরে দুঃসাহসিক ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতরা ক্রেন দিয়ে উপরতলার জানালা গুঁড়িয়ে ফ্রান্সের সাবেক রাজপরিবারের রত্ন যেখানে থাকে সেই গ্যালেরি দাপোলোঁ থেকে অমূল্য সব জিনিসপত্র নিয়ে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়।
এরপর ৪ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকি অঙ্গরাজ্যের লুইভিল মুহাম্মদ আলি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে হওয়াইগামী ইউপিএস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ২৯৭৬ উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যে বিধ্বস্ত হয়ে তিন ক্রু ও নিচে ভূমিতে থাকা ১১ জন নিহত হন।

একই মাসের ২৬ নভেম্বর হংকংয়ের ওয়াং ফুক কোর্ট অ্যাপার্টমেন্ট ব্লককে গ্রাস করা ব্যাপক আগুনে অন্তত ১৬০ জন নিহত ও ১৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ হন। এরপর ৬ ডিসেম্বর ভারতের গোয়া রাজ্যের আরপোরায় এক নৈশক্লাবে অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৫ জনের মৃত্যু হয় এবং আহত হন আরও ৫০ জনেরও বেশি।
নভেম্বরে ব্রাজিলে জাতিসংঘের কপ-৩০ জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনের একটি প্যাভিলিয়নে ভয়াবহ আগুন লাগে। কপ৩০ সম্মেলনের প্রবেশপথের কাছের প্যাভিলিয়নে এই আগুনের সূত্রপাত হয়। কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। আমাজনের ধারে বেলেম শহরে বিশাল তাঁবুতে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
আগুনে কাপড় দিয়ে তৈরি ভেন্যুর ছাদের একটি অংশ পুড়ে যায়। সম্মেলনস্থলের ভেতরে এবং বাইরে ধোঁয়া উড়তে শুরু করলে অগ্নিনির্বাপন কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং কোনও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

এ বছর অনেকগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে আছে শক্তিশালী ভূমিকম্প, প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়, ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংসাত্মক দাবানলের মতো ঘটনা।
বছরের প্রায় শুরুতেই ৭ জানুয়ারি চীনের তিব্বতে ৭ দশমিক ১ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয় আর তাতে অন্তত ১২৬ জন নিহত ও ৩৩৮ জন আহত হন।
ওই একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর লস অ্যাঞ্জেলেসে ইতিহাসের অন্যতম ধ্বংসাত্মক দাবানলের ঘটনা ঘটে। দীর্ঘস্থায়ী খরা পরিস্থিতির মধ্যে শুরু হওয়া এই দাবানল ঝড়ো বাতাসের মধ্যে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। লস অ্যাঞ্জেলেসের অভিজাত এলাকা বেভারলি হিলস ও ওয়েস্ট হলিউডের মধ্য দিয়ে যাওয়া সানসেট বুলেভার্ডের অধিকাংশ ঘরবাড়িসহ ১৩ হাজারেরও বেশি বাড়ি পুড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। টানা কয়েকদিন ধরে চলা এ আগুনে অন্তত ২৯ জনের মৃত্যু হয় এবং এক লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
দুই মাস পর দক্ষিণ কোরিয়া তাদের আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক দাবানলের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। ২১ মার্চের দিকে শুরু হওয়ার পর এই দাবানল দেশটির দক্ষিণ কিয়ংসাং প্রদেশের ৮৭ হাজার হেক্টরেরও বেশি এলাকা ধ্বংস করে দেয় আর মারা যায় অন্তত ৩২ জন।
একই মাসের ২৮ তারিখে মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ব্যাপক শক্তিশালী একটি ভূমিকম্প হয়। ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে ৫৪১৩ জন নিহত ও আরও ১১৪০২ জন আহত হন।
জুলাই ৪ থেকে ৭ তারিখের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের মধ্যাঞ্চলে বড় ধরনের এক বন্যায় অন্তত ১৩৫ জনের মৃত্যু ও শতাধিক মানুষ নিখোঁজ হন।
৩০ জুলাই রাশিয়ার সর্বপূর্বাঞ্চলীয় কামচাটকা উপদ্বীপের উপকূলে ৮ দশমিক ৮ মাত্রার অতি শক্তিশালী একটি ভূমিকম্প হয়। এই ভূমিকম্পের পর জাপান ও হাওয়াই দ্বীপে সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়।
এর এক মাস পর ৩০ অগাস্ট সুদানের দারফুরের মধ্যাঞ্চলীয় মারাহ পর্বতমালার তারাসিন নামের এক গ্রামে প্রবল বৃষ্টির মধ্যে ভূমিধসে ৩৭০ থেকে ১০০০ মানুষ নিহত হন বলে খবর হয়।
পরদিন ৩১ অগাস্ট আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে ৬ মাত্রার এক ভূমিকম্পে ২২০০ মানুষ নিহত ও ৩৫০০ জনের বেশি আহত হন। একমাস পর ৩০ সেপ্টেম্বর ফিলিপিন্সের সেবু দ্বীপে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার এক ভূমিকম্পে ৭১ জন নিহত ও আরও ৫৫৯ জন আহত হন।
২৮ অক্টোবর জ্যামাইকায় আঘাত হানে ৫ মাত্রার হ্যারিকেন মেলিসা। এর একটানা বাতাসের বেগ ছিল ঘণ্টায় ২৯৫ কিলোমিটার।
৩ নভেম্বরের আফগানিস্তানে আবার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়। দেশটির বালখ ও সামাঙ্গন প্রদেশকে কাঁপিয়ে দেওয়া এ ভূমিকম্পে ৩১ জন নিহত ও ৯৫৬ জন আহত হন।
৪ নভেম্বর টাইফুন কালমায়েগির কারণে ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে ২৮৮ জনের মৃত্যু হয়। একই মাসে মালাক্কা প্রণালীতে সৃষ্ট এক বিরল ঘূর্ণিঝড়ে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় অন্তত ১১৬৭ জনের মৃত্যু হয় ও ৫২১ জন নিখোঁজ হন।

২৮ নভেম্বর শ্রীলঙ্কায় আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় দিতওয়া। এই ঘূর্ণিঝড়টির প্রভাবে প্রবল বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে দেশটিতে ও ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে অন্তত ৬১১ জনের মৃত্যু হয় ও ২১৪ জন নিখোঁজ হন।
বছরের শেষ দিকে ৮ ডিসেম্বর জাপানের প্রশান্ত মহাসাগর উপকূলে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার এক ভূমিকম্পে ৭০ সেন্টিমিটার উচ্চতার সুনামি সৃষ্টি হয়।