১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিচ্ছে আসাম, কেরালা; বড় পরীক্ষায় মোদী সরকার

আগামী ২৩ ও ২৯ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ু রাজ্যে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিচ্ছে আসাম, কেরালা; বড় পরীক্ষায় মোদী সরকার
বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিচ্ছে আসামের বাসিন্দারা। ছবি: এনডিটিভি

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 09 Apr 2026, 03:03 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:22 PM

ভারতের আসাম, কেরালা ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতে বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। 

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জন্য এই নির্বাচনকে একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।

আগামী ২৩ ও ২৯ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গ ও তামিল নাড়ু রাজ্যে ভোটগ্রহণ হবে। 

৪ মে পাঁচটি অঞ্চলেরই ফলাফল একযোগে ঘোষণা করা হবে।

সচরাচর যেসব জায়গায় বিজেপির প্রভাব বেশি তার বাইরেও এখন দলের প্রভাব বিস্তারে চেষ্টা করছে মোদী সরকার। অন্যদিকে তাদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি টেকসই চ্যালেঞ্জ গড়ে তোলাই এখন বিরোধী দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য।

ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই চার রাজ্য ও পুদুচেরিতে মোট ভোটারের সংখ্যা ১৭ কোটি ৪০ লাখ, যা দেশটির মোট ভোটারের প্রায় ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে কেবল আসামেই বিজেপি ক্ষমতাসীন, পুদুচেরিতে ক্ষমতাসীন জোটের অংশ। 

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা বা তামিল নাড়ুতে তারা কখনও এককভাবে সরকার গঠন করতে পারেনি। এই তিন রাজ্যে বিজেপিকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে শক্তিশালী আঞ্চলিক দলগুলোকে, যারা ক্ষমতা ধরে রাখা বা ফিরে পাওয়ার লড়াই চালাচ্ছে।

সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাহুল বর্মা বিবিসিকে বলেছেন, “এটি বিজেপির জন্য বড় পরীক্ষা, যারা বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ ও দক্ষিণের রাজ্য কেরালা ও তামিলনাড়ুতে জনভিত্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।” 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্বাচনী প্রভাব ক্রমশ কমতে থাকা কংগ্রেসের জন্য এটি আরও বড় চ্যালেঞ্জ, মত তার। 

“ফলাফলই বলে দেবে কংগ্রেস আসামে কোনো জোরালো চ্যালেঞ্জ গড়তে পারছে কি না কিংবা কেরালায় সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনের সাফল্য ধরে রাখতে পারছে কি না। তাছাড়া বৃহত্তর বিরোধী জোট অভ্যন্তরীণ বিরোধগুলো কীভাবে সামাল দিচ্ছে, তারও একটি আভাস মিলবে এই নির্বাচনে,” বলেছেন রাহুল।

পাঁচটি অঞ্চলে মোট ৮২৪টি আসনের এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটার তালিকা সংশোধন বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশন বলছে, ভুয়া বা পুরনো নাম বাদ দিয়ে বৈধ ভোটারদের যুক্ত করতেই তাদের এই পদক্ষেপ। 

তবে বিরোধীরা বলছে, বিজেপিকে সুবিধা দিতেই লাখ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যাদের বড় অংশই মুসলমান। বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

এপ্রিলের এই নির্বাচনে প্রতিটি অঞ্চলই নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।

আসামে, বিশেষ করে বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনীতি চলছে অভিবাসন, পরিচয় এবং নাগরিকত্বকে কেন্দ্র করে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এই রাজ্যে বিজেপি ১০ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে। এবারের নির্বাচন তাদের আধিপত্য বজায় রাখার সক্ষমতার পরীক্ষা।

এখানকার নির্বাচনী প্রচারণায় বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা অনেক কড়া কড়া কথা বলেছেন। তাকে প্রায়ই অবৈধ অনুপ্রবেশ ও জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনকে আলোচনার কেন্দ্রে এনে বাংলাভাষী মুসলমানদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করতে দেখা গেছে। 

অন্যদিকে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধীরা সুশাসন, অর্থনৈতিক সমস্যা ও আঞ্চলিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে জনসমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং গড় আয়ুর মতো মানব উন্নয়ন সূচকগুলোতে ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে শীর্ষে থাকা কেরালার প্রচারণায় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে জনকল্যাণ ও সুশাসন। 

দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্যে ঐতিহ্যগতভাবে কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মার্ক্সবাদী)-- সিপিএম ও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে ক্ষমতার রদবদল হয়। এক দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা বামপন্থি জোট এবারও তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স বা এনডিএ-র শাসনে থাকা কেন্দ্রশাসিত উপকূলীয় অঞ্চল পুদুচেরির বিধানসভায় ৩০টি আসন রয়েছে। এখানকার প্রচারণার বিতর্কে জনকল্যাণ, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিই প্রাধান্য পেয়েছে।

ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ এই পাঁচটি অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে জনবহুল, যেখানে মোট ভোটার ৭ কোটিরও বেশি। ২০১১ সাল থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনে থাকা রাজ্যটিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বিজেপি। 

বাংলাদেশলাগোয়া এ রাজ্যে আগামী ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোট হবে।

ভোটের প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিকে একটি বহিরাগত শক্তি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তার দাবি, বিজেপির রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মানানসই নয়। 

অন্যদিকে বিজেপি এই ধারণা নাকচ করে অনুপ্রবেশ ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে সামনে এনেছে, যা সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে নির্বাচনী মেরুকরণকে আরও জোরদার করেছে।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারণায় এসআইআর বা ভোটার তালিকা সংশোধন বিতর্কও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। নির্বাচন কমিশন যে চূড়ান্ত তালিকা দিয়েছে তাতে আগের বারের ৯ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্শিদাবাদ থেকে।

তামিল নাড়ুর রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে, এই দুই আঞ্চলিক দলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর মধ্যে এআইএডিএমকে বিজেপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে লড়ছে। ২৩ এপ্রিলের এই নির্বাচন বাড়তি মনোযোগ কেড়েছে জনপ্রিয় চিত্রনায়ক থালাপতি বিজয়ের নেতৃত্বাধীন তৃতীয় একটি রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের কারণে। 

বিজেপি এই রাজ্যে শক্ত অবস্থান গড়তে লড়াই করছে। এ রাজ্যে দীর্ঘকাল ধরেই সামাজিক ন্যায়বিচার, রাজ্যের স্বায়ত্তশাসন এবং ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় থেকে জন্ম নেওয়া আঞ্চলিক দলগুলোর আধিপত্য রয়েছে। রাজ্যটিতে সামান্য সাফল্যও বিজেপির জন্য বড় অর্জন হিসেবে দেখা হবে, যা দক্ষিণ ভারতে তাদের ভিত্তি মজবুতের পথ প্রশস্ত করবে।