Published : 10 Oct 2025, 10:15 PM
চীনের হামলার আশঙ্কায় নতুন এক বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে।
শুক্রবার তিনি বলেন, ‘টি-ডোম’ নামে এই ব্যবস্থা দেশটির নাগরিকদের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় “নিরাপত্তার জাল” হিসেবে কাজ করবে।
তাইওয়ানে হামলার জন্য চীন তাদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে বলে লাই চিং তে সরকার সতর্ক করার পর এই ঘোষণা এল। তাইওয়ান দখল করতে চীনের শক্তি ব্যবহার বন্ধ করার আহ্বানও জানিয়েছেন লাই।
গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত তাইওয়ানের ওপর সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে চীন। দ্বীপ দেশটিকে চীন নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে, যদিও তাইপে সরকারের অবস্থান একেবারে উল্টো।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই বলেন, “প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির লক্ষ্য স্পষ্ট—শত্রুর হুমকি মোকাবেলা করা এবং নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও শক্তিশালী করা।”
তিনি জানান, এবছর শেষে বিশেষ প্রতিরক্ষা বাজেট প্রস্তাবে টি-ডোম তৈরির ব্যয় পরিকল্পনা পেশ করা হবে।
‘টি-ডোম’: নতুন প্রজন্মের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
প্রেসিডেন্ট লায় বলেন, “আমরা ‘টি-ডোম’ গড়ে তুলব—একটি কঠোর, বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা উন্নত শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ও কার্যকর প্রতিরোধ ক্ষমতার সমন্বয়ে গঠিত হবে।
এর মাধ্যমে তাইওয়ানের নাগরিকদের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।” লাই যদিও নতুন এই ব্যবস্থার বিস্তারিত কিছু জানাননি।
তবে রয়টার্স একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এটি ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোম’-এর মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আদলে গড়ে তোলা হবে।
প্রেসিডেন্টের দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, টি-ডোম প্রকল্পের ব্যয় পরিকল্পনা চলতি বছরের শেষ নাগাদ বাজেট প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
তার ভাষায়, “আমরা এমন এক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে চাই, যার বাধাদান ক্ষমতা আরও বেশি হবে।”
বর্তমানে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র ও দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ‘স্কাই বো’ ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল।
গত মাসে তাইপেতে এক বড় ধরনের অস্ত্র প্রদর্শনীতে তাইওয়ান তাদের সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র ‘চিয়াং-কং’ উন্মোচন করে, যা মাঝারি-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে এবং প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে উঁচুতে উড়ে যেতে সক্ষম।
চীনের প্রতিক্রিয়া: স্বাধীনতার স্বপ্ন যুদ্ধ ডেকে আনবে
লাই-এর বক্তব্যের পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, “জোর করে স্বাধীনতা অর্জনের চেষ্টা তাইওয়ানকে কেবল সংঘাতের দিকেই নিয়ে যাবে।”
তিনি প্রেসিডেন্ট লাইকে “বিচ্ছিন্নতাবাদী, বিপদসৃষ্টিকারী ও যুদ্ধ-উসকানিদাতা” আখ্যা দেন। গত বছর তার জাতীয় দিবসের ভাষণের পর তাইওয়ানের চারপাশে যুদ্ধ মহড়া চালিয়েছিল চীন।
লাই বলেন, শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তাইওয়ান কাজ করে যাবে। পাশাপাশি চীনকে আহ্বান জানান, যেন তারা জোর করে তাইওয়ান প্রণালীর বর্তমান অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা না করে।
তার ভাষায়, “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়—যুদ্ধের যন্ত্রণা ও আগ্রাসনের ক্ষতি মানবতার জন্য ভয়াবহ। ইতিহাসের সেই ট্র্যাজেডি যেন আর কখনও ফিরে না আসে।”
চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি জানায়, বেইজিং ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ ও বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তাইওয়ানের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং বলেছে, “পুনরেকত্রীকরণই শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথ।”
ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া:
এক মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট লাইয়ের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা ও শান্তি বজায় রাখার অঙ্গীকারকে স্বাগত জানায়।
তিনি বলেন, “আমরা অনুমান করতে চাই না চীন কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। তবে আমাদের নীতি স্পষ্ট—রুটিন ভাষণ বা বার্তাকে কখনও সামরিক পদক্ষেপের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।”
তাইওয়ানের জাতীয় দিবস পালিত হয় ১৯১১ সালের সেই গণঅভ্যুত্থানের স্মরণে, যা চীনের শেষ রাজবংশ উৎখাত করে ‘রিপাবলিক অব চায়না’ প্রতিষ্ঠা করেছিল।
১৯৪৯ সালে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্টদের কাছে গৃহযুদ্ধে পরাজিত হয়ে রিপাবলিক সরকার তাইওয়ানে আশ্রয় নেয়—আর সেই নামেই দেশটি এখনও পরিচিত।