Published : 22 Apr 2025, 12:15 AM
ভ্যাটিকান থেকে শুরু করে ফিলিপিন্স, পৃথিবীর নানা কোণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্যাথলিকরা এ বছরের ইস্টার মানডে কাটাচ্ছেন তাদের আধ্যাত্মিক গুরু পোপ ফ্রান্সিসকে বিদায় জানিয়ে।
৮৮ বছর বয়সী এ ধর্মগুরুর মৃত্যু হল এমন এক সময়ে, যখন রোমান ক্যাথলিক চার্চের অনুসারীরা বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক পরব পার করছেন। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও ইস্টার সানডেতে দুর্বল শরীর নিয়ে ফ্রান্সিস সেইন্ট পিটারস চত্বরে জড়ো হওয়া ভক্তদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছিলেন।
তার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর ক্যাথলিকদের মনেও বারবার এই সময়ের প্রসঙ্গই উঠে আসছে, বলছে বিবিসি।
“তিনি (ঈশ্বর) খ্রিষ্টান চার্চের জন্য সবচেয়ে চমৎকার দিন বেছে নিয়েছেন, এর চেয়ে আর ভালো দিন হতে পারতো না,” বলেছেন স্পেনের এক সেলেসিয়ান যাজক ফাদার সের্জিও কোদেরা।
“এটা (ইস্টার) হলো খ্রিষ্টানদের উদ্যাপন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, যেদিন আমরা উদ্যাপন করি যে মৃত্যুই শেষ কথা নয়। আর এই দিনটিকেই ঈশ্বর বেছে নিয়েছেন, পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য,” বলেছেন তিনি।
ভ্যাটিকানে যারা আগের দিনও পোপকে ভাষণ দিতে দেখেছেন, তাদের কাছে তার মৃত্যুর খবর এসেছে বজ্রাঘাতের মতো।
“পুরোপুরি স্তম্ভিত, গতকালই মাত্র তাকে দেখলাম ইস্টার উদ্যাপনে, আমরা আশীর্বাদও নিয়েছি,” সেইন্ট পিটারস চত্বরে দাঁড়িয়ে এমনটাই বলেন একজন।
পোপের শেষ ভাষণ শোনা এক নারী বলেন, “মানুষের প্রতি কর্তব্যকে তিনি গুরুত্ব সহকারে নিয়েছিলেন, এমনকী গতকাল অসুস্থ থাকা অবস্থায়ও তিনি বেরিয়ে এসেছিলেন, অংশ নিয়েছিলেন ইস্টারের সমাবেশে, আমাদের সঙ্গে কথাও বলেছিলেন।”
ফিলিপিন্সের রাজধানী ম্যানিলাজুড়ে থেকে থেকেই শুনতে পাওয়া যাচ্ছে গির্জার ঘণ্টাধ্বনি, পোপের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে তার জন্য প্রার্থনায় গির্জায় গির্জায় জড়ো হয়েছেন ক্যাথলিক চার্চের অনুসারীরা।
দেশটির মোট জনসংখ্যা ১১ কোটি, যার প্রায় ৮৫ শতাংশই রোমান ক্যাথলিক। যা দেশটিকে এশিয়ায় চার্চের ঘাঁটিতে পরিণত করেছে।
প্রার্থনা করতে আসা ক্যাথলিকদের মধ্যে পাওয়া গেল জুড অ্যাকুইনোকে, তিনি গির্জায় ধর্মীয় সমাবেশ বা অনুষ্ঠানে পুরোহিতদের সহায়তা করেন। পোপের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই অ্যাকুইনো ভাবছিলেন তরুণ ক্যাথলিকদের ওপর ফ্রান্সিসের প্রভাবের কথা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেন, “ক্যাথলিক চার্চের জন্য এটা বেশ বড় আঘাত, কারণ তিনি আমাদের মতো অল্পবয়সীদের কাছে ছিলেন বিরাট রোল মডেল। এমন একজন রোল মডেল, যাকে আমরা অনুসরণ করি, কারণ তিনি যিশুর প্রতিনিধি।”
গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহী অধ্যুষিত বুকাভু শহরের ক্যাথলিকরা পোপের মৃত্যুতে শোক প্রকাশে জড়ো হয়েছেন নতঁর-দাম দ্য লা পে ক্যাথেড্রালে।
আফ্রিকার দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ক্যাথলিক, মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড়।
২০২৩ সালে রাজধানী কিনশাসায় ৫ লাখ ভক্তের সমাবেশে ভাষণ দিয়েছিলেন ফ্রান্সিস। তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রথম পোপ যিনি সংঘাতে জর্জর দেশটি সফর করেছিলেন। ইস্টার সানডেতে দেওয়া শেষ ভাষণেও পোপ কঙ্গোতে সহিংসতার অবসানে আহ্বান জানিয়েছিলেন।
“পোপ ফ্রান্সিস ছিলেন সেই পোপ, যিনি আমাদের দেশ ডিআরসিকে (ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর সংক্ষিপ্ত রূপ) খুব ভালোবাসতেন। তাই তিনি তার শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও কঙ্গোবাসীর সঙ্গে দেখা করার ও তাদের অসুবিধার কথা শোনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
“আমি তাকে কঙ্গোতে আসতে দেখেছি। ঈশ্বর তার আত্মাকে স্বাগত জানাক, কেননা এই পোপ সত্যিই আমাদের খেয়াল রাখতেন,” ক্যাথেড্রালের বাইরে এমনটাই বলেছেন সিফা আলবারতিনা।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ক্যাথলিক জনগোষ্ঠীর দেশ ব্রাজিল পোপের মৃত্যুতে ৭ দিনের শোক ঘোষণা করেছে।
“আমি মনে করি তিনি ছিলেন অনন্য ও অসাধারণ এক ব্যক্তি, এমনকী মহামারীর সময়ও।
“যাজক হিসেবে প্রতিদিন তিনি উঠে দাঁড়াতেন পৃথিবীর জন্য প্রার্থনা করতে, মারাও গেলেন (ইস্টারের) এক অসাধারণ ও সুন্দর সময়ে, তার জন্য একেবারেই উপযুক্ত,” রিও দি জানেইরোতে আওয়ার লেডি অব লুর্দসের বাইরে এমনটাই বলেন ক্যাথলিক চার্চের অনুসারী রোসানে রিবিয়েরো।
পোপ থাকাকালে ফ্রান্সিসকে শিশু যৌন নির্যাতন কাণ্ড সামলানোয় তার ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কিন্তু পরে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলা এবং যাজকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে নতুন নিয়ম করে অনেকের প্রশংসাও কুড়িয়েছেন।
বালক অবস্থায় চিলিতে এক যাজকের নিপীড়নের শিকার হওয়া হুয়ান কার্লোস ক্রুজ শেলিউ বলছেন, ফ্রান্সিস ছিলেন চার্চের সেই অল্প ক’জনের একজন যিনি তার কথা শুনেছিলেন।
পোপ পরে তার কাছে হয়ে ওঠেন ‘সত্যিকারের পিতা’, তিনি যৌন নির্যাতন বিষয়ে চার্চের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে ফেলেন, বলেন শেলিউ।
বিবিসির নিউজ আওয়ার প্রোগ্রামে তিনি বলেন, “পোপ বুঝেছিলেন যে তিনি ভুল করেছেন, তাকে ঠিকঠাক সব জানানো হয়নি। তাই তিনি আমাকে ও দুই বন্ধুকে যেতে বলেছিলেন, আমি তার সঙ্গে সান্তা মার্তায় (পোপের ভ্যাটিকানের বাসভবন) এক সপ্তাহ কাটাই, তিনি এবং আমি পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘসময় কথা বলেছি।
“তখন থেকেই তিনি গির্জায় যৌন নির্যাতন নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করেন, তিনি ছিলেন অসাধারণ একজন মানুষ। কেউ আপনার কথা শুনছে, এই অনুভূতি অসাধারণ।”
স্পেনের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি ক্যাথলিক, ইউরোপের এ দেশটিতেও পোপের মৃত্যুতে তিনদিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে।
“আমি মনে করি তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন যাকে সকলেই গ্রহণ করেছিল, ক্যাথলিক এবং ক্যাথলিক নয় সবাই। আমি মনে করি তিনি এমন একজন ছিলেন যার সঙ্গে যে সবাই আলাপ করতে পারতো,” বলেছেন মাদ্রিদের সরকারি চাকরিজীবী নুরিয়া ওর্তেগা।
ফ্রান্সিসের মৃত্যু ঘোষণার পরক্ষণ থেকেই শুরু হয়ে গেছে পরবর্তী পোপের খোঁজ। শিক্ষার্থী হাভিয়ের হেরাশিয়ার আশা, নতুন পোপের অধীনে ক্যাথলিক চার্চ আরও ‘বিনয়ী’ হবে, তরুণ প্রজন্মের কাছে হবে আরও আকর্ষণীয়।
“পবিত্র আত্মার প্রতি আমাদের বিশ্বাস আছে এবং আমরা আশা করছি পরবর্তী পোপও বাকিদের মতো ভালোই হবেন,” বলেন তিনি।