Published : 06 Apr 2026, 02:34 PM
যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন কেন তার নিজের অপরাধের এমন বিস্তারিত রেকর্ড তৈরি করেছিলেন?
সেসব গোপন নথি তো এখন প্রকাশিত হয়েছে। সেসব তথ্য নিয়ে এখন কী করা উচিত?
এক টিকটক পোস্টে এই প্রশ্নগুলো সামনে এনেছেন মালয়েশিয়ার রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী মুখরিজ মাহাথির, যিনি দেশটির সাবেক শাসক মাহাথির মোহাম্মদের ছেলে।
মুখরিজ মাহাথির প্রথম প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর নিজেই দিয়েছেন। আর দ্বিতীয় প্রশ্নটি তিনি রেখেছেন বিশ্বের সামনে।
টিকটক পোস্টে তিনি বলেন, “জেফ্রি এপস্টাইন ফাইলস। ত্রিশ লাখ নথি, দুই হাজার ভিডিও, এক লাখ ৮০ হাজার ছবি। কি বিপুল সংখ্যা! প্রায় অভাবনীয়। আমাদের যে প্রশ্নটি করতে হবে, তা হল ‘কেন?’ কেউ নিজের অপরাধের এমন বিস্তৃত ও স্থায়ী রেকর্ড কেন তৈরি করবে?
“নথির এই ব্যাপকতাই আমাদের উত্তর বলে দেয়। এটি কেবলই একজন মানুষের নৈতিক স্খলনের রেকর্ড ছিল না; এটি ছিল বৈশ্বিক অভিজাতদের দুর্নীতির একটি খতিয়ান।”
এপস্টেইন ফাইলসে যাদের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে আছেন বহু বিলিয়নেয়ার বিদেশি রথী-মহারথী, ব্রিটিশ প্রিন্স, শিক্ষাবিদ, শীর্ষ পর্যায়ের কূটনীতিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান প্রেসিডেন্টও আছেন।
ডনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এসব নথি প্রকাশের দাবি উঠোছিল। পরে সেই ফাইলের একটি অংশ প্রকাশ্যে এনেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল পামেলা বন্ডি।
যৌনদাসী কেনাবেচা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যৌনদাসী সরবরাহের অভিযোগ আছে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ আছে, তার পিডো দ্বীপের বিলাসবহুল প্রাসাদে চলত অবৈধ কর্মকাণ্ড। নাবালিকা, এমনকি শিশুদের দিয়েও চালানো হত যৌন সম্পর্কের কাজ।
এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বিমানে করে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে অতিথিরা সেখানে যেতেন। ডনাল্ড ট্রাম্প, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন, স্টিফেন হকিং থেকে মাইকেল জ্যাকসন পর্যন্ত বিশ্বের বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম আছে সেই অতিথির তালিকায়।
@mukhrizm Share this video. Spread the word. The truth must come out. #savetheworld #epstein #iran #palestine #trump ♬ original sound - Mukhriz Mahathir
মালয়েশিয়ার সাবেক উপমন্ত্রী মুখরিজ মাহাথির তার টিকটক পোস্টে বলেন, “আমরা অশ্লীল ইমেইল, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ চিঠি, অপরাধ প্রমাণ করার মত ছবি দেখেছি, কিন্তু এপস্টেইন ফাইলস তার চেয়েও বেশি কিছু। এপস্টেইন ফাইলস নিয়ে জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে যৌন দাসত্ব, নির্যাতন এবং শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ—এমনকি হত্যার প্রমাণও নথিভুক্ত করা হয়েছে।
“আমরা আবার মূল প্রশ্নে ফিরে যাই–কেন সবকিছু নথিবদ্ধ করা হয়েছিল? তার (এপস্টেইন) দ্বীপ লিটল সেন্ট জেমসে লুকানো ক্যামেরাগুলো ব্যক্তিগত তৃপ্তির জন্য ছিল না। সেগুলো ছিল একটি হাতিয়ার। এপস্টেইন প্রভাব খাটানোর জন্য ওই বিশাল ভাণ্ডার তৈরি করছিলেন। এখন ব্যাপকভাবে বলা হচ্ছে, তিনি কাজ করতেন ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের নির্দেশে।”
মালয়েশিয়ার কেদাহ রাজ্য সরকারের সাবেক প্রধান মুখরিজ মাহাথির বলেন, “উদ্দেশ্যটি স্পষ্ট, পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মানুষদের অপরাধের জালে ফাঁসানো, যাতে তাদের একটি বিদেশি রাষ্ট্র—জায়নবাদী ইসরায়েলের ইচ্ছার কাছে নত করানো যায়।
“ভাবুন তো, কখনও কি আপনি কোনো বিশ্বনেতাকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে দেখেছেন, যা এতটাই বিভ্রান্তিকর, এতটাই নিষ্ঠুর, এতটাই নিজের জনগণের স্বার্থবিরোধী যে আপনার মনে হয়েছে–‘এটা কীভাবে সম্ভব?’ একজন নেতা কীভাবে এত সহজে বোমা মেরে বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে, হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর নির্দেশদাতা হতে পারে, বিদেশি নেতাদের অপহরণ বা হত্যা করতে পারে, এবং তারপর বিন্দুমাত্র অনুতাপ ছাড়াই মিথ্যা কথা বলে যেতে পারে।”
মাহাথিরপুত্র বলতে থাকেন, “কীভাবে তারা নিজেদের এমন ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে করে যে, তারা আক্ষরিক অর্থেই খুন করেও পার পেয়ে যাবে এবং আবার নির্বাচিত হবে? এপস্টেইন ফাইলস এর একটি সম্ভাব্য উত্তর দেয়, যা ভীতিকর। তারা শক্তিশালী বলে এমন আচরণ করছে–বিষয়টা তা নয়, তারা এমন আচরণ করছে কারণ তারা আপস করেছে।”
মুখরিজ মাহাথির বলছেন, এপস্টেইনের সেসব গোপন প্রমাণ হয়ত প্রভাবশালীদের বশ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হত।
তিনি বলেন, “তাদের অতীতই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত এক অস্ত্র। যা করতে বলা হয়, তাই তারা করেন’ সেটা আনুগত্যের কারণে নয়, বরং ভয়ে—নিজেদের অপরাধ ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়, অথবা সেই গোপনীয়তা রক্ষার মরিয়া চেষ্টা থেকে, যা তাদের এসব অপরাধ চালিয়ে যেতে বলে।

“এবং এখানেই আসে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রসঙ্গ। তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে যে বিশৃঙ্খলতা, নিজের দেশে খাদ্য সহায়তা, মেডিকেইড ও আবাসন ভর্তুকি কমিয়ে ইসরায়েলে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো; শুল্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা; গাজায় যুদ্ধাপরাধে অবিচল সহযোগিতা; ইরানের সঙ্গে নতুন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার অন্ধ তাড়না; এমনকি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার বাস্তব ঝুঁকি—এসবের ব্যাখ্যা আর কী হতে পারে?”
নিয়ন্ত্রকদের হাতে থাকা এপস্টেইন ফাইলসের একাংশ প্রকাশ্য হওয়ার পর মানুষ এখন কী পদক্ষেপ নেবে, সেই প্রশ্ন সামনে এনেছেন মুখরিজ মাহাথির।
তার ভাষায়, “এসবকে আর কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? এটা পাগলামি নয়, এটা আত্মসমর্পণ–এমন ইঙ্গিতই এখানে মেলে। এতে বোঝা যায়, একজন নেতার সামনে হয়ত আর কোনো পথ খোলা নেই। তার জায়নবাদী নিয়ন্ত্রকদের অমান্য করা মানে তার রাজনৈতিক জীবনের অবসান, এমনকি তার চেয়েও খারাপ কিছু। আর নিয়ন্ত্রকদের কথা মত চললে নিশ্চিত হয় ক্ষমতা, সুরক্ষা, বিলিয়নেয়ারের মত অবসর জীবন, এবং ভবিষ্যতেও সমর্থনের প্রতিশ্রুতি।”
এর পরিণতি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই মন্তব্য করে মুখরিজ মাহাথির বলেন, “এমন এক বিশ্বে, যেখানে নেতারা নিজেদের গোপন অতীতের কাছে জিম্মি, তাদের কর্মকাণ্ড আর তাদের নিজের হাতে থাকে না। তাদের একমাত্র প্রভু সেই ব্যক্তি, যার হাতে রয়েছে সেই ফাইল।
কিন্তু এখন সেই ফাইল আমাদের হাতেও আছে। প্রশ্ন হল, আমরা এ নিয়ে কী করব?”