Published : 16 Jan 2026, 10:28 AM
ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো তার নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে উপহার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে এক একান্ত বৈঠকে তিনি এ উপহার তুলে দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে।
মাচাদো বলেন, “আমার মনে হয়, আজ আমাদের ভেনেজুয়েলাবাসীদের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন।”
বিবিসি লিখেছে, এটি ছিল ট্রাম্পের সঙ্গে মাচাদোর প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ। মার্কিন বাহিনী কারাকাসে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে মাদক পাচারের মামলায় বিচারের মুখোমুখি করার কয়েক সপ্তাহ পর এ বৈঠক হল।
ট্রাম্প সোশাল মিডিয়া পোস্টে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, এই পদক্ষেপ “পারস্পরিক সম্মানের এক চমৎকার নিদর্শন।”
তবে মাচাদোকে ভেনেজুয়েলার নতুন নেতা হিসেবে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ২০২৪ সালের বহুল বিতর্কিত নির্বাচনে জয়ের দাবি করেছিল মাচাদো নেতৃত্বাধীন আন্দোলন।
তার পরিবর্তে ট্রাম্প কাজ করছেন ভেনেজুয়েলায় বর্তমান অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপ্রধান ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে, যিনি মাদুরোর সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট।
তবুও ট্রাম্প বলেছেন, মাচাদোর সঙ্গে সাক্ষাৎ তার জন্য ‘একটি বড় সম্মান। তিনি “একজন অসাধারণ নারী, যিনি অনেক কিছুর মধ্য দিয়ে গেছেন।”
হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর মাচাদো বাইরে জড়ো হওয়া সমর্থকদের উদ্দেশে স্প্যানিশ ভাষায় বলেন, “আমরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর ভরসা করতে পারি।”
পরে তিনি ইংরেজিতে সাংবাদিকদের বলেন, “আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদকটি উপহার দিয়েছি। আমাদের স্বাধীনতার প্রতি তার অনন্য অঙ্গীকারের স্বীকৃতি এটি।”
শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য উদ্রগীব হয়ে আছেন ট্রাম্প। গত বছর মাচাদো এ সম্মান গ্রহণ করলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
বিবিসি এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, তবে এখনো সাড়া পায়নি।

মাচাদো গত সপ্তাহে বলেছিলেন, তিনি পুরস্কারটি ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন। তবে নোবেল কমিটি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই পুরস্কার হস্তান্তরযোগ্য নয়।
কমিটি এক বিবৃতিতে বলেছে, “একবার নোবেল পুরস্কার ঘোষণা হলে তা বাতিল, ভাগ বা অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করা যায় না। এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত এবং চিরস্থায়ী।”
মাচাদো তার পদক হস্তান্তর করার পর কমিটি প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তারা বিবিসিকে আগের বিবৃতির কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের বৈঠকের আগে নোবেল পিস সেন্টার এক্স পোস্টে বলে, “একটি পদকের মালিক বদলাতে পারে, কিন্তু নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীর খেতাব বদলাতে পারে না।”
আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেওয়া মার্কুইস ডি লাফায়েট কীভাবে জর্জ ওয়াশিংটনের প্রতিকৃতি খচিত একটি পদক আধুনিক ভেনেজুয়েলার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সিমন বলিভারকে উপহার দিয়েছিলেন, তা তুলে ধরেন মাচাদো।
তিনি বলেন, ওই উপহারটি ছিল তার দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাধীনতার জন্য ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভ্রাতৃত্বের প্রতীক’।
তিনি বলেন, “ইতিহাসের ২০০ বছর পরে, বলিভারের জনগণ ওয়াশিংটনের উত্তরাধিকারীর কাছে একটি পদক ফিরিয়ে দিচ্ছে—এক্ষেত্রে নোবেল শান্তি পুরস্কারের একটি পদক—আমাদের স্বাধীনতার প্রতি তার (ট্রাম্পের) অনন্য অঙ্গীকারের স্বীকৃতি।”
ওয়াশিংটন সফরের সময় মাচাদো কংগ্রেসেও যান এবং মার্কিন সেনেটরদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় সমর্থকরা ‘মারিয়া, প্রেসিদেন্তে’ স্লোগান ধরেন; নাড়াতে থাকেন ভেনেজুয়েলার পতাকা।
বিবিসি লিখেছে, ধারণা করা হচ্ছিল, ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতে মাচাদো তাকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন যে রদ্রিগেজেরর অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন করা একটি ভুল সিদ্ধান্ত এবং এই রূপান্তরের নেতৃত্ব তার বিরোধী জোটের হাতেই থাকা উচিত।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বৃহস্পতিবার বৈঠক চলাকালে সাংবাদিকদের বলেন, মাচাদো ভেনেজুয়েলার বহু মানুষের জন্য এক অসাধারণ ও সাহসী কণ্ঠস্বর। ট্রাম্প এই বৈঠকের অপেক্ষায় ছিলেন ও ভেনেজুয়েলার বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে খোলামেলা ও ইতিবাচক আলোচনা আশা করছিলেন।
ট্রাম্প এর আগে মাচাদোকে ‘স্বাধীনতার যোদ্ধা’ অভিহিত করলেও মাদুরোকে অপসারণের পর মাচাদোকে ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বে বসানোর ভাবনা নাকচ করেন। ট্রাম্প যুক্তি দেন, ভেনেজুয়েলায় মাচাদোর যথেষ্ট সমর্থন নেই।

গত ৩ জানুয়ারি মাদুরো আটক হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত ভেনেজুয়েলার তেল খাত পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, যা আগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল। বুধবার এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ৫০ কোটি ডলারের ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির প্রথম চালান পাঠিয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ভেনেজুয়েলার তেল বহনের অভিযোগে সন্দেহভাজন ট্যাংকারও যুক্তরাষ্ট্র জব্দ করেছিল। মার্কিন বাহিনী জানায়, বৃহস্পতিবার তারা ষষ্ঠ একটি ট্যাংকারে উঠে অভিযান চালিয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, ভেনেজুয়েলার সরকারের এক দূত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে যাওয়ার কথা রয়েছে, যাতে তিনি মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের দূতাবাস পুনরায় খোলার প্রাথমিক পদক্ষেপ নিতে পারেন।
খবরে বলা হয়, ওই দূত রদ্রিগেজের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও বন্ধু। রদ্রিগেজকে হোয়াইট হাউস ‘অত্যন্ত সহযোগিতাপরায়ণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
বৃহস্পতিবার কারাকাসে জাতির উদ্দেশে বার্ষিক ভাষণে রদ্রিগেজ বলেন, তিনি ওয়াশিংটনে বৈঠকে অংশ নিতে প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনীতিকে ভয় না পাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “যদি কখনো আমাকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ওয়াশিংটনে যেতে হয়, আমি মাথা উঁচু করে, হেঁটে যাব—হামাগুড়ি দিয়ে নয়।”
ট্রাম্প ও রদ্রিগেজ বুধবার ফোনে কথা বলেন। পরে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ‘একজন দারুণ মানুষ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
অন্যদিকে রদ্রিগেজ ফোনালাপকে ‘ফলপ্রসূ’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এ আলাপ ছিল ‘পারস্পরিক সম্মানে’ পূর্ণ।