ট্রাম্পের নতুন শুল্কে সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো। মার্কিনিদের এখন ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা পণ্যে গুণতে হবে ৪৬ শতাংশ শুল্ক, কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে ৪৯ শতাংশ।
Published : 04 Apr 2025, 11:13 AM
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বুধবার শত্রু-মিত্রসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের জন্য নতুন যে শুল্ক আরোপ করেছেন বিশ্বজুড়ে শিগগিরই তার মারাত্মক প্রভাব দেখা যাবে বলে অনেকে মনে করছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) যুক্তরাষ্ট্রের সিংহভাগ মিত্রই ট্রাম্পের শুল্কের নিন্দা জানালেও চীনের নেতারা একে উপহার হিসেবেও দেখতে পারেন।
বিশ্বের বড় পাঁচ অর্থনীতি কীভাবে দেখছে এই শুল্ককে, তাদের ওপর এর তাৎক্ষণিক বা দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবই বা কেমন হতে পারে—বিবিসির প্রতিনিধিরা তাই তুলে আনার চেষ্টা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রকে বিপদে ফেলতে পারে ইউরোপ, তবে উত্তেজনা বাড়াতে নারাজ
ইইউভুক্ত সকল দেশের হয়ে ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডার লিয়েন আমদানি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক ব্যবস্থাপনার নিন্দা জানিয়েছে বলেছেন, এর পরিণতি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে ভোগাবে।
তার কমিশন ইইউ-র ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা নিশ্চিতের অঙ্গীকার করেছে। যদিও জোটভুক্ত কয়েকটি দেশের কিছু কিছু খাতের ব্যবসায়ীরা ট্রাম্পের পদক্ষেপে বেশ বিপাকেই পড়তে যাচ্ছে। এর মধ্যে আছে জার্মানির গাড়ি শিল্প, ইতালির বিলাসদ্রব্য, ফ্রান্সের ওয়াইন ও শ্যাম্পেন উৎপাদকরা।
পরিস্থিতি দেখে বৃহস্পতিবার রাতেই ফরাসী ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক ডাকেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
বিশ্বের একক বৃহত্তম বাজার হওয়ায় অ্যাপল, মেটার মতো বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানসহ নানান মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সেবায় পাল্টা শুল্ক বসিয়ে ইইউ যুক্তরাষ্ট্রকে বিপদে ফেলতে পারে, কিন্তু তাদের আপাত লক্ষ্য হচ্ছে- উত্তেজনা না বাড়িয়ে ট্রাম্পকে আলোচনায় বসতে রাজি করানো।
যেমনটা বুধবার রাতে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেছেন। তার মতে, শুল্ক আরোপ ‘ভুল’, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছাতে সম্ভব সবকিছু করার চেষ্টা করা হবে।
শুল্ক চীনের নেতাদের জন্য উপহার
বুধবার ট্রাম্প সম্পূরক শুল্ক বসানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা পণ্য ঢুকতে এখন ৫৪ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। বিপুল এই শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য বিক্রির চেষ্টা করা চীনা কোম্পানিগুলোকে যে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করবে তাতে তো কোনো সন্দেহই নেই।
বেইজিংয়ের পাল্টা পদক্ষেপও প্রায় দেড়শ কোটি ভোক্তার বিরাট মার্কেটে পণ্য পৌঁছাতে চেষ্টা করা মার্কিন কোম্পানিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
তবে একদিক থেকে দেখলে, শুল্ক নিয়ে ট্রাম্পের নেওয়া নানান পদক্ষেপ আদতে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের জন্য এক ধরনের ‘উপহার’।
শি বিশ্বের কাছে তার দেশকে উপস্থাপন করতে চাইছেন- মুক্ত বাণিজ্যের রক্ষক, বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে।
গত সপ্তাহেও চীনের এই সর্বোচ্চ নেতা আন্তর্জাতিক কর্পোরেশনগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বসেছিলেন, যার মধ্যে ইউরোপের অনেক প্রতিষ্ঠানও আছে। এসবই যে বার্তা দেয়, তা হলো- ডনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে থাকা যুক্তরাষ্ট্র মানেই বিশৃঙ্খলা, বাণিজ্য ধ্বংস, জাতীয় স্বার্থ; অন্যদিকে শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বাধীন চীন মানে স্থিতিশীলতা, মুক্ত বাণিজ্য আর বৈশ্বিক সহযোগিতা।
চীনের সরকার এরই মধ্যে তাদের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম খাতকে ট্রাম্প প্রশাসনের দেওয়া নতুন শুল্কের কড়া সমালোচনা করতে লাগিয়ে দিয়েছে।
বিশ্বের অবস্থান সম্পর্কে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ধারণা নিয়ে মানুষজন বিদ্রুপ করতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- ট্রাম্প যতবারই এ ধরনের পতক্ষেপ নেবেন, ততবারই শি-র বক্তব্য আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে, চীনের নেতারা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন।
সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তাও হয়তো অনেক দেশ ও কোম্পানিকে চীনের দিকে ঠেলে দেবে, যুক্তরাষ্ট্র তখন সরে যাবে আরও দূরে।
খানিকটা স্বস্তি থাকলেও উচ্ছ্বাস নেই যুক্তরাজ্যে
হোয়াইট হাউজের রোজ গার্ডেনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার নতুন শুল্ক ব্যবস্থাপনা ঘোষণা করার পর যুক্তরাজ্য সরকারের অনেককে ফুরফুরে মেজাজে দেখা যাচ্ছে।
এক কর্মকর্তার কথা শুনে মনে হচ্ছে, ট্রাম্পের দৃষ্টিতে ‘খারাপ শিবিরে না থেকে ভালো শিবিরে’ থাকায় তারা খানিক স্বস্তিতেও আছেন।
যদিও এই স্বস্তি কেন, আর কী কী নিয়ে দুশ্চিন্তা করা দরকার, তা নিয়ে আগেভাগে কিছু বলতেও পারছেন না তারা।
আমরা কেবল জানি, যুক্তরাষ্ট্রে যুক্তরাজ্যের রপ্তানি পণ্যে এখন ১০ শতাংশ শুল্ক বসবে।
এই খবর ব্রিটিশ মন্ত্রীদের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তির বাতাবরণ তৈরি করলেও তারা যে খুব একটা আনন্দে আছে, তাও নয়।
যুক্তরাজ্যের ওপর যে শুল্ক বসেছে তার প্রভাব তো আছেই, অংশীদারদের ওপর যে শুল্ক বসেছে তাও চাকরি, বিভিন্ন খাত ও শিল্প এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রবাহে আসছে সপ্তাহ, মাস ও বছরগুলোতে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে।
“এটা বড়সড় বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে,” বলেছে যুক্তরাজ্য সরকারের একটি সূত্র।
এর মধ্যেই গাড়ি শিল্পে ট্রাম্পের শুল্কের প্রভাব নিয়ে বিরাট উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
এসবের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তির আলোচনাও চলছে। যুক্তরাজ্যের চার মধ্যস্থতাকারী এখন তাদের মার্কিন কাউন্টারপার্টদের সঙ্গে ‘নিবিড়’ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে সমঝোতা হলে এরা ওয়াশিংটনে উড়াল দেবেন বলেও বিবিসির প্রতিবেদককে জানানো হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ ভারতে, তবে কিছু খাতের জন্য আশাও আছে
ট্রাম্পের নতুন শুল্কে সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক দেশগুলো। মার্কিনিদের এখন ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা পণ্যে গুণতে হবে ৪৬ শতাংশ শুল্ক, কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে ৪৯ শতাংশ।
সে তুলনায় ভারতের পণ্যে শুল্ক অনেক কম আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও যে ২৬ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বসেছে তাও কম নয়, এবং এটি ‘শ্রমঘন রপ্তানি পণ্যে’ বড় প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এশিয়া ডিকোডেডের প্রিয়াঙ্কা কিশোর।
“প্রবৃদ্ধি যখন থমকে আছে, তখন এই শুল্ক অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও মোট দেশীয় উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলবে বলে মনে হচ্ছে,” বলেছেন তিনি।
তবে ট্রাম্পের শুল্কে ভারতের ইলেকট্রনিক্স পণ্য লাভবান হতে পারে, কারণ এর প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর ওপর মার্কিন শুল্কের পরিমাণ আরও বেশি, যে কারণে ওই দেশগুলো এখন হয়তো তাদের ইলেকট্রনিক্স পণ্যের জন্য অন্য বাজার খুঁজবে।
কানাডা, মেক্সিকো বা ইইউ-র মতো ভারত এখন পর্যন্ত চড়া গলায় ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির সমালোচনা করেনি; তারা উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
কিন্তু এরপরও নয়া দিল্লি বুধবার ট্রাম্পের দেওয়া শুল্কের পাল্টায় নতুন কোনো পদক্ষেপ নেয় কিনা, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
এদিকে ট্রাম্পের শুল্কে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে ভারতের ওষুধ কোম্পানিগুলো। কারণ, ট্রাম্প তার পাল্টা শুল্ক থেকে ওষুধ খাতকে ছাড় দিয়েছেন। এ ওষুধ কোম্পানিগুলো বছরে প্রায় এক হাজার ৩০০ ডলারের পণ্য রপ্তানি করে।
সহায়তা হ্রাসে এমনিতেই বিপর্যস্ত দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য বড় ধাক্কা
ট্রাম্পের বুধবারের শুল্ক আফ্রিকার ডজনেরও বেশি দেশকে নতুন করে বিপর্যয়ে ফেলবে। নতুন মার্কিন শুল্ক নীতিতে এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ আফ্রিকার কোনো পণ্য ঢুকতে গেলে দেওয়া লাগবে ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, লেসোথোর ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি, ৫০ শতাংশ।
বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমে যাওয়ায় এমনিতেই আফ্রিকার অনেক দেশ ভুগছিল, তার মধ্যে এ ধাক্কা।
দক্ষিণ আফ্রিকার মতো মহাদেশটির বড় অর্থনীতির অনেক দেশ, যেমন নাইজেরিয়া ও কেনিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ছিল।
ওয়াশিংটনের নতুন শুল্ক ব্যবস্থাপনা দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এতদিনকার অর্থনৈতিক সম্পর্ককে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
দক্ষিণ আফ্রিকাকে ট্রাম্প রেখেছেন তার ‘বাজে অপরাধী’ দেশের দীর্ঘ তালিকায়; যাদেরকে ‘অন্যায্য বাণিজ্য নীতির খেসারতে’ বেশি শুল্ক দিতে হবে, বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
“দক্ষিণ আফ্রিকায় খারাপ কিছু হচ্ছে। আপনারা জানেন, আমরা তাদেরকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দিতাম, সেই অর্থ কমিয়ে দিয়েছি কারণ সেখানে অনেক খারাপ কাজ হচ্ছে,” বলেন ট্রাম্প।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ককে ‘শাস্তিমূলক’ অ্যাখ্যা দিয়েছে।
“এটি বাণিজ্য ও যৌথ সমৃদ্ধির পথে বাধা হিসেবে কাজ করবে,” বিবৃতিতে বলেছে তারা।