Published : 12 Mar 2026, 12:34 PM
হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের অপরিশোধিত তেলের প্রবাহ প্রায় স্বাভাবিক থাকলেও সঙ্কীর্ণ ওই জলসীমায় একাধিক নৌযানে তেহরান-সংশ্লিষ্ট হামলায় উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোর রপ্তানি প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে।
তেলের ট্যাংকারের গতিবিধি সংক্রান্ত তথ্যউপাত্ত পর্যালোচনা করে এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা শুরু করার পর এ পর্যন্ত তেহরান প্রায় এক কোটি ৩৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করতে পেরেছে বলে জানাচ্ছে ট্যাংকারট্র্যাকার্স ডটকম; পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞায় থাকা দেশগুলো তেল-গ্যাস পরিবহনে যে তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা নৌযানের নেটওয়ার্ককে কাজে লাগায় সেগুলোর গতিবিধির ওপর লক্ষ্য রাখায় দক্ষ এ সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থাটি।
অন্যদিকে নৌযানের গতিপথ অনুসরণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের অনুমান, ইরান মার্চের প্রথম ১১ দিনে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পাল্টায় ইরান তেল আবিব, হাইফা, দখলকৃত জেরুজালেমসহ ইসরায়েলের বিভিন্ন জায়গায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে লাগাতার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে বিভিন্ন দেশের জ্বালানি অবকাঠামো এবং হরমুজ প্রণালিতে থাকা জাহাজও রয়েছে।
এসব কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সিংহভাগ তেল রপ্তানির প্রধান জলপথ দিয়ে ইরানি নয় এমন নৌযানের চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে এবং ওই অঞ্চলের তেল উত্তোলনকারীরাও তাদের উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে, বলছে রয়টার্স।
সেরকম কোনো বাধা ছাড়াই ইরান যেভাবে তার তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখতে পেরেছে তার সঙ্গে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের ব্যাপক বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। ভেনেজুয়েলা থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের আগেই ওয়াশিংটন লাতিনের দেশটির ওপর নৌ অবরোধ দেয় এবং ভেনেজুয়েলার জলসীমায় ঢুকতে বা বের হতে চাওয়া নৌযানগুলোকে জব্দ করে।
“গত ডিসেম্বরে ভেনেজুয়েলা সংক্রান্ত নৌযান জব্দে তাদের যে সাফল্য, এখানে (মধ্যপ্রাচ্য) সংঘাত শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র সেরকম কোনো অভিযান শুরু, কিংবা এখন পর্যন্ত এ ধরনের কিছু না করায় আমি হতবাক,” বলেছেন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোন কমপ্লায়েন্স সার্ভিসের পরিচালক ডেভিড তানেনবম।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরান-সংশ্লিষ্ট ট্যাংকারকে থামানোর উদ্যোগ নিলে তা হরমুজ প্রণালি পার হতে চাওয়া নৌযানগুলোর ওপর আরও হামলার পথ করে দিতে পারে বলে মনে করছেন তেল ও জাহাজ চলাচল বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ন্ক্সেট ব্যারেলের মাতিয়াস তোগনি।
যতক্ষণ পর্যন্ত ইরানের নৌযান ওই অঞ্চল দিয়ে চলাচলের সুযোগ পাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তেহরান খানিকটা হলেও হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতে চাইবে, বলেছেন জাহাজ ব্যবসায় বিনিয়োগকারী ও জাহাজ চলাচল, সামুদ্রিক বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরামর্শক ক্যাভেলিয়ারের প্রতিষ্ঠাতা জেমস লাইটবর্ন।
“যুক্তরাষ্ট্র যদি ট্যাংকার জব্দ করা শুরু করতো, তাহলে প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ (মাইন দিয়ে বা অন্য কোনোভাবে) করে দিলেও ইরানের কিছু যেত-আসত না,” বলেছেন লাইটবর্ন।
ইরানের তেল রপ্তানির বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে রয়টার্স মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া পায়নি।
ইরানের রপ্তানি চলছে গত বছরের গতিতেই
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত ইরান যে প্রতিদিন ১১ থেকে ১৫ লাখ ব্যারেল করে তেল রপ্তানি করতে পেরেছে ট্যাংকারট্র্যাকার ডটকম ও কেপলারের তথ্যে তার ইঙ্গিত মিলেছে। গত বছর দেশটির গড় রপ্তানি ছিল প্রতিদিন ১৬ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল, বলছে কেপলারের রেকর্ড।
সামনের দিনগুলোতে ইরানের রপ্তানির পরিমাণ বাড়তেও পারে। সর্ববৃহৎ তেলবাহী নৌযানসহ একাধিক বড় অপরিশোধিত তেলের ক্যারিয়ার ইরানের খারগ দ্বীপের রপ্তানি হাবে এখনও তেল লোড করে যাচ্ছে বলে ট্যাংকারট্র্যাকার্স ডটকম পর্যালোচিত একাধিক উপগ্রহের ছবিতে দেখা যাচ্ছে।
মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযান শুরুর আগেই হামলা যে আসন্ন তা বুঝতে পেরে ইরান ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন প্রায় ২১ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল করে রপ্তানি করেছে, বলছে কেপলারের তথ্য। এর মধ্যে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সপ্তাহে তারা প্রতিদিন প্রায় ৩৭ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল করে রেকর্ড তেল রপ্তানি করেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারির পর অপরিশোধিত তেলবাহী ৬টি ট্যাংকার ইরান থেকে বেরিয়েছে বলে জানাচ্ছে কেপলার ও লয়েড’স লিস্ট ইন্টিলিজেন্সের পর্যালোচনা। এ ট্যাংকারগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় থাকা নৌযান কুমা’ও আছে, যেটি চলতি সপ্তাহে ইরান ছেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় থাকা দুটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ট্যাংকারও কার্গো লোড শেষে শুক্রবার ইরান ছেড়েছে বলে রয়টার্স আগে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল।
অন্তত ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ইরান থেকে বেরিয়েছে, যার মধ্যে চারটি সুপার ট্যাংকারে থাকা ৮০ লাখ ব্যারেল তেল সিঙ্গাপুরের কাছাকাছি জলসীমায় পৌঁছেছে বলে পৃথক এক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে।
এ নৌযানগুলো ইরানের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল দিয়ে চলাচলের পুরনো পদ্ধতিই অনুসরণ করে আসছে। এ বিশেষ অঞ্চলটি ইরানের ভূখণ্ডগত জলসীমা ১২ নটিক্যাল মাইল ছাড়িয়ে কোথাও কোথাও ২৪ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত।