Published : 13 May 2026, 03:57 PM
চীন সফরে রওনা হওয়ার আগে দেশটির বাজার যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক স্বার্থে ‘উন্মুক্ত’ করার তাগিদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
এই লক্ষ্যে বেইজিংয়ে যাত্রাপথে আলাস্কায় যাত্রাবিরতি করছিলেন ট্রাম্প। এখানে তার সফরসঙ্গী প্রধান নির্বাহীদের (সিইও) দলে যুক্ত করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়া প্রধান জেনসেন হুয়াংকে।
গত প্রায় এক দশকের মধ্যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটিই প্রথম চীন সফর। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জনসমর্থনে টান পড়ায় ট্রাম্প এই সফর থেকে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করে নিজের রেটিং পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে আছেন, লিখেছে রয়টার্স।
ট্রাম্প যখন এই বর্ণাঢ্য সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তার শীর্ষ বাণিজ্য আলোচক স্কট বেস্যান্ট দক্ষিণ কোরিয়ায় চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা শেষ করেছেন। গত বছর বিশ্বের দুই শীর্ষ অর্থনীতির মধ্যে হওয়া ভঙ্গুর বাণিজ্য চুক্তিটি টিকিয়ে রাখাই ছিল এই আলোচনার মূল লক্ষ্য।
ট্রাম্পের সফরসঙ্গী সিইওদের অধিকাংশই এমন সব কোম্পানির প্রতিনিধিত্ব করছেন, যারা চীনের সঙ্গে ব্যবসায়িক জটিলতা নিরসনে আগ্রহী।
এর মধ্যে অন্যতম এনভিডিয়া, যারা দেশটিতে তাদের শক্তিশালী ‘এইচ-২০০’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চিপ বিক্রির অনুমতি পেতে লড়াই করছে।
নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, “আমি প্রেসিডেন্ট শি (জিনপিং) -কে অনুরোধ করব যেন তিনি চীনের বাজার ‘উন্মুক্ত’ করে দেন, যাতে এই অসাধারণ মেধাবী মানুষগুলো তাদের জাদু দেখাতে পারেন। এটিই হবে আমার প্রথম অনুরোধ।”
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প হুয়াংকে এই সফরে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। আলাস্কায় এয়ার ফোর্স ওয়ানের জ্বালানি নেওয়ার বিরতির সময় হোয়াইট হাউজ সংবাদকর্মীরা তাকে বিমানে উঠতে দেখেন।
বুধবার রাতে বেইজিং পৌঁছাবেন ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার প্রেসিডেন্ট শি-য়ের সঙ্গে তার বৈঠকের কথা রয়েছে। সফরের বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল এ রাজকীয় সংবর্ধনা, ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য স্থাপনা ‘টেম্পল অব হেভেন’ পরিদর্শন এবং রাষ্ট্রীয় ভোজসভা।
দুই পক্ষের আলোচনায় বাণিজ্য ছাড়াও ইরান যুদ্ধ থেকে শুরু করে তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো উঠে আসবে। ধারণা করা হচ্ছে, তেহরানকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তিতে রাজি করাতে চীনের সহায়তা চাইবেন ট্রাম্প। যদিও এর আগে তিনি বলেছিলেন যে, এ বিষয়ে তার কারো সাহায্যের প্রয়োজন নেই।
এদিকে বুধবারই তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির কঠোর বিরোধিতা পুনর্ব্যক্ত করেছে চীন। তাইওয়ানের জন্য বরাদ্দকৃত ১৪০০ কোটি ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ বর্তমানে ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।

ট্রাম্প যখন এয়ার ফোর্স ওয়ানে হুয়াং ও ইলন মাস্কের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলেন, তখন দক্ষিণ কোরিয়ার ইনছন বিমানবন্দরে চীনা ভাইস প্রিমিয়ার হে লিফেং-এর সঙ্গে তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন স্কট বেস্যান্ট।
গত অক্টোবরের শুল্ক যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি বজায় রাখতে দুই পক্ষই আগ্রহী, যার মাধ্যমে ট্রাম্প চীনা পণ্যে শুল্ক স্থগিত করেছিলেন এবং শি বিরল খনিজ সরবরাহ সচল রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন চীনের কাছে বোয়িং বিমান, কৃষি পণ্য ও জ্বালানি বিক্রি করে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চায়। বিপরীতে বেইজিং চিপ তৈরির সরঞ্জাম ও উন্নত সেমিকন্ডাক্টরের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এবার কিছুটা দুর্বল অবস্থানে থেকে আলোচনায় বসছেন। আদালত আন্তর্জাতিক পণ্যে যথেচ্ছ শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে তার ক্ষমতায় লাগাম টেনেছে।
অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট মুদ্রাস্ফীতি নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বেইজিংভিত্তিক ভূ-রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘উসাওয়া অ্যাডভাইজরি’-এর প্রতিষ্ঠাতা লিউ কিয়ানের মতে, “গত বছরের বাণিজ্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান স্থিতাবস্থা বজায় রাখাই এখন বড় খবর। চীনের চেয়ে ট্রাম্প প্রশাসনেরই এই বৈঠকটি বেশি প্রয়োজন, যাতে তারা ভোটারদের দেখাতে পারেন যে চুক্তি হচ্ছে এবং অর্থ আসছে।”
চীনের উদ্দেশে যাত্রার আগে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এই সফর নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। প্রেসিডেন্ট শি-কে ‘বন্ধু’ সম্বোধন করে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আপনারা দেখবেন ভালো কিছু ঘটতে যাচ্ছে। এটি একটি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ সফর হতে চলেছে।”
ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে শি জিনপিং সহায়তা করবেন কি না, এমন প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, “হতে পারে। তবে আমার মনে হয় না ইরানের বিষয়ে আমাদের কোনো সাহায্যের প্রয়োজন আছে। তারা সামরিকভাবে পরাজিত। তারা হয় সঠিক কাজটি করবে, নতুবা আমরা আমাদের কাজ শেষ করব।”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, চীনের সঙ্গে আলোচনার অনেক বিষয়ের মধ্যে ‘বাণিজ্য’ হবে অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। তিনি বলেন, “আমরা প্রেসিডেন্ট শির সঙ্গে অনেক বিষয়ে কথা বলব। তবে আমি বলব অন্য সবকিছুর চেয়ে বাণিজ্যই হবে প্রধান বিষয়।”
প্রতিনিধি দলে টেক ও ব্যবসায়িক নেতারা
এই সফরে ট্রাম্প এক বিশাল বহর নিয়ে এয়ার ফোর্স ওয়ানে চড়েন। তার সঙ্গী হিসেবে রয়েছেন ছেলে এরিক ট্রাম্প ও পুত্রবধূ লারা ট্রাম্প।
এ ছাড়া প্রতিনিধি দলে আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এবং হোয়াইট হাউজের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ জেমস ব্লেয়ার, ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজর রবার্ট গ্যাব্রিয়েল ও অ্যাম্বাসেডর মনিকা ক্রাউলি।
হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এক ডজনেরও বেশি প্রভাবশালী ব্যবসায়িক ও প্রযুক্তি নেতা এই মার্কিন প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে যাচ্ছেন।
তালিকায় রয়েছেন অ্যাপল সিইও টিম কুক, টেসলা ও স্পেসএক্স সিইও ইলন মাস্ক, ব্ল্যাকরক সিইও ল্যারি ফিংক, ব্ল্যাকস্টোন সিইও স্টিফেন এ. শোয়ার্জম্যান, বোয়িং সিইও কেলি ওর্টবার্গ, কারগিল সিইও ব্রায়ান সাইকস, সিটি সিইও জেন ফ্রেজার, সিসকো সিইও চাক রবিনস, কোহিরেন্ট সিইও জিম অ্যান্ডারসন এবং জিই অ্যারোস্পেস সিইও এইচ লরেন্স কাল্প।
প্রতিনিধি দলে আরও আছেন গোল্ডম্যান স্যাকসের ডেভিড সলোমন, ইলুমিনা সিইও জ্যাকব থায়সেন, মাস্টারকার্ড সিইও মাইকেল মিবাচ, মেটা কর্মকর্তা ডিনা পাওয়েল ম্যাককর্মিক, মাইক্রন সিইও সঞ্জয় মেহরোত্রা, কোয়ালকম সিইও ক্রিশ্চিয়ানো আমন এবং ভিসা সিইও রায়ান ম্যাকইনারনি।
প্রযুক্তি, অর্থায়ন, মহাকাশ গবেষণা, উৎপাদন এবং বৈশ্বিক পেমেন্ট খাতের এই প্রভাবশালী করপোরেট নেতৃত্বের অংশগ্রহণ ট্রাম্পের এই সফরের গুরুত্বকে প্রতিফলিত করছে।
আরও পড়ুন:
ইরান যুদ্ধ শেষ করতে চীনের 'সাহায্যের প্রয়োজন নেই' ট্রাম্পের