Published : 06 Apr 2026, 02:18 PM
ইরানি ভূখণ্ডে আটকে পড়া ক্রু’কে উদ্ধারের অভিযান প্রায় নিখুঁতভাবেই শেষ হয়ে এসেছিল।
শত্রুর চোখ এড়িয়ে রাতের আঁধারে ইরানের ভেতর ঢুকে পড়েছিল মার্কিন কমান্ডোরা, ৭ হাজার ফুট উঁচু পর্বতশৃঙ্গ পাড়ি দিয়ে মার্কিন ওই অস্ত্র বিশেষজ্ঞকে রোববার ভোরের আগেই নিয়ে গিয়েছিল আগে থেকে ঠিক করে রাখা গোপন নিরাপদ স্থানে।
এরপরই সব থেমে গেল।
যে দুটি এমসি-১৩০ উড়োজাহাজ বিশেষ বাহিনীর শ’খানেক সেনাকে তেহরানের দক্ষিণে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছে দিয়েছিল, যান্ত্রিক ত্রুটিতে পড়ে ফিরতি যাত্রায় সে দুটি আর উড়তে পারছিল না, নাম না প্রকাশ করার শর্তে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এমনটাই বলেছেন মার্কিন এক কর্মকর্তা।
বিমান উড়তে না পারায়—হঠাৎ করেই বিশেষ বাহিনীর কমান্ডোরা শত্রু এলাকায় আটকা পড়ার ঝুঁকির মুখোমুখি হলেন।
এই পরিস্থিতিতে তাদের কমান্ডাররা নিলেন ‘মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ’ সিদ্ধান্ত। তারা নির্দেশ দিলেন অতিরিক্ত বিমান ইরানে পাঠানোর, যাতে দলটিকে ধাপে ধাপে উদ্ধার করা যায়।
“যদি কোনো ‘হোলি শিট’ মুহূর্ত থেকে থাকে, সেটাই ছিল,” সেনাদের বাঁচাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশংসা করে এমনটাই বলেছেন ওই কর্মকর্তা।
তিনি এবং অন্য যারাই উদ্ধার অভিযান সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে কথা বলেছেন, তাদের সবাইকেই রয়টার্স নাম-পরিচয় গোপন রাখা হবে বলে আশ্বস্ত করেছিল।
কমান্ডারদের ওই জুয়া কাজে লেগেছিল। ইরানে উদ্ধারে নামা সেনাদের ধাপে ধাপে শত্রু এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে মার্কিন বাহিনী ইরানের ভেতর অকার্যকর হয়ে পড়া দুটি এমসি-১৩০ এবং আরও চারটি হেলিকপ্টার ধ্বংস করে দেয়, যেন সংবেদনশীল কোনো উপকরণ ইরানিদের হাতে না পড়ে।
উদ্ধার অভিযান নিয়ে অনামা কর্মকর্তাদের এ ভাষ্য ঠিক কিনা, বা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য আছে কিনা সে বিষয়ে রয়টার্স পেন্টাগনের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পায়নি।
শেষ পর্যন্ত সফলভাবে শেষ হওয়া এ উদ্ধার অভিযান ছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ছয় সপ্তাহ ধরে চলা সংঘাতের অন্যতম দুরূহ পর্বগুলোর একটি।
এই পর্বে কোনো হোঁচট অনেক মার্কিনির প্রাণহানি যেমন ঘটাতে পারতো তেমনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ওপরও ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করতে পারতো। তাও এমন এক সময়ে যখন, এরই মধ্যে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়াবেন কিনা তা নিয়ে ট্রাম্প ভাবছেন।
ভূপাতিত বিমানের ক্রু লুকিয়ে ছিলেন, করেন যোগাযোগ
মার্কিন যে অস্ত্র বিশেষজ্ঞকে উদ্ধারে বিশেষ বাহিনী পাঠানো হয়েছিল, তিনি ছিলেন শুক্রবার ভূপাতিত এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমানের দুই ক্রু’র মধ্যে দ্বিতীয়জন। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনাই যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করে, বলেছিল তেহরান।
মার্কিন ওই কর্মকর্তা বলছেন, ইস্পাহানের ওপর দিয়ে ওড়ার সময় বিমানটি ভূপাতিত হয়, তার মধ্যেই ভেতরে থাকা দুই ক্রু আলাদা আলাদাভাবে বেরিয়ে আসেন।
পাইলটকে অল্প সময়ের মধ্যেই উদ্ধারে সক্ষম হয় ওয়াশিংটন। কিন্তু অন্যজন ইরানি ভূখণ্ডে রয়ে যান।
মার্কিন বিমান বাহিনীর সদস্যরা শত্রু এলাকায় টিকে থাকা, ছদ্মবেশ নেওয়া, প্রতিরোধ গড়া ও পালানোর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, কিন্তু তাদের মধ্যে অল্প ক’জনই ফারসি ভাষায় পারদর্শী। শত্রুদের নজর এড়িয়ে উদ্ধারে সহায়তা চাওয়াও বেশ চ্যালেঞ্জের।
ট্রাম্প পরে জানান, যে অস্ত্র বিশেষজ্ঞকে উদ্ধারে দল পাঠানো হয়েছিল তিনি কর্নেল পদমর্যাদার।
মার্কিন এ কর্মকর্তার গোড়ালি মচকে গিয়েছিল এবং তিনি পাহাড়চূড়ায় একটি ফাটলের ভেতর লুকিয়ে ছিলেন বলে অভিযান সম্বন্ধে খানিকটা অবগত এক মার্কিন সূত্র রয়টার্সকে বলেছে।
ভূপাতিত এফ-১৫ই ঈগলের দ্বিতীয় এ ক্রু মার্কিন সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং নিজের পরিচয় নিশ্চিত করেন। তার পরিচয় পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী তার দেওয়া তথ্যে উদ্ধার অভিযানে যেত না, কেননা এতে শত্রুপক্ষের পাত ফাঁদে পা দেওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা থাকে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এর আগে শত্রুপক্ষের চোখে ধুলা দেওয়ার কার্যক্রমে নামে। তেহরানকে বিভ্রান্ত করতে তারা ইরানি কর্মকর্তাদের কাছে এই তথ্য পৌছে দেয় যে, মার্কিন বাহিনী ওই ক্রুকে শনাক্ত করেছে এবং তাকে উদ্ধারে অভিযানও শুরু হয়েছে। অথচ সেসময় আসল উদ্ধার অভিযান শুরুই হয়নি, বলেছেন ট্রাম্প প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা।
পাশাপাশি মার্কিন সামরিক বাহিনীও কিছু বাড়তি পদক্ষেপ নেয়। তারা উদ্ধার সংশ্লিষ্ট এলাকার আশপাশে ইলেকট্রনিক যোগাযোগ ব্যাহত করতে জ্যামিং শুরু করে এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে বোমাবর্ষণে নামে নামে, বলেছে পরিকল্পনা সম্বন্ধে অবগত ওই মার্কিন সূত্র।
শনাক্ত হওয়া ক্রু ও তাকে উদ্ধারে পাঠানো দলের সদস্যদের ইরান থেকে বের করে আনতে শেষ পর্যন্ত তুলনামূলক ছোট ও হালকা টার্বোপ্রপ উড়োজাহাজ পাঠানো হয়, যেগুলো ছোট এয়ারফিল্ডেও অবতরণে সক্ষম।
পুরো অভিযান চলাকালে হোয়াইট হাউস, পেন্টাগন এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড ‘অস্বাভাবিক রকম চুপচাপ’ ছিল। ট্রাম্প এতটাই নীরব ছিলেন যে তিনি চিকিৎসাধীন কিনা তা জানতে স্থানীয় এক প্রতিবেদক ওয়াল্টার রিড হাসপাতালেও খোঁজ নিয়েছিলেন।
অভিযান শেষ হওয়ার পর ট্রাম্প বীরদর্পে স্বরূপে ফিরে আসেন।
“গত কয়েক ঘণ্টায়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃসাহসী তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযানগুলোর একটি সম্পন্ন করেছে,” বিবৃতিতে বলেন তিনি।
সঙ্গে জানান, ভূপাতিত এফ-১৫ই ঈগলের দ্বিতীয় ক্রু আহত, তবে ‘তিনি ঠিক হয়ে যাবেন’।
ইরানিরা ‘ছেড়ে কথা বলছে না’
ওই এফ-১৫ই ভূপাতিত হওয়ার পর প্রাথমিক উদ্ধার অভিযান চলাকালে মার্কিন বাহিনী ইরানের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়েছিল, তার মধ্যেই তারা পাইলটকে উদ্ধারে সক্ষম হয়।
শুক্রবার এক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানায়, উদ্ধার অভিযানে যাওয়া দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারে ইরানিরা আঘাত হানতে পারলেও সেগুলো ইরানি আকাশসীমা পার হতে সক্ষম হয়।
অন্য এক ঘটনায় সেদিনই কুয়েতের আকাশে আঘাতপ্রাপ্ত ও পরে বিধ্বস্ত একটি এ-১০ ওয়ারথগের পাইলটও যুদ্ধবিমানটি থেকে জীবিত বের হয়ে আসতে সক্ষম হন বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। বিমানটির চালক কতটুকু আহত হয়েছেন সে সম্বন্ধে কিছু জানা যায়নি।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের কয়েক দিন আগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলর হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাতে এখন পর্যন্ত তাদের ১৩ সেনা নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে তিন শতাধিক। এ সময়ের ভেতর কোনো মার্কিন সেনা ইরানিদের হাতে বন্দি হয়নি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ট্রাম্প বারবার ইরানি সেনাবাহিনী ‘বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত’ হয়ে আছে বলে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছেন; তার মধ্যেই তেহরান যে একের পর এক উড়োজাহাজ ভূপাতিত করতে পারছে তাকে ‘অভাবিত’ বলেই মানছেন সমর বিশ্লেষকরা।
শনিবার ইরানের সামরিক বাহিনীর একীভূত কমান্ড খাতামুল আম্বিয়া সদরদপ্তর নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শুক্রবার এক মার্কিন যুদ্ধজাহাজে আঘাত হানা হয়েছে বলে দাবি করেছিল।
যুদ্ধ মাসখানেক পেরিয়ে যাওয়ার পরও ইরানের যে এখনও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার সক্ষমতা রয়ে গেছে, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যেই তা দেখা যাচ্ছে বলে রয়টার্স প্রথম খবর প্রকাশ করেছিল।
মাত্র সপ্তাহখানেক আগে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত হয়েছিল, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের মাত্র এক তৃতীয়াংশই ধ্বংস করতে পেরেছে।
বাকি এক তৃতীয়াংশের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা অজানা, তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের লাগাতার বোমাবর্ষণে ভূগর্ভস্থ টানেল ও বাংকারে থাকা ওই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত, ধ্বংস বা চাপা পড়ে থাকতে পারে, একাধিক সূত্র এমনটাই বলেছিল রয়টার্সকে।
এদিকে সফল উদ্ধার অভিযানে ‘স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা’ ট্রাম্প রোববার স্বরূপে ফিরেই তেহরানকে কড়া হুমকি দিয়েছেন। বলেছেন, মঙ্গলবারের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ইরানের তেল স্থাপনা, সেতুসহ বেসামরিক নানা অবকাঠামোতে তুমুল হামলা করা হবে।
যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়েই বিশ্বের তেল-গ্যাসের এক পঞ্চমাংশ গন্তব্যে যেত। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর তেহরান ওই প্রণালিটি নিজেদের কব্জায় নিয়ে কার্যত বন্ধ করে রেখেছে। কেবল ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের নৌযানই এখন গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথটি পার হতে পারছে।