পরিযায়ী পাখিদের দিকভ্রান্তির কারণ অদ্ভুত এই ‘জেট ল্যাগ’
পরিণত ও অভিজ্ঞ পাখিদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব অনেকটাই সীমিত। এরা ওড়ার অবস্থাতেই নিজেদের দিক শুধরে নিতে পারে।
সমুদ্রের দূরদূরান্তে খাবারের খোঁজে সফর শেষে নিজ ভিটায় ফেরার পথে প্রাকৃতিক এক বাধার শিকার হচ্ছে সামুদ্রিক পাখিরা।
গবেষকরা বলছেন, দ্রুতগতির দীর্ঘ ভ্রমণের ফলে স্থানীয় সময়ের সঙ্গে পাখিদের দেহের ভেতরের নিজস্ব ‘জৈব ঘড়ি’ বা ‘বডি ক্লক’-এর তাল কেটে গেলে এ বিভ্রান্তি তৈরি হয়, যাকে বলে ‘জেট ল্যাগ’।
এ জেট ল্যাগ পাখিদের নির্ধারিত পথ থেকে শত শত মাইল দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
যুক্তরাজ্যের পশ্চিম উপকূলের ‘ম্যানক্স শেয়ারওয়াটার’ পাখির জিপিএস ট্র্যাকিং ডেটা বিশ্লেষণ করে এই তথ্যের সন্ধান মিলেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে খাবারের সন্ধান শেষে পূর্বে নিজ কলোনির দিকে ফেরার সময় দ্রাঘিমারেখা পেরনোর ফলে স্থানীয় সময়ের সঙ্গে পাখিদের জৈব ঘড়ির ফারাক তৈরি হয়।
এতে এদের সময়ের হিসাব ও দিকনির্ণয় ব্যবস্থায় সাময়িক ব্যাঘাত ঘটে। তবে পরিণত ও অভিজ্ঞ শেয়ারওয়াটার পাখিদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব অনেকটাই সীমিত। এরা ওড়ার অবস্থাতেই নিজেদের দিক শুধরে নিতে পারে।
ক্ষেত্রবিশেষে অভিজ্ঞ পাখিরা সর্বোচ্চ ১৫ ডিগ্রির মতো মূল পথ থেকে বিচ্যুত হলেও পথ সংশোধন করে নেওয়ার ফলে ৬০০ মাইলের দীর্ঘ যাত্রায় এদের সর্বোচ্চ তিন মাইলের মতো বাড়তি দূরত্ব পেরতে হয়।
‘ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড’-এর আচরণ ও পরিবেশবিজ্ঞানী ড. প্যাট্রিক লিউইন ও তার গবেষক দলের ২০ বছরের তথ্য পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, অভিজ্ঞ পাখিরা সামলে নিতে পারলেও অপেক্ষায় অনভিজ্ঞ তরুণ পাখিরা বিপাকে পড়ে।
জীবনের প্রথম দিকে দূরবর্তী সফরে যাওয়া পাখির দল এ জেট ল্যাগের প্রভাবে মূল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে শত শত মাইল ভুল দিকে উড়ে যাওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।
পাখিদের জৈব ঘড়ি সংক্রান্ত অধিকাংশ গবেষণা অতীতে গবেষণাগারের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে হলেও বুনো পরিবেশের পাখিদের ওপর নতুন করে আলোকপাত করেছে এ গবেষণা।
গবেষক প্যাট্রিক লিউইন বলেছেন, “পাখির অভ্যন্তরীণ ঘড়ি বা বডি ক্লকও জেট ল্যাগের শিকার হতে পারে। ফলে পাখিদের দিক ভুল করে অন্য পথে উড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।”
অন্যান্য বহু প্রাণীর মতো সামুদ্রিক শেয়ারওয়াটার পাখিও চলাচলের সময় সূর্যকে কম্পাস হিসেবে ব্যবহার করে।
তবে পৃথিবীর আবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আকাশে সূর্যের অবস্থানের পরিবর্তনের হিসাব রাখতে পাখিদের দেহের ভেতরের ‘বডি ক্লক’ বা জৈব ঘড়ির ওপর নির্ভর করতে হয়।
সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় এই জৈব ঘড়ি স্থানীয় সময়ের সঙ্গে নিজেদের মিলিয়ে নিতে সাহায্য করে।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ।
ড. লিউইন বলেছেন, স্থানীয় সময়ের সঙ্গে পাখিদের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির এ গরমিলের কারণে আকাশে সূর্যের অবস্থান আশানুরূপ না থাকলে তারা পথ হারিয়ে ফেলতে পারে।
পাখিরা উপকূল ধরে ওড়ার সময়ও এসব ভুল ধরে ছিল, বিশেষ করে যেখানে পথ চেনার জন্য পরিচিত ভূখণ্ড থাকার কথা ছিল। এটা এ ধারণাকেই আরও জোরালো করেছে যে, দিক ঠিক রাখার ক্ষেত্রে সূর্যের ভূমিকা প্রধান।
লিউইন বলেছেন, “পরিণত শেয়ারওয়াটার পাখিদের সার্বিক যাত্রায় এই ল্যাগের প্রভাব খুবই সামান্য। ১ হাজার কিলোমিটারের যাত্রায় ভুলত্রুটির কারণে বড়জোর ৫ কিলোমিটার পথ বেশি ঘুরতে হয়।”
“তবে প্রথমবারের মতো তরুণ পাখিদের ক্ষেত্রে সূর্যের কম্পাসের এই ভুলের কারণে দিক পরিবর্তনের ফলে এরা শত শত কিলোমিটার পথ বিচ্যুত হতে পারে। কারণ, হারিয়ে গেলে নিজেদের নতুন করে দিক চেনার মতো কোনো ‘ম্যাপ সেন্স’ বা অভিজ্ঞতা এদের থাকে না।”
এ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও ‘ব্যাংকোর ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক রিচার্ড হল বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা বলে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেছেন, “এটা পরীক্ষাগারের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের বাইরে বুনো প্রাণীদের মধ্যেও এ ধারণাকে সত্য প্রমাণ করেছে যে, দিনের বেলার প্রাণীরা অনেক সময় নিখুঁত না হলেও সূর্যের কম্পাসের ওপরই বেশি ভরসা করে।”
‘ম্যানক্স শেয়ারওয়াটার’ পাখিরা এদের জীবনের বেশিরভাগ সময় সমুদ্রের গভীরে কাটিয়ে দেয়। বড় দূরত্ব পেরলেও এরা প্রতিবছর প্রজননের জন্য যুক্তরাজ্যের পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন দ্বীপে ফিরে এসে মাটির গর্তে বসবাস করে।
অধ্যাপক হল বলেছেন, “এই দিকভ্রান্ত হওয়ার ফলে পাখিদের ওপর শেষ পর্যন্ত কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তা এ গবেষণায় পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কারণ শেষ পর্যন্ত পাখিরা কলোনিতে ফিরে আসে ও ভুলের পরিমাণও কম।”
