১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

ব্ল্যাক হোল ও তারার মিশ্রণে নতুন মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান মিলল

তারা ও ব্ল্যাক হোলের অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ এ মহাজাগতিক বস্তুটি মহাবিশ্বের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে জটিল কিছু রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ব্ল্যাক হোল ও তারার মিশ্রণে নতুন মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান মিলল
এর আগে মহাবিশ্বে এমন কোনো বস্তুর উপস্থিতি দেখা যায়নি। ছবি: এমআইটি

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 14 Aug 2026, 02:31 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:50 PM

মহাকাশে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এক মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।

‘ব্ল্যাক হোল স্টার’ বা ব্ল্যাক হোল তারা নামের এই বস্তুটি দেখতে আমাদের সৌরজগতের সমান বড় এক সূর্যের মতো। বস্তুটি সাধারণ যে কোনো তারার তুলনায় ১০ হাজার কোটি গুণ শক্তি নির্গত করছে, যা একটি ব্ল্যাক হোলের আচরণের সঙ্গে মেলে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।

গবেষকরা বলছেন, এটি তারা ও ব্ল্যাক হোলের এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ। আর মহাবিশ্বের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে জটিল কিছু রহস্য উন্মোচনে বস্তুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ উৎক্ষেপণের পর থেকে তোলা প্রায় প্রতিটি ছবিতে বিজ্ঞানীরা অসংখ্য ‘ছোট লাল বিন্দু’ দেখতে পেয়েছেন। মহাকাশজুড়ে এগুলোর ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও এগুলো আসলে কী তা নিয়ে এতদিন সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা ছিল না।

নতুন এ গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, সেইসব লাল বিন্দুর সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হচ্ছে এই ‘ব্ল্যাক হোল স্টার’। এর আগে মহাবিশ্বে এমন কোনো বস্তুর উপস্থিতি দেখা যায়নি।

মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং-এর পরপরই কীভাবে সূর্য অপেক্ষা কোটি কোটি গুণ ভারী দানবাকার ব্ল্যাক হোলগুলো গঠিত হতে পেরেছিল বিজ্ঞানীদের এই দীর্ঘদিনের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে নতুন এ আবিষ্কার।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের অনুমান, বস্তুটি ঘন ও বিশাল এক গ্যাসের মেঘ। সাধারণ তারার মতো এতে নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া ঘটে না; বরং এর কেন্দ্রে থাকা ব্ল্যাক হোলটি থেকে এটা প্রয়োজনীয় শক্তি পায়।

এ গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক ও এমআইটি’র ‘কাভলি ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স অ্যান্ড স্পেস রিসার্চ’-এর গবেষক রোহান নাইডু বলেছেন, “বস্তুটি নিয়ে আমাদের ধারণা খুব দ্রুত পাল্টাচ্ছে। আমরা ধারণা করছি, এর কেন্দ্রে সূর্যের চেয়ে এক লাখ গুণ ভারী একটি ব্ল্যাক হোল রয়েছে।

“সেই ব্ল্যাক হোলের চারপাশে ঘিরে থাকা বড় বিস্তৃত গ্যাসের আস্তরণটি দেখতে পুরো সৌরজগতের আকারের একটি তারার মতো দেখায়। এটা আসলেই বিশাল।”

গবেষণায় আবিষ্কৃত বস্তুটির নাম ‘মওম-বিএইচ*-ওয়ান’। বস্তুটি পৃথিবী থেকে এতটাই দূরে অবস্থিত যে এর থেকে আসা আলো ১৩০০ কোটি বছর আগের, যা বিগ ব্যাং বা মহাবিশ্ব তৈরির কেবল ৬৬ কোটি বছর পরের ঘটনা।

একই গবেষণায় ‘মওম-জেড১৪’ নামে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে দূরবর্তী ছায়াপথের সন্ধানও পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

গবেষণায় আবিষ্কৃত বস্তু দুটির নাম এদের পরিচালিত প্রজেক্ট ‘মিরেজ অর মিরাকল’-এর মঙ্গে মিলিয়ে রাখা হয়েছে।

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহার করে মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর দিকের উজ্জ্বল ও দূরবর্তী ছায়াপথগুলো পর্যবেক্ষণ করাই ছিল এ গবেষণার মূল লক্ষ্য।

গবেষকরা নতুন আবিষ্কৃত বস্তুর নাম দিয়েছেন ‘ব্ল্যাক হোল স্টার-ওয়ান’। বস্তুটি মহাকাশে আবিষ্কৃত প্রথম ব্ল্যাক হোল স্টার ও ভবিষ্যতে এমন আরও অনেক বস্তুর সন্ধান মিলবে। ফলে মহাকাশের সেই রহস্যময় ‘ছোট লাল বিন্দু’গুলোর জট শেষ পর্যন্ত খুলে যেতে পারে।

গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক অধ্যাপক রোহান নাইডু বলেছেন, “প্রতিটি ছোট লাল বিন্দুর বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্য প্রাচীন ছায়াপথে থাকা এসব ব্ল্যাক হোল স্টারের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। তবে নতুন বস্তুটির বিশেষত্ব এটা মূল ছায়াপথের আলোকে পুরোপুরি ম্লান করে দিয়েছে। ফলে আমরা একদম খাঁটি ব্ল্যাক হোল স্টারের নির্গত আলো দেখতে পাচ্ছি।”

বিজ্ঞানীরা সরাসরি কোনো ব্ল্যাক হোল স্টার খোঁজার উদ্দেশ্যে এই গবেষণা শুরু করেননি। ‘মিরেজ অর মিরাকল’ প্রজেক্টের কাজ ছিল প্রাচীন বিভিন্ন ছায়াপথ আদতে মহাবিশ্বের একদম শুরুতে গঠিত হয়েছিল কি না তা পরীক্ষা করা।

তবে টেলিস্কোপের ছবি বিশ্লেষণের সময় অস্বাভাবিক লাল ও তীব্র উজ্জ্বল বিন্দু তাদের নজরে আসে।

গবেষণার সহ-লেখক রবার্ট সিমকো বলেছেন, “মহাকাশে লাল রঙের কোনো বস্তু দেখা গেলে সাধারণত ধরে নেওয়া হয় সেটি ধূলিকণায় ঢাকা রয়েছে। যেমন কানাডার দাবানলের ধোঁয়া বস্টনের আকাশকে লালচে করে দিয়েছিল, ঠিক তেমনই মহাজাগতিক বস্তুও ধূলিকণার আড়ালে থাকলে আসল রঙের চেয়ে বেশি লাল দেখায়।”

তবে বস্তুটির আলো বিশ্লেষণ করে ধূলিকণার এই তথ্য ভুল প্রমাণিত হয়। এ ছাড়া বস্তুটি অদ্ভুত কিছু আচরণ করছিল, যেমন তীব্র উজ্জ্বল হলেও নির্দিষ্ট কিছু তরঙ্গদৈর্ঘ্যের নিচে এর আলো সম্পূর্ণ উধাও হয়ে যাচ্ছিল এবং এতে কোনো ধাতু বা ভারী মৌলের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছিল না।

পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা কম্পিউটার সিমুলেশন ব্যবহার করে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন। প্রথম সিমুলেশনে দেখা যায়, বস্তুটি হাইড্রোজেন গ্যাসে ঘেরা শক্তির একটি উৎস। তবে এত বিপুল পরিমাণ উজ্জ্বলতার কারণ সেখানে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি।

অধ্যাপক নাইডু বলেন, “আমরা এমন এক বস্তুর সামনে দাঁড়িয়েছিলাম, যা দেখতে তারার মতো হলেও শত কোটি গুণ বেশি উজ্জ্বল। যার মানে, সাধারণ তারার মতো নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া থেকে এই শক্তি আসছে না।”

অবশেষে সিমুলেশনে একটি ব্ল্যাক হোল যোগ করতেই ধাঁধার সমাধান মেলে। ব্ল্যাক হোল থেকে তৈরি হওয়া শক্তির মান টেলিস্কোপে পাওয়া বাস্তব তথ্যের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।

‘এ গ্যাস এনশ্রাউডেড অ্যান্ড গ্যাস রেডেনড ব্ল্যাক হোল এট কসমিক ডন’ শিরোনামে মহাবিশ্বের সূচনা পর্বের এই অভূতপূর্ব আবিষ্কারের গবেষণাপত্রটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’-এ।