Published : 24 May 2026, 04:17 PM
শেয়ার বাজারে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেটের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে স্পেসএক্স। কয়েক মাস ধরে নানাবিধ বিলম্বের পর স্টারশিপের এ মানববিহীন উৎক্ষেপণটি কোম্পানির জন্য ছিল বড় মাইলফলক।
রয়টার্স লিখেছে, ইলন মাস্কের কোম্পানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ অভিযানে রকেটটি প্রায় সবকটি লক্ষ্য পূরণ করে ভারত মহাসাগরে অবতরণ করেছে, যা ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারের আইপিও’র আগে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও নাসার চন্দ্রাভিযানের স্বপ্নকে আরও বাড়িয়ে দিল।
শুক্রবার স্পেসএক্স তাদের নতুন প্রজন্মের ‘স্টারশিপ ভি৩’ রকেটের সফল পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ সম্পন্ন করেছে। মাস্কের কোম্পানির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ এ অভিযানে, রকেটটি সফলভাবে কিছু স্যাটেলাইট মহাকাশে স্থাপন করা শেষে ভারত মহাসাগরে নিয়ন্ত্রিতভাবে অবতরণ করেছে।
রকেটটি তৈরি হয়েছে যেন আরও দ্রুত ও বেশি সংখ্যায় স্টারলিংক স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানো ও ভবিষ্যতে নাসার চন্দ্রাভিযান সফল করা যায়। আগামী মাসে স্পেসএক্স শেয়ার বাজারে পা রাখতে যাচ্ছে, যা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও হতে পারে। কোম্পানিটির সবশেষ এ সাফল্য নিশ্চিতভাবেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
সম্পূর্ণ পুনরায়ব্যবহারযোগ্য এ মহাকাশযানটি তৈরিতে স্পেসএক্স এ পর্যন্ত দেড় হাজার কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে। মাস্কের দূরদর্শী বিভিন্ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে স্টারশিপের ভূমিকা অপরিসীম।
রকেট উৎক্ষেপণের খরচ কমিয়ে আনা, স্টারলিংক ব্যবসার প্রসার ঘটানো এবং গভীর মহাকাশ গবেষণা থেকে শুরু করে কক্ষপথে ডেটা সেন্টার স্থাপনের মতো মেগা প্রজেক্ট নিয়ে ভাবছেন মাস্ক। এসবকিছুর ওপর ভিত্তি করেই তিনি কোম্পানির আইপিও মূল্যায়ন ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার লক্ষ্যমাত্রা ধরেছেন।
২০২৩ সাল থেকে শুরু করে এ মিশনটি ছিল স্টারশিপের ১২তম পরীক্ষামূলক ফ্লাইট। তবে এ মিশনটি স্টারশিপ রকেটের একদম নতুন ও আপগ্রেডেড সংস্করণের প্রথম উৎক্ষেপণ। এ সংস্করণে মূল যান ও এর ‘সুপার হেভি বুস্টার’ উভয় অংশেই বড় ধরনের আধুনিকায়ন করা হয়েছে। একইসঙ্গে নতুন এ রকেটের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা সম্পূর্ণ নতুন এক লঞ্চ প্যাড থেকে এ রকেটটিই ছিল প্রথম উৎক্ষেপণ।
Liftoff of Starship! pic.twitter.com/LQLdjK5V6K
— SpaceX (@SpaceX) May 22, 2026
‘অর্থপূর্ণ একধাপ অগ্রগতি’
বছরের পর বছর ধরে নানা বিস্ফোরণ ও উন্নয়নের কারণে দেরির পর পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী এ রকেটটি যে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত– বিনিয়োগকারীদের কাছে সেই দাবি জোরালো করতেই স্পেসএক্সের এ সফল পরীক্ষার প্রয়োজন ছিল। শুক্রবারের এ পরীক্ষাটি মিশনটির প্রধান বিভিন্ন লক্ষ্যের বেশিরভাগই পূরণ করতে পেরেছে।
টেক্সাসের ব্রাউনসভিলের কাছে মেক্সিকো উপসাগরের তীরে অবস্থিত স্পেসএক্সের স্টারবেইস কেন্দ্র থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৫টায় এ বড় আকারের রকেটটি উৎক্ষেপিত হয়। রকেটটির নিচের অংশে ছিল ‘সুপার হেভি বুস্টার’ এবং এর ওপর বসানো ছিল নভোচারীদের বহনকারী যান স্টারশিপ।
উৎক্ষেপণের কয়েক মিনিট পরই রকেটের দুটি অংশ সফলভাবে একে অপর থেকে আলাদা হয়ে যায়। এরপর স্টারশিপের ছয়টি ইঞ্জিনের মধ্যে একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও যানটি মহাশূন্যে তার মূল কক্ষপথে এগিয়ে চলে, যেখানে স্যাটলাইটের পেলোডটি সফলভাবে মুক্ত করার পর, বায়ুমণ্ডলের তীব্র ঘর্ষণ ও উত্তাপ পেরিয়ে রকেটটি ভারত মহাসাগরে নেমে আসে। পুরো কার্যক্রম এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময় ধরে চলেছে।
এদিকে, রকেটের নিচের অংশের সুপার হেভি বুস্টারটি স্টারশিপ থেকে আলাদা হওয়ার প্রায় ছয় মিনিট পর মেক্সিকো উপসাগরে নেমে আসে। তবে আগের পরিকল্পনা অনুসারে, পানি ছোঁয়ার আগে বুস্টারটির বিভিন্ন ইঞ্জিন যেভাবে পুনরায় জ্বলে উঠে গতি নিয়ন্ত্রণের কথা ছিল তা সফলভাবে সম্পন্ন করা যায়নি।
এ সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ এক পোস্টে মাস্ক লিখেছেন, “স্টারশিপ ভি৩-এর প্রথম মহাকাব্যিক উৎক্ষেপণ ও অবতরণের জন্য স্পেসএক্স দলকে অভিনন্দন!”
‘জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি’র ‘সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড এমার্জিং টেকনোলজি’র গবেষণা বিশ্লেষক ক্যাথলিন কার্লি এ ফ্লাইটটিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, “মহাকাশে স্পেসএক্সের বিভিন্ন স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে যে বড় উৎক্ষেপণ সক্ষমতা প্রয়োজন তা তৈরির পথে এ মিশন আরেকটি অর্থপূর্ণ অগ্রগতি।
“এ মিশনে কিছু ত্রুটি বা অসঙ্গতি দেখা গেলেও এ পরীক্ষাটি বেশ কয়েকটি মূল লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছে এবং এর থেকে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং ডেটা ভবিষ্যতে স্পেসএক্সকে আরও এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।”
রকেটের শেষ মুহূর্ত ও রোমাঞ্চকর অবতরণ
স্পেসএক্সের লাইভ ওয়েবকাস্টে দেখা গেছে, প্রায় ৪০ তলা ভবনের সমান উঁচু রকেটটি উৎক্ষেপণ প্যাড ছেড়ে ওপরের দিকে ওঠার সময় নিচের ‘সুপার হেভি বুস্টার’-এর ৩৩টি র্যাপ্টর ইঞ্জিন একসঙ্গে গর্জে ওঠে। এক বড় অগ্নিকুণ্ড এবং ধোঁয়া ও বাষ্পের মেঘ তৈরি করে রকেটটি আকাশের দিকে ছুটে যায়।
উৎক্ষেপণের প্রায় ৬৫ মিনিট পর এ পরীক্ষাটি শেষ হয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে তীব্র গতিতে প্রবেশের পর স্টারশিপ যানটি আগের পরিকল্পনা অনুসারে সোজা হয়ে বা এর নাক ওপরের দিকে রেখে ভারত মহাসাগরে অবতরণ করে।
পানিতে পড়ার পরপরই রকেটটি কাত হয়ে যায় এবং বড় অগ্নিকুণ্ড তৈরি করে বিস্ফোরিত হয়। লাইভ ওয়েবকাস্টে এই দৃশ্য দেখে স্পেসএক্সের সদর দপ্তরে জড়ো হওয়া কর্মীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন।
অবশ্য স্পেসএক্স উৎক্ষেপণের আগেই বলেছিল, সবকিছু ঠিকঠাক চললেও তারা বুস্টার বা স্টারশিপের ওপরের অংশটি অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার বা ফিরিয়ে আনার কোনো চেষ্টা করবে না।
মহাকাশে ভ্রমণের সময় স্টারশিপ সফলভাবে তার ভেতরে থাকা ২০টি স্টারলিংক স্যাটেলাইট একে একে অবমুক্ত করে। পাশাপাশি দুটি মোডিফাইড স্যাটেলাইটও ছিল, যেগুলো রকেটের নিচের দিকে নামার সময় এর হিট শিল্ড স্ক্যান করে কন্ট্রোল রুমে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা পাঠিয়েছে।
উৎক্ষেপণের শুরুর দিকে স্টারশিপের ছয়টি ইঞ্জিনের মধ্যে একটি অকেজো হয়ে যাওয়ায় মিশন কন্ট্রোলাররা বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের আগে মহাকাশে ইঞ্জিনটি পুনরায় চালুর যে পরিকল্পনা ছিল তা বাতিল করেছেন।
তবে একদম শেষ মুহূর্তে পানিতে নামার ঠিক আগে রকেটটি এর গতি কমানোর বিভিন্ন ইঞ্জিন সফলভাবে চালু করতে পেরেছিল। এ ছাড়া রকেটটির সহনশীলতা পরীক্ষার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল কৌশল চালানো হয়, যা সহ্য করেও স্টারশিপ অক্ষত অবস্থায় এর নিয়ন্ত্রিত অবতরণ সম্পন্ন করেছে।

আইপিও’র আগে বিনিয়োগকারীদের কড়া নজরদারি
শেয়ার বাজারে যাওয়ার কেবল তিন সপ্তাহ আগে স্টারশিপের এ ১২তম পরীক্ষামূলক ফ্লাইটটি বিনিয়োগকারীদের নজরে ছিল। কোম্পানিটির এ আইপিও যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারের ইতিহাসে প্রথম কোনো ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের হতে যাচ্ছে, যা স্পেসএক্সকে মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান পাবলিক কোম্পানিতে পরিণত করবে।
স্পেসএক্সের সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসাগুলোর মধ্যে রয়েছে স্টারলিংক নেটওয়ার্ক ও কক্ষপথে ডেটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা, এসবকিছুই স্টারশিপ রকেটের মাধ্যমে মহাকাশে পৌঁছানোর ওপর নির্ভর করছে।
অতীতে পরীক্ষার সময় রকেট বিস্ফোরণ বা ব্যর্থতার বিভিন্ন বিষয়কে মাস্ক সবসময় সহজভাবে নিলেও বিনিয়োগকারীরা এ ধনকুবেরের ‘স্বল্পমেয়াদী ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা’ এবং ‘চাঁদ ও মঙ্গলে পাড়ি জমানোর দীর্ঘমেয়াদী স্বপ্ন’কে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন তা এখন দেখার বিষয়।
অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত মহাকাশ গবেষণা কোম্পানির তুলনায় স্পেসএক্সের প্রকৌশল সংস্কৃতিতে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বেশি। তাদের কৌশল, নতুন বিভিন্ন মহাকাশযানকে পরীক্ষার মাধ্যমে একদম ব্যর্থতার শেষ সীমা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া এবং সেখান থেকে ভুলগুলো শুধরে বারবার পরীক্ষার মাধ্যমে নিখুঁত করে তোলা।
২০০২ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় এ রকেট কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করেন মাস্ক। এক বছর আগে তিনি বলেছিলেন, ২০২৬ সালের শেষদিকে স্টারশিপ মঙ্গলে তার প্রথম মানববিহীন যাত্রা করবে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পষ্টতই লক্ষ্যমাত্রার বাইরে চলে গেছে।
বর্তমানে স্পেসএক্স ‘ফ্যালকন ৯’ বা ‘ফ্যালকন হেভি’ রকেটের সঙ্গে ‘ড্রাগন ক্যাপসুল’ ব্যবহার করে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে কাজ চালায়। তবে নতুন ‘ভি৩’ সংস্করণে এমন অনেক আধুনিকায়ন করা হয়েছে, যা এই সীমানা ছাড়িয়ে মহাকাশ অভিযানের জন্য রকেটের কার্যকারিতাকে নিখুঁত করবে।
এর মধ্যে একটি বড় পরিবর্তন হচ্ছে, সুপার হেভি বুস্টারের র্যাপ্টর ইঞ্জিনের আধুনিকায়ন। নতুন ডিজাইনের কারণে ইঞ্জিনের ওজন কমলেও তা আগের চেয়ে বেশি শক্তি উৎপন্ন করতে পারে।
একইভাবে, স্টারশিপের ওপরের অংশের চালিকাশক্তি বা প্রপালশন সিস্টেমকেও দীর্ঘমেয়াদী মিশনের উপযোগী করে উন্নত করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে মহাকাশে একটি মহাকাশযানের সঙ্গে অন্য মহাকাশযানের ডকিং, জ্বালানি রিফিউয়েলিং ও মহাকাশে সহজে দিক পরিবর্তনের ব্যবস্থা।
পরিকল্পনা অনুসারে, ২০২৮ সালে স্পেসএক্সের প্রথম চন্দ্রাভিযানের জন্য মহাকাশেই জ্বালানি ভরার প্রয়োজন হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ও এখনো অপ্রমাণিত এ কাজটি সম্পন্ন করতে একাধিক স্টারশিপ ট্যাংকার যানের প্রয়োজন পড়বে।
নাসার ‘আর্টেমিস’ প্রোগ্রামের আওতায় ২০২১ সালে স্পেসএক্স যে ৩০০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের চুক্তিটি জিতেছিল তার মধ্যে এ পুরো প্রযুক্তিগত পরিকল্পনাটি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
১৯৭২ সালের পর এ দশকের শেষদিকে প্রথমবারের মতো নভোচারীদের চাঁদের মাটিতে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এ মিশনটি পরিচালনা করছে। পরিকল্পনাটি স্টারশিপকে চীনের সঙ্গে নতুন এক মহাকাশ প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কারণ চীনও ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে নিজেদের মানববাহী মহাকাশযান পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।