Published : 29 Apr 2026, 03:24 PM
গর্ভাবস্থায় যাদের উচ্চ রক্তচাপ ছিল সেই নতুন মায়েরা বাড়িতে প্রতিদিন বিপি বা রক্তচাপ মেপে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে পারেন বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সন্তান জন্মদানের পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ যেসব নারী নিয়মিত নিজেদের রক্তচাপ পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুসারে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করেছেন নয় মাস পর তাদের ধমনী অন্যদের তুলনায় ভালো কাজ করেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, ‘ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড’ এর করা এ গবেষণায় গবেষকরা বলছেন, রক্তচাপের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ওষুধের ডোজ ঠিক করা হলে নারীদের ধমনীর কাঠিন্য কমে যায়। ফলে ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
এ গবেষণার প্রধান গবেষক ও কার্ডিওভাসকুলার মেডিসিনের অধ্যাপক পল লিসন বলেছেন, গবেষণার ফলাফল থেকে ইঙ্গিত মেলে, সন্তান জন্মদানের পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ নারীদের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ‘গুরুত্বপূর্ণ হলেও বেশিরভাগ সময়ই তা উপেক্ষিত থাকে ’।
তিনি বলেছেন, “বাড়িতে বসে সাধারণ পদ্ধতিতে রক্তচাপ মেপে গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপে ভোগা নতুন মায়েরা তাদের শরীরকে ভবিষ্যতের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারেন।”
এ গবেষণার ফলে বাড়িতে রক্তচাপ মাপার বিষয়টি আরও ছড়িয়ে পড়বে এবং এর ফলে অনেক নারী উপকৃত হবেন বলেও মনে করছেন অধ্যাপক লিসন।
সাধারণত ৫ থেকে ১০ শতাংশ গর্ভবতী নারী গর্ভাবস্থাকালীন উচ্চ রক্তচাপ বা ‘প্রি-এক্লাম্পসিয়া’ রোগে আক্রান্ত হন। এর ফলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি দেখা দেয়। এ সমস্যা মায়ের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে এবং শিশুর জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
মা ও শিশুর তাৎক্ষণিক ঝুঁকির বাইরেও গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার কারণ হতে পারে। এ সমস্যায় ভোগা নারীদের ক্ষেত্রে পরবর্তী জীবনে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তিন গুণ ও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি দ্বিগুণ থাকে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ হার্ভার্ড’ এর গবেষকদের আলাদা এক গবেষণায় উঠে এসেছিল, গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি ৪২ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।
এ নতুন গবেষণায় অক্সফোর্ডের গবেষক দলটি এমন ২২০ জন নারীকে নিয়ে এ গবেষণা চালিয়েছেন যারা গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এ নারীদের সবাই রক্তচাপের ওষুধ গ্রহণ করছিলেন, এবং ধীরে ধীরে ওষুধের মাত্রা কমিয়ে একসময় তা বন্ধ করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলেন।
গবেষণায় উঠে এসেছে, ১০৮ জন নারী প্রচলিত নিয়মে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেছিলেন, যেখানে সন্তান জন্মদানের পরবর্তী আট সপ্তাহে মাত্র কয়েকবার রক্তচাপ পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে তাদের ওষুধের মাত্রা কমানো হয়েছিল।
অন্যদিকে, বাকি ১১২ জন নারী প্রতিদিন বাড়িতে বসে যন্ত্রের মাধ্যমে নিজেদের রক্তচাপ মেপেছেন। তারা তাদের এসব রিডিং একটি অ্যাপে যোগ করতেন, যা চিকিৎসকদের সঙ্গে শেয়ার হত। রক্তচাপ আরও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে চিকিৎসকরা প্রয়োজনে দিন দিন ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করে দিতেন।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘হাইপারটেনশন’-এ।
গবেষণার এ নতুন পদ্ধতিটি নারীদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ছয় থেকে নয় মাস পর পরীক্ষায় দেখা গেছে, এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা নেওয়া নারীদের ধমনী বা রক্তনালী তুলনামূলক নমনীয় ছিল।
রক্তনালী শক্ত হয়ে গেলে তা প্রয়োজনমতো সংকুচিত বা প্রসারিত হতে পারে না, যা উচ্চ রক্তচাপ তৈরি করে। ফলে শেষ পর্যন্ত রক্ত জমাট বেঁধে রক্তনালী বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপে ভোগা নারীদের জন্য এ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাটি কীভাবে কার্যকরভাবে চালু করা যায় তা নিয়ে বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। যার একটি উপায় হতে পারে যুক্তরাজ্যের ‘ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস’ বা এনএইচএস এর বিশেষায়িত ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে এই সেবা দেওয়া।
এ গবেষণায় অর্থায়ন করেছে ‘ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশন’।
সংস্থাটির ক্লিনিক্যাল ডিরেক্টর ড. সোনিয়া বাবু-নারায়ণ বলেছেন, গবেষণার এসব ফলাফল সন্তান জন্মদানের পরের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে, যে সময়ে রক্তচাপের প্রতি একটু বাড়তি নজর দিলে তা আগামী বহু বছরের জন্য নারীদের হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে পারে।
“এ পদ্ধতিটি কীভাবে নারীদের জীবন বাঁচাতে পারে তা আরও ভালোভাবে বুঝতে আমরা এখন দীর্ঘমেয়াদী এবং বড় পরিসরের গবেষণার ফলাফলের অপেক্ষায় আছি। এ ধরনের গবেষণা বর্তমান নারী স্বাস্থ্য কৌশলের গুরুত্বকে তুলে ধরে, যা মাসিক ও গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে মেনোপজ এবং পরবর্তী জীবনেও হৃদরোগের সঠিক পরামর্শ ও সেবা পাওয়ার গুরুত্বকে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।”