Published : 01 Jul 2026, 01:36 PM
হাসির অনেক ধরন রয়েছে। কোনো কৌতুক শুনে মানুষ উচ্চস্বরে হাসতে পারে। অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে কেউ কেউ নার্ভাস হয়ে মৃদু হাসেন আবার হালকা আমোদ বা বিনোদন থেকে কেউ মৃদু হাসিতে মেতে উঠতে পারে। অবজ্ঞা বা উপহাস প্রকাশ করতেও অনেকে মুখ চেপে হাসেন, বিশেষ করে সিনেমার ভিলেনদের এমনটা করতে দেখা যায়।
তবে হাসিকে কেবল মানুষের একার বৈশিষ্ট্য মনে হলেও আসলে তা নয়। মানুষের সবচেয়ে কাছের বিবর্তনীয় আত্মীয়রাও হাসতে পারে।
রয়টার্স লিখেছে, গবেষকরা এখন মানুষের হাসির সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের গ্রেট এপ বা বড় বানরজাতীয় প্রাণী, যেমন শিম্পাঞ্জি, বোনোবো, গরিলা এবং ওরাংওটাংয়ের হাসির তুলনা করেছেন।
তারা এই কণ্ঠস্বর বা শব্দের মধ্যে প্রজাতির মধ্যকার যেমন মিল খুঁজে পেয়েছেন, ঠিক তেমনই মানুষের কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্যও চিহ্নিত করেছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিটি প্রজাতির হাসিই নিয়মিত ছন্দময় প্যাটার্ন বা নিয়ম মেনে চলে, যেখানে একের পর এক তৈরি হওয়া শব্দের মধ্যে সমান ব্যবধান বা বিরতি থাকে।
গবেষকরা বলছেন, যেহেতু হাসির এ ধরনটি মানুষ ও অন্যান্য প্রজাতির মধ্যে একইভাবে রয়েছে ফলে সম্ভবত তাদের শেষ সাধারণ পূর্বপুরুষের মধ্যেও এমনটা ছিল, যারা আনুমানিক দেড় কোটি বছর আগে পূর্ব বা মধ্য আফ্রিকায় বসবাস করেছে।
এ গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক ও ইংল্যান্ডের ‘ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটি’র প্রাইমেটোলজিস্ট ও রিসার্চ ফেলো চিয়ারা ডি গ্রেগোরিও বলেছেন, “মানুষের হাসির মূল বিবর্তনীয় শিকড় গ্রেট এপ বা বড় বানরজাতীয় প্রাণীদের হাসির মতোই। তবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে তা আলাদা।”
গবেষণাটি প্রতাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘কমিউনিকেশনস বায়োলজি’তে।
গবেষক ডি গ্রেগোরিও বলেছেন, “মানুষের হাসি অন্যান্য বড় বানরজাতীয় প্রাণীদের হাসির চেয়ে বেশি দ্রুতগতির, পরিবর্তনশীল ও সামাজিক পরিস্থিতির প্রতি বেশি সংবেদনশীল। শিম্পাঞ্জি ও বোনোবো আমাদের সবচেয়ে কাছের আত্মীয়, আর তাদের হাসি গরিলা বা ওরাংওটাংয়ের তুলনায় আমাদের হাসির সঙ্গে অনেকটাই মেলে। এরপরও ছন্দের জটিলতা ও নমনীয়তার দিক থেকে মানুষের হাসি এখনও সম্পূর্ণ আলাদা ও অনন্য।”
মানুষের বিবর্তনীয় ধারাটি শিম্পাঞ্জি ও বোনোবোর দিকে চলে যাওয়া ধারা থেকে সম্ভবত ৭০ লাখ বছর আগে আলাদা হয়ে গিয়েছিল।
গবেষকরা চার জোড়া শিম্পাঞ্জি, তিনটি বোনোবো, দুটি গরিলা, চারটি ওরাংওটাং ও চারজন মানুষের হাসির রেকর্ড বিশ্লেষণ করেছেন। তারা হাসির মোট ১৪০টি সিকোয়েন্স বা পর্বের প্রতিটি শব্দের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান পরিমাপ করেছেন।
জার্মানি ও মালয়েশিয়ার চিড়িয়াখানায় বানরজাতীয় প্রাণীদের নিজস্ব পরিবেশে এসব রেকর্ড করা হয়েছিল। এ সময় তারা নিজেরা খেলাধুলায় মগ্ন বা তাদের পরিচিত মানব কেয়ারটেকাররা তাদের আলতো করে শুঁড়শুড়ি দিচ্ছিলেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তাদের হাসির গতি পরিবর্তন করতে পারে।
গবেষক ডি গ্রেগোরিও বলেছন, “আমাদের গবেষণাটি ইঙ্গিত মেল, বড় বানরজাতীয় প্রাণী ও মানুষের বিবর্তনের পর্যায়ক্রমে হাসির ধরনও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে।
“পার্থক্য হচ্ছে, মানুষ পরিস্থিতি বা প্রেক্ষাপট অনুসারে নিজেদের হাসির সময়ের গঠন পরিবর্তন করতে পারে। আমাদের গবেষণায় এমন খুব কম প্রমাণই পাওয়া গেছে, যার থেকে বোঝা যায়, বড় বানরজাতীয় প্রাণীরা মানুষের মতো বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তাদের হাসির ছন্দের গঠন পরিবর্তন করে। তবে ভবিষ্যৎ গবেষণা হয়ত আরও সূক্ষ্ম কোনো পার্থক্যের রূপ প্রকাশ করতে পারবে।”
গবেষকরা বলছেন, তাদের এ গবেষণা মানুষের কথা বলার বা ভাষার উৎপত্তি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষত ডি গ্রেগোরিও বলেছেন, “আমাদের সবচেয়ে কাছের আত্মীয়দের হাসি নিয়ে পড়াশোনা বা গবেষণার মাধ্যমে আমরা কেবল ভাষার উৎসই নয়, বরং আমাদের ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে যে সামাজিক ও আবেগীয় ভিত্তি রয়েছে তা-ও ভালোভাবে বুঝতে পারি।
“বিবর্তনের ধারায় ছন্দের এই যে নমনীয়তা বা পরিবর্তনের সক্ষমতা আমরা লক্ষ্য করেছি তা ইঙ্গিত করেছে, আমাদের পূর্বপুরুষদের হয়ত আধুনিক বানরজাতীয় প্রাণীদের চেয়েও বেশি উন্নত কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা ছিল, যা মানুষের কথা ও ভাষার দিকে এগিয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বা মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।
“আমাদের পূর্বপুরুষেরা ঠিক কীভাবে যোগাযোগ করতেন তা হয়ত আমরা এখনও পুরোপুরি জানি না। তবে তারা কীভাবে হাসতেন এর স্পষ্ট চিত্র এখন আমাদের সামনে রয়েছে।”
তাহলে হাসি আসলে ঠিক কী?
এমন প্রশ্নে গবেষক ডি গ্রেগোরিও বলেছেন, “মানুষ বাদে অন্যান্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে হাসি ছন্দময় এক কণ্ঠস্বর বা শব্দ, যা সাধারণত খেলাধুলার মতো ইতিবাচক সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত।
“ধারণা করা হয়, হাসি সামাজিক সংকেত হিসেবে বিবর্তিত হয়েছে, যা ইতিবাচক সম্পর্ক ধরে রাখতে ও সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। খেলাধুলার সময় হাসি প্রকাশ করে, এ সময় কারো আচরণ আক্রমণাত্মক নয়, বরং বন্ধুত্বপূর্ণ, যা কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি ছাড়াই প্রাণীদের একে অপরের সঙ্গে খুনসুটি বা ধস্তাধস্তিতে মেতে উঠতে সাহায্য করে। মানুষের ক্ষেত্রে হাসি আরও অনেক অতিরিক্ত সামাজিক দায়িত্ব বা ভূমিকা নিয়েছে। তবে এর উৎপত্তি খেলাধুলার মধ্যেই নিহিত।”
বড় বানরজাতীয় প্রাণী ছাড়াও অন্য অনেক প্রাণীর মধ্যে হাসির মতো আচরণ দেখা যায়।
গবেষক ডি গ্রেগোরিও বলেছেন, “অন্যান্য প্রাণীরা সত্যিই ‘হাসে’ কি না তা নির্ভর করে আমরা হাসির সংজ্ঞা কতটা কঠোরভাবে নির্ধারণ করছি তার ওপর। অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীই খেলাধুলার এমন কিছু সংকেত দেখায়, যা মানুষের হাসির মতোই কাজ করে। যেমন, কুকুররা খেলার সময় ‘প্লে ফেইস’ বা খেলার অভিব্যক্তি দেখায় এবং এক ধরনের হাঁপানোর মতো শব্দ তৈরি করে। এসব সংকেত এদের খেলার উদ্দেশ্য প্রকাশ করতে ও তাদের আচরণ যে আক্রমণাত্মক নয় তা নির্দেশ করতে সাহায্য করে। অন্যান্য বেশ কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যেও খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত এমন কাছাকাছি ধরনের কণ্ঠস্বর বা শব্দের কথা জানা গেছে।”