Published : 12 Apr 2026, 01:08 PM
উগান্ডার জঙ্গলে দীর্ঘ ২০ বছরের বন্ধুত্বের অবসান ঘটিয়ে একে অপরের রক্ত ঝরাচ্ছে শিম্পাঞ্জিরা। দলটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে সুপরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। একসময়ের বন্ধুদের এমন খুনি হয়ে ওঠার ঘটনায় রীতিমতো স্তম্ভিত বিজ্ঞানীরা।
গত দুই দশক ধরে গবেষকরা উগান্ডার কিবালে ন্যাশনাল পার্কের ‘এনগোগো’ শিম্পাঞ্জি দলের সদস্যদের পর্যবেক্ষণ করেছেন। নিরক্ষীয় রেইনফরেস্টের সেই আবাসে এরা নিজেদের দিনগুলো ফলমূল ও পাতা খেয়ে, বিশ্রাম নিয়ে, ঘুরেফিরে এবং একে অপরের দেহ পরিষ্কার করে কাটিয়ে দিত।
তবে এই স্থিতিশীল সম্প্রদায়টি এক সময় দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে বছরের পর বছর ধরে চলা প্রাণঘাতী সহিংসতায় লিপ্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
গবেষকরা এখন বন্য শিম্পাঞ্জিদের একটি দলের দুটি আলাদা উপদলে বিভক্ত হওয়ার এমন প্রথম স্পষ্ট প্রমাণ তুলে ধরছেন, যেখানে এক পক্ষ অন্য পক্ষের ওপর ধারাবাহিকভাবে সুপরিকল্পিত হামলা চালাচ্ছে। এসব হামলায় পূর্ণবয়স্ক পুরুষ শিম্পাঞ্জি ও শিশুদের টার্গেট করা হয়েছিল, যার ফলে মোট ২৮টি শিম্পাঞ্জির মৃত্যু হয়েছে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস’-এর প্রাইমাটোলজিস্ট ও এ গবেষণার প্রধান লেখক অ্যারন স্যান্ডেল বলেছেন, “আক্রমণকারীরা শিকারকে কামড়ে দেয়, হাত দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে, টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায় ও লাথি মারে। এই হামলায় প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ শিম্পাঞ্জিরাই অংশ নেয়। তবে মাঝেমধ্যে স্ত্রী শিম্পাঞ্জিদেরও এতে যোগ নিতে দেখা গিয়েছে।”
গবেষণাপত্রটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ।
গবেষকরা ১৯৯৫ সাল থেকে ‘এনগোগো’ শিম্পাঞ্জিদের নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। এরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় বন্য শিম্পাঞ্জি দল, যার সদস্য সংখ্যা এক সময় প্রায় দুইশোতে পৌঁছেছিল। অথচ সাধারণত শিম্পাঞ্জিদের একেকটি দলে সদস্য থাকে কেবল ৫০ জনের মতো।
গবেষকরা অনেক আগে থেকেই জানতেন, শিম্পাঞ্জিরা সাধারণত প্রতিবেশী বা অপরিচিত দলের সদস্যদের ওপর হামলা ও হত্যা করে। তবে এবারের ঘটনাটি ছিল একেবারেই আলাদা ও নজিরবিহীন।
‘ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগান’-এর ইমেরিটাস অধ্যাপক ও এ গবেষণার অন্যতম লেখক জন মিতানি বলেছেন, “গতকালের বন্ধু কীভাবে আজকের শত্রুতে পরিণত হল তা মেনে নেওয়া আমার জন্য সত্যিই কঠিন। এ দুই দলের পুরুষ শিম্পাঞ্জিরা একসঙ্গে বড় হয়েছে, সারাজীবন একে অপরকে চিনেছে এবং সহযোগিতা করেছে, যার ফলে এরা সবাই লাভবানও হয়েছিল।

“তবে কেন এই বিভক্তি? সম্ভবত এরা নিজেদের সাফল্যেরই শিকার হয়েছে। দলটির সদস্য সংখ্যা যখন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল তখন থেকেই বিশৃঙ্খলার শুরু।”
গবেষকরা বলছেন, বেশ কিছু কারণ মিলে দলটিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। দলের আকার বড় হয়ে যাওয়ায় সবার জন্য খাবারের সংকট তৈরি এবং স্ত্রী শিম্পাঞ্জিদের সঙ্গে মিলনের ক্ষেত্রে পুরুষদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছিল।
এ ছাড়া ২০১৪ সালে অসুস্থতার কারণে সাতটি শিম্পাঞ্জির মৃত্যু সম্ভবত এদের সামাজিক সম্পর্কে ফাটল ধরায়, যা শেষ পর্যন্ত চরম শত্রুতার জন্ম দেয়।
শিম্পাঞ্জিদের সমাজ সাধারণত পুরুষশাসিত হয়ে থাকে। ২০১৫ সালের দিকে উত্তেজনা শুরু হলে এদের ‘আলফা মেল’ বা দলের প্রধান নেতার পরিবর্তন ঘটে, সেখানে জ্যাকসন নামে এক শিম্পাঞ্জি অন্য এক পুরুষ শিম্পাঞ্জিকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করে।
দলের বিভক্তির আগে এরা ঐক্যবদ্ধ সম্প্রদায় থাকলেও এদের মধ্যে ছোট ছোট সামাজিক উপদল ছিল। ২০১৫ সাল থেকেই দুটি উপদলের সদস্যরা একে অপরকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে।
২০১৭ সালে এক রোগে ২৫টি শিম্পাঞ্জি, যার বেশিরভাগই ছিল শিশু এরা মারা যাওয়ার কয়েক মাস পর একটি উপদলের সদস্যরা জ্যাকসনের ওপর হামলা চালায়। তবে সে যাত্রায় সে বেঁচে যায়। ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ দলটি পুরোপুরি দুই ভাগে ভাগ হয়। এ সময় দুই দলের নাম দেওয়া হয় ‘ওয়েস্টার্ন’ ও ‘সেন্ট্রাল’।
এরপর ২০১৮ সাল থেকে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী সংঘাত, যেখানে ওয়েস্টার্ন দলের সদস্যরা সেন্ট্রাল দলের ওপর একের পর এক নৃশংস হামলা চালাতে থাকে।
এ গবেষণায় ২০২৪ সাল পর্যন্ত পর্যবেক্ষণগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে সাতটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং ১৭টি শিশু শিম্পাঞ্জি মারা গেছে। সব মিলিয়ে মোট সংখ্যা ২৪।
তবে এ সহিংসতা এখানেই থেমে থাকেনি। গত বছর ও এই বছরে আরও একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ, একজন কিশোর ও দুটি শিশু শিম্পাঞ্জি প্রাণ হারিয়েছে, যার ফলে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮।
অনেক শিম্পাঞ্জি কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই নিখোঁজ হয়েছে, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে আরও অনেক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা গবেষকদের পক্ষে রেকর্ড করা সম্ভব হয়নি।
অধ্যাপক মিতানি বলেছেন, “এরা শিকারকে বিরামহীনভাবে পেটাতে থাকে ও গায়ের ওপর লাফিয়ে পড়ে। আমি এমন কিছু ঘটনা দেখেছি, যা শেষ হতে ১৫ মিনিটেরও কম সময় লেগেছে। এরা কামড়ে দেয় ও শিকারের শরীরে ক্ষতচিহ্নও দেখা যায়।
“তবে সেগুলো দেখে মনে হয় না যে তা মৃত্যুর কারণ হতে পারে, বরং আমার সব সময়ই মনে হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক শিম্পাঞ্জিরা দেহের অভ্যন্তরীণ গুরুতর আঘাতের কারণেই মারা যায়।
“অন্যদিকে, শক্তিশালী এক প্রাপ্তবয়স্ক শিম্পাঞ্জি খুব সহজেই তার মায়ের কোল থেকে একটি শিশুকে ছিনিয়ে নেয়। এরপর কয়েকবার কামড় দিয়ে বা সজোরে মাটিতে আছাড় দিয়ে একে মেরে ফেলতে পারে।”
ওয়েস্টার্ন দলটি শুরুতে আকারে ছোট ছিল ও এদের এলাকাও ছিল সীমিত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এরা সেন্ট্রাল দলকে সবদিক থেকেই ছাড়িয়ে যায়। লক্ষ্য করার মতো বিষয় হচ্ছে, এ ভয়াবহ সংঘাতে ওয়েস্টার্ন দলের কোনো সদস্যই এখন পর্যন্ত মারা যায়নি।
বিজ্ঞানীরা এ ঘটনাকে ‘গৃহযুদ্ধ’ বলতে নারাজ। কারণ মানুষের লড়াইয়ের ক্ষেত্রে এ শব্দটির নির্দিষ্ট এক সংজ্ঞা রয়েছে। তবে তারা স্বীকার করেছেন, শিম্পাঞ্জিদের এ সংঘাতের সঙ্গে মানুষের যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে।
গবেষকরা বলেছেন, এর আগে ১৯৭০-এর দশকে তানজানিয়াতে শিম্পাঞ্জিদের একটি দল ভেঙে যাওয়ার এবং এক পক্ষের ওপর অন্য পক্ষের প্রাণঘাতী হামলার উদাহরণ মিলেছিল। তবে সেই সময় গবেষকরা নিয়মিত শিম্পাঞ্জিদের খাবার দিতেন, যা তাদের স্বাভাবিক আচরণকে বদলে দিয়েছিল।
এ ছাড়া তারা কেবল খাবার দেওয়ার স্থানেই শিম্পাঞ্জিদের পর্যবেক্ষণ করতেন, ফলে অনেক প্রশ্নেরই উত্তর ওই সময় মেলেনি।
শিম্পাঞ্জি ও এদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ‘বোনোবো’ হচ্ছে বিবর্তনের ধারায় মানুষের সবচেয়ে কাছের প্রজাতি। তবে, গবেষকরা শিম্পাঞ্জিদের এ সহিংসতাকে সরাসরি মানুষের আচরণের সঙ্গে তুলনা করার ক্ষেত্রে সতর্ক করেছেন।
অধ্যাপক মিতানি বলেছেন, “বিবর্তনের সাধারণ ইতিহাসের কারণে আমরা কিছু ক্ষেত্রে একই রকম হলেও মৌলিকভাবে আমরা আলাদা।
“কারণ এদের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর গত ৬০ থেকে ৮০ লাখ বছরে আমরা অনেক পরিবর্তিত হয়েছি।”