Published : 19 Jun 2026, 10:49 AM
অনেকের ধারণা মানুষের আবেগ, মেজাজ ও অনুভূতিগুলো তাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। তবে বিজ্ঞানের নিত্যনতুন গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। মানুষের অলক্ষ্যেই দেহের ভেতরে থাকা একঝাঁক অদৃশ্য রাসায়নিক বার্তাবাহক বা হরমোন প্রতিনিয়ত নিয়ন্ত্রণ করছে তাদের মনস্তত্ত্ব, আচরণ ও সার্বিক জীবন।
মানুষের খুশি হওয়া, হঠাৎ বিষণ্ণতায় ডুবে যাওয়া বা তীব্র মানসিক চাপে ভেঙে পড়ার পেছনে এসব হরমোনের ভূমিকা কতখানি গভীর?
বিবিসি লিখেছে, মানবদেহকে সঠিকভাবে সচল রাখতে হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে একইসঙ্গে মানুষের মেজাজ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও হরমোনের শক্তিশালী ও কখনো কখনো নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
‘নিউরোট্রান্সমিটার’ নামের কিছু রাসায়নিক বার্তাবাহক বা হরমোন মানুষের মস্তিষ্কের ওপর বড় প্রভাব ফেলে, যা বিজ্ঞানীদের জানা। তবে বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে যত বেশি জানতে পারছেন ততই তারা দেখছেন, হরমোনও অপ্রত্যাশিত উপায়ে মানুষের মনস্তত্ত্বকে এলোমেলো করে দিতে পারে।
এখন, গবেষকদের কেউ কেউ এ জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বিষণ্ণতা ও অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগের মতো সমস্যার নতুন কিছু চিকিৎসা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
হরমোনের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ
হরমোন নির্দিষ্ট কিছু গ্রন্থি, অঙ্গ ও টিস্যু থেকে নিঃসৃত এক ধরনের রাসায়নিক বার্তাবাহক। এগুলো রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে পুরো দেহে ছড়িয়ে পড়ে ও পরবর্তীতে নির্দিষ্ট এক জায়গার রিসেপ্টর বা গ্রাহক কোষের সঙ্গে যোগ হয়। এ যোগ হওয়াটা এক ধরনের জৈবিক ‘হ্যান্ডশেইক’ বা করমর্দনের মতো কাজ করে, যা দেহকে কোনো নির্দিষ্ট কাজ করার নির্দেশ দেয়।
যেমন, ‘ইনসুলিন’ হরমোনটি যকৃৎ ও দেহের বিভিন্ন পেশী কোষকে রক্ত থেকে অতিরিক্ত গ্লুকোজ শুষে নিয়ে তা গ্লাইকোজেন হিসেবে জমা রাখতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞানীরা মানবদেহে এ পর্যন্ত ৫০টিরও বেশি হরমোন শনাক্ত করেছেন, যেগুলো একসঙ্গে মিলে মানুষের বৃদ্ধি ও বিকাশ, যৌন কার্যকারিতা, প্রজনন, ঘুম থেকে ওঠার চক্র ও মানসিক সুস্থতাসহ দেহের শত শত প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
কানাডার ‘ইউনিভার্সিটি অফ অটোয়া’র মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক নাফিসা ইসমাইল বলেছেন, “হরমোন সত্যিই আমাদের মেজাজ ও আবেগের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
“মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু অংশে তৈরি ও নিঃসৃত হওয়া নিউরোট্রান্সমিটারগুলোর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে হরমোন এ কাজটি করে। পাশাপাশি কোষের মৃত্যু বা ‘নিউরোজেনেসিস’, অর্থাৎ যখন নতুন নিউরন তৈরি বা জন্ম নেয় তখনও বিভিন্ন প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলে হরমোন এই ভূমিকা রাখে।”
প্রধান হরমোন পরিবর্তনের সময়গুলোতে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ও ‘পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার’ বা পিটিএসডি-এর মতো মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার প্রকোপ বেড়ে যায়, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এমনটা বেশি সত্য। শৈশবে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে বিষণ্ণতার হার প্রায় সমান থাকলেও বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছানোর পর ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং এ পার্থক্যটি পুরো জীবনজুড়েই থাকে।
তাহলে কি এর জন্য হরমোনই দায়ী? আপনি যদি একজন নারী হন তবে এটা জেনে হয়ত অবাক হবেন যে, বিভিন্ন সেক্স হরমোন মেজাজের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
একজন নারীর মাসিক বা পিরিয়ড শুরু হওয়ার আগের দিন ও সপ্তাহগুলোতে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মাত্রা কমে যায়, যা অনেকের ক্ষেত্রে খিটখিটে মেজাজ, ক্লান্তি, বিষাদ ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কোনো কোনো নারী ‘প্রিমেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার’ বা পিএমডিডি’এও আক্রান্ত হতে পারেন। পিএমডিডি হরমোনজনিত তীব্র এক মেজাজের ব্যাধি, যা মাসিকের আগের দুই সপ্তাহে অতিরিক্ত মেজাজের ওঠানামা, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা ও কখনো কখনো আত্মহত্যার চিন্তার মতো লক্ষণের মাধ্যমে চিহ্নিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ মেডিসিন’-এর মনোরোগ ও আচরণ বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক লিসা হান্টসু বলেছেন, “অনেক নারীর জন্য পিএমডিডি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, যা তাদের প্রতি মাসেই ঠেকাতে হয় এবং এমনটা তাদের জীবনে সত্যিই এক গভীর ও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।”
এর বিপরীতে, ‘ওভুলেশন’ বা ডিম্বস্ফোটনের ঠিক আগে ইস্ট্রোজেনের উচ্চ মাত্রা সুখানুভূতি ও আনন্দের সঙ্গে জড়িত। পাশাপাশি প্রোজেস্টেরন ভেঙে তৈরি হওয়া উপাদান ‘অ্যালোপ্রেগনানোলোন’ নারীদের শান্ত করার সক্ষমতার জন্য পরিচিত।
নারীদের কেবল ‘মাসের নির্দিষ্ট সময়টাই’ পার করতে হয় না। গর্ভাবস্থা, ‘পেরিমেনোপজ’ বা মেনোপজের আগের সময় ও মেনোপজের সময় হরমোনের ওঠানামাও মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। সন্তান জন্মদানের পরপরই প্রায় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত নারী বিষণ্ণতার শিকার হন।
কিন্তু এমনটি কেন হয়? সন্তান জন্মদানের ঠিক পরপরই নারীদের দেহে প্রোজেস্টেরন ও ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা হঠাৎ করে খুব দ্রুত কমে যায়। পেরিমেনোপজের সময়েও নারীদের ডিম্বাশয়ের হরমোনগুলোতে মারাত্মক ওঠানামা দেখা দিতে পারে।
কানাডার ‘ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টো’র মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক লিসা গ্যালিয়া বলেছেন, “বিষয়টি সম্ভবত একজন মানুষের দেহে হরমোনের ঠিক কতটা নিখুঁত মাত্রা রয়েছে তার ওপর নির্ভর করে না, বরং এসব পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে, যেখানে একজন মানুষের হরমোনের মাত্রা কম থেকে উচ্চ বা উচ্চ থেকে নিম্নে নেমে যায়।
“কিছু মানুষ এ ধরনের ওঠানামার প্রতি বেশি সংবেদনশীল হন। অন্যদিকে অনেকে খুব সহজেই মেনোপজের সময়টা পার করে যান এবং তাদের কোনো লক্ষণই দেখা দেয় না।”
এমনটা কেবল নারীদের ক্ষেত্রেই ঘটে না। পুরুষদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রাও কমে যায়। এ পরিবর্তনটি ধীর ও নারীদের মতো এতটা তীব্র নয়। তবে কিছু প্রমাণ থেকে জানা গেছে, এ সামান্য পরিবর্তনও সবার ক্ষেত্রে না হলেও কিছু কিছু পুরুষের মেজাজ পরিবর্তনের কারণ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
নাফিসা ইসমাইল বলেছেন, “জীবনচক্রে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমরা কিছু পুরুষের মেজাজেও পরিবর্তন দেখতে পাই এবং এমনটা নিশ্চিতভাবেই পর্যাপ্ত মনোযোগ পাওয়ার মতো বিষয়।”
সেক্স হরমোনগুলো কীভাবে মানুষের মেজাজের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে তার বোঝার একটি উপায় হচ্ছে মস্তিষ্কে ‘সেরোটোনিন’ ও ‘ডোপামিন’ নামের নিউরোট্রান্সমিটারগুলোর মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া।
সেরোটোনিনের কম মাত্রা দীর্ঘদিন ধরে বিষণ্ণতার একটি কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে এবং বর্তমানের বেশিরভাগ আধুনিক ‘অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট’ বা বিষণ্ণতা দূর করার ওষুধ মস্তিষ্কের এ রাসায়নিকের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এমন প্রমাণ রয়েছে যে, নির্দিষ্ট কিছু ইস্ট্রোজেন মস্তিষ্কের সেরোটোনিন রিসেপ্টরগুলোকে আরও বেশি কার্যকর করে তুলতে ও ডোপামিন রিসেপ্টরের সংখ্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।
আরেকটি তত্ত্ব হচ্ছে, ইস্ট্রোজেন নিউরনকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে ও মস্তিষ্কের ‘হিপোক্যাম্পাস’ নামের অঞ্চলে নতুন নিউরনের বৃদ্ধিতে উদ্দীপনা যোগাতে পারে, যা স্মৃতিশক্তি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখার জন্য পরিচিত।
বিষণ্ণতা ও অ্যালঝেইমার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা হিপোক্যাম্পাসে নিউরনের ঘাটতিতে ভোগেন। অন্যদিকে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ও ম্যাজিক মাশরুমে পাওয়া ‘সিলোসাইবিন’-এর মতো মেজাজ ভালো করার সাইকেডেলিক ওষুধগুলো মস্তিষ্কের এ অঞ্চলে নতুন নিউরন তৈরিতে সাহায্য করে।
ইসমাইল বলেছেন, “ইস্ট্রোজেন হচ্ছে নিউরো-প্রোটেক্টিভ বা নিউরন রক্ষাকারী, যা নিউরোজেনেসিস বা নতুন নিউরন তৈরিতে সহায়তা করে। এ কারণেই নারীরা যখন মেনোপজে প্রবেশ করেন তখন আমরা ডেনড্রাইট বা মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ থেকে গজানো শাখা-প্রশাখার এক ধরনের সংকোচন দেখতে পাই, যা জীবনের শুরুর দিকে প্রসারিত অবস্থায় ছিল।”
এ কারণেই মেনোপজের মধ্য দিয়ে যাওয়া নারীদের প্রায়ই ‘ব্রেন ফগ’ বা মানসিক অস্পষ্টতা ও স্মৃতিশক্তির সমস্যায় পড়তে হয়।
দেহের মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়াটি ভুল পথে পরিচালিত হলে কী হয়?
হিপোক্যাম্পাসে নিউরনের এ ঘাটতি দেহের অন্য এক হরমোন ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা ‘হাইপোথ্যালামাস-পিটুইটারি-অ্যাড্রেনাল’ বা এইচপিএ অ্যাক্সিস নামে পরিচিত, যেটি স্ট্রেস বা মানসিক চাপের প্রতি দেহের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
মানুষ উদ্বিগ্ন বোধ করলে ‘হাইপোথ্যালামাস’ বা মস্তিষ্কের এমন একটি অংশ, যা দেহের বেশিরভাগ হরমোন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে তা পিটুইটারি গ্রন্থিকে ‘অ্যাড্রেনোকোর্টিকোট্রপিক হরমোন’ বা এসিটিএইচ নিঃসরণের জন্য সংকেত পাঠায়।
এ সময় এসিটিএইচ বিভিন্ন অ্যাড্রেনাল গ্রন্থিকে ‘কর্টিসল’ নামের এক স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ করতে উদ্দীপিত করে। কর্টিসল তখন রক্তপ্রবাহে শর্করা বা চিনি ছাড়ার জন্য দেহেকে নির্দেশ দেয়, যা কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে কাজ করার জন্য মস্তিষ্ক ও দেহকে প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায়।
লিসা হান্টসু বলেছেন, “কেউ যখন অতিরিক্ত মানসিক চাপে থাকেন তখন এইচপিএ অ্যাক্সিস সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং স্বল্পমেয়াদে তা দেহের জন্য মানানসই বা উপকারী। কারণ এটি দেহকে মানসিক চাপ ঠেকাতে সাহায্য করে। তবে দীর্ঘমেয়াদেেএমনটা ক্ষতিকর হতে পারে।”
সাধারণত দেহে ছড়িয়ে পড়া কর্টিসল ‘নেতিবাচক ফিডব্যাক লুপ’ সক্রিয় করে, যার ফলে হিপোক্যাম্পাস হাইপোথ্যালামাসকে পিটুইটারি গ্রন্থির সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করার নির্দেশ দেয় এবং এর মাধ্যমে স্ট্রেস প্রতিক্রিয়াটি শেষ হয়।
তবে, কোনো ব্যক্তি যদি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যান, যেমন হুমকি, নির্যাতন বা সহিংসতার কারণে তখন এ ফিডব্যাক লুপটি আর কাজ করে না এবং মস্তিষ্ক কর্টিসলে ভেসে যায়, যা দেহের জন্য খুব ক্ষতিকর। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কর্টিসল মস্তিষ্কে প্রদাহ বাড়িয়ে দেয়, হিপোক্যাম্পাসের নিউরনগুলোকে মেরে ফেলে ও সেটিকে ওই নেতিবাচক ফিডব্যাক দিতে বাধা দেয়।
পাশাপাশি কর্টিসল মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশের নিউরনও ধ্বংস করতে পারে, যেমন ‘অ্যামিগডালা’ ও ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’, যা মানুষের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও মেজাজের ওপর প্রভাব ফেলে।
নাফিসা ইসমাইল বলেন, “অ্যামিগডালা হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্কের সেই অংশ, যা আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। এই অংশের আয়তন কমে যাওয়া বা ক্ষয় হওয়ার সঙ্গে আবেগপ্রবণতা বৃদ্ধি, খিটখিটে মেজাজ ও সেসব নেতিবাচক আবেগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
“প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের এই ক্ষয় মনোযোগ দিতে না পারা ও সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার তৈরি করে। আর হিপোক্যাম্পাসের ক্ষয়ের কারণে তথ্য মনে রাখার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়।”
কর্টিসল মানুষের মানসিক চাপ বা স্ট্রেস বাড়িয়ে দিলেও ‘লাভ হরমোন’ হিসেবে পরিচিত ‘অক্সিটোসিন’ ঠিক এর বিপরীত কাজ করে। উষ্ণ অনুভূতি, মায়া ও উদারতা বাড়াতে সাহায্য করার জন্য এ হরমোনের সুনাম রয়েছে। সন্তান প্রসব, স্তন্যদান ও অর্গাজমের সময় এ হরমোন নিঃসৃত হয়। তবে প্রাণী ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধন তৈরিতেও হরমোনটি ভূমিকা রাখে।
ইসমাইল বলেছেন, “অক্সিটোসিন বন্ধন ও নিরাপদ সম্পর্কের অনুভূতির সঙ্গে জড়িত এবং স্বাভাবিকভাবেই তা মানসিক চাপের প্রভাবকে ঠেকাতে সাহায্য করে। আমরা যখন নিরাপদ বোধ ও অনুভব করি যে, আমাদের আশপাশে সমর্থন বা পাশে থাকার মতো মানুষ আছে তখন হরমোনটি কর্টিসলের মাত্রা কমিয়ে দেয়, যা হয়ত মানসিক চাপের কারণে বেড়ে যেতে পারত।”
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, নাকের স্প্রে’র মাধ্যমে অক্সিটোসিন গ্রহণ করলে মানুষ আরও বেশি উদার, সহযোগিতাপরায়ণ ও সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে এবং অপরিচিত মানুষকেও বিশ্বাস করার প্রবণতা তাদের মধ্যে বাড়ে। তবে এ বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
যেমন, অক্সিটোসিন আসলেই ‘ব্লাড-ব্রেন ব্যারিয়ার’ বা রক্ত ও মস্তিষ্কের মধ্যবর্তী প্রতিবন্ধকতা পার হতে পারে কি না তা এখনও প্রমাণিত হয়নি।
গ্রহণযোগ্য তত্ত্বটি হচ্ছে, গলার কাছে থাকা প্রজাপতি আকৃতির একটি গ্রন্থি, যা ‘থাইরয়েড’ নামে পরিচিত। এর থেকে নিঃসৃত দুটি প্রধান হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের কারণ হতে পারে। হরমোন দুটি হচ্ছে ‘ট্রাইয়োডোথাইরোনিন’ ও ‘থাইরক্সিন’, যা একসঙ্গে মিলে হৃদস্পন্দন ও দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।
তবে এসব হরমোনের মাত্রা বেশি বেড়ে গেলে, যেমন কারো থাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে উঠলে তার উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, এর মাত্রা বেশি কমে গেলে বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন দেখা দেওয়াটা খুব সাধারণ বিষয়। হরমোনের এ মাত্রা ঠিক হলেই সাধারণত রোগীরা তাদের এসব লক্ষণ থেকে মুক্তি পেয়ে যান।
তবে থাইরয়েড হরমোন কেন মেজাজের ওপর এমন প্রভাব ফেলে তার সঠিক কারণটি এখনও অজানা। তবে একটি তত্ত্ব, বিশেষ করে ‘ট্রাইয়োডোথাইরোনিন’ হরমোন মস্তিষ্কে সেরোটোনিন ও ডোপামিনের মাত্রা বা এসব নিউরোট্রান্সমিটারের রিসেপ্টর বা গ্রাহক কোষের সংবেদনশীলতা বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া, মস্তিষ্কের যেসব অংশ মেজাজ নিয়ন্ত্রণে গভীরভাবে জড়িয়ে সেগুলোতেও থাইরয়েড হরমোনের রিসেপ্টর বা গ্রাহক অনেক পরিমাণে থাকে।