Published : 12 Mar 2026, 03:46 PM
অনুমতি ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইতে লেখকদের কাজ ব্যবহার করার প্রতিবাদে লন্ডনে প্রায় ১০ হাজার লেখক একজোট হয়ে একটি ‘খালি’ বই প্রকাশ করেছেন।
কাজুও ইশিগুরো, ফিলিপা গ্রেগরি ও রিচার্ড ওসমানের মতো বিখ্যাত লেখকদের এই অভিনব প্রতিবাদের মূল লক্ষ্য সৃজনশীল কাজ রক্ষায় কঠোর কপিরাইট আইনের দাবি জানানো।
ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান প্রতিবেদনে লিখেছে, প্রায় ১০ হাজার লেখক মিলে ‘ডোন্ট স্টিল দিস বুক’ নামের এই সংকলনটি তৈরি করেছেন, যেখানে কোনো রচনার বদলে আছে কেবল লেখকদের নামের একটি তালিকা।
মঙ্গলবার লন্ডনের বইমেলায় আগত দর্শকদের মাঝে এই বইটির কপি বিতরণ হয়। ব্রিটিশ সরকার কপিরাইট আইনের প্রস্তাবিত পরিবর্তনের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ আগে এ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হলো।
এআই কোম্পানিগুলো যেভাবে লেখকদের কাজ ব্যবহার করছে তা নিয়ে সৃজনশীল পেশাজীবীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী ১৮ মার্চের মধ্যে ব্রিটিশ মন্ত্রীদের এক অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও আইনি পরিবর্তনের অগ্রগতি বিষয়ক আপডেট জমা দিতে হবে।
বইটির আয়োজক এবং শিল্পী ও সুরকারদের কপিরাইট রক্ষার আন্দোলনের কর্মী এড নিউটন রেক্স বলেছেন, পুরো এআই শিল্পটিই দাঁড়িয়ে আছে “চুরি করা কাজের ওপর... যা অনুমতি বা কোনো পেমেন্ট ছাড়াই নেওয়া হয়েছে।
“বিষয়টি কোনো ছোটখাটো অপরাধ নয়, জেনারেটিভ এআই সেইসব মানুষের সঙ্গেই প্রতিযোগিতা করছে যাদের কাজের ওপর ভিত্তি করে এটি প্রশিক্ষণ পেয়েছে, যা ওই মানুষদের জীবিকা কেড়ে নিচ্ছে। সরকারের উচিত যুক্তরাজ্যের সৃজনশীল কর্মীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং এআই কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে সৃজনশীল কাজ চুরির এই প্রক্রিয়াকে আইনি স্বীকৃতি না দেওয়া।”
এ প্রতিবাদী বইটিতে নাম দেওয়া অন্যান্য লেখকদের মধ্যে রয়েছেন ‘স্লো হর্সেস’-এর লেখক মিক হেরন, মারিয়ান কেইস, ইতিহাসবিদ ডেভিড ওলুসোগা এবং ‘নটস অ্যান্ড ক্রস’-এর লেখক ম্যালোরি ব্ল্যাকম্যান।
লেখিকা ম্যালোরি ব্ল্যাকম্যান বলেছেন, “এআই কোম্পানিগুলো লেখকদের বই ব্যবহারের বিনিময়ে অর্থ দেবে এমনটি কোনোভাবেই অযৌক্তিক প্রত্যাশা নয়।”
বইটির পেছনের প্রচ্ছদে লেখা আছে, ‘এআই কোম্পানিগুলোর সুবিধার জন্য যুক্তরাজ্য সরকারের উচিত হবে না বই চুরিকে আইনি বৈধতা দেওয়া।’
এদিকে, প্রকাশকরাও লন্ডন বইমেলায় এআই লাইসেন্সিং সংক্রান্ত উদ্যোগ শুরু করতে যাচ্ছেন। ‘পাবলিশার্স লাইসেন্সিং সার্ভিসেস’ নামের এক অলাভজনক সংগঠন যৌথ লাইসেন্সিং স্কিম তৈরি করছে। তারা এই খাতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এতে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যাতে করে প্রকাশিত বিভিন্ন লেখা আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়।
চ্যাটবট ও ইমেজ জেনারেটরের মতো বিভিন্ন টুল তৈরি করতে এআইয়ের বড় সংখ্যাক ডেটার প্রয়োজন, যার মধ্যে ইন্টারনেট থেকে নেওয়া কপিরাইট-সংরক্ষিত কাজও রয়েছে।
এ বিষয়টি বিশ্বজুড়ে সৃজনশীল পেশাজীবী ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে, যার ফলে আটলান্টিকের উভয় পাড়েই (যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ) একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে।
গেল বছর বই লেখকদের করা এক মামলা মেটাতে ১৫০ কোটি ডলার দিতে রাজি হয়েছে এআই খাতের অন্যতম শীর্ষ কোম্পানি ও ক্লড চ্যাটবটের নির্মাতা অ্যানথ্রোপিক।
লেখকদের অভিযোগ ছিল, এ স্টার্টআপটি নিজেদের ফ্ল্যাগশিপ পণ্যকে প্রশিক্ষণ দিতে লেখকদের কাজের পাইরেটেড কপি ব্যবহার করেছে।
ব্রিটিশ সরকারের মূল প্রস্তাবটি নিয়ে সে দেশের শিল্পীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সরকারের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এআই কোম্পানিগুলো মালিকের অনুমতি ছাড়াই কপিরাইট-সংরক্ষিত কাজ ব্যবহার করতে পারবে, যদি না মালিক নিজে তার বইটি এআই প্রশিক্ষণে বৗবহার করা যাবেন না, এমন ঘোষণা দেন।
এ কপিরাইট আইন শিথিল করার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এলটন জনসহ আরও অনেক শিল্পী প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে সরকারকে ‘পুরোপুরি ব্যর্থ’ বলে বর্ণনা করেছেন তিনি।
মূল প্রস্তাবের পাশাপাশি ব্রিটিশ মন্ত্রীরা আরও তিনটি বিকল্পের কথা বলেছেন, যেখানে উল্লেখ রয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রাখা, কপিরাইটওয়ালা কাজ ব্যবহারের জন্য এআই কোম্পানিগুলোকে লাইসেন্স নিতে বাধ্য করা এবং সৃজনশীল প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিদের কোনো ধরনের বের হয়ে আসার সুযোগ না দিয়েই এআই কোম্পানিগুলোকে তাদের কাজ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া।
সরকার ‘বাণিজ্যিক গবেষণা’ কাজের জন্য কপিরাইট ছাড় দেওয়ার বিষয়টি নাকচ করেনি। সৃজনশীল পেশাজীবীদের ভয় ও এআই কোম্পানিগুলো এ সুযোগটি ব্যবহার করে অনুমতি ছাড়াই শিল্পীদের কাজ হাতিয়ে নিতে পারে।
সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “সরকার এমন এক কপিরাইট ব্যবস্থা চায়, যা মানুষের সৃজনশীলতাকে মূল্যায়ন ও সুরক্ষা দেবে, যার ওপর আস্থা রাখা যায় এবং উদ্ভাবনের পথ খুলে দেবে। আমরা এই বিষয়ে সৃজনশীল খাতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাব এবং ১৮ মার্চের মধ্যে পার্লামেন্টে আপডেট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করব।”