Published : 22 Jun 2026, 05:09 PM
কুড়িগ্রামের রাজারহাটে আধুনিক অটোমেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছ চাষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
পুকুর, ছাদ ও উঠানে ‘অটোমেটেড ফিশ ফিডার’, ‘এয়ারেটর’ ও সিসি ক্যামেরার মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে মাছের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি খরচ কমছে এবং চাষিদের আর্থিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজারহাট উপজেলার বোতলারপাড় এলাকার মৎস্যচাষি উমর ফারুক তার প্রায় দুই একর আয়তনের পুকুরে ‘অটোমেটেড ফিশ ফিডার’ মেশিন স্থাপন করেছেন।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএস বাংলাদেশ ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় জেলার বিভিন্ন পুকুরে এয়ারেটর, অটোমেটেড ফিশ ফিডার ও সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

মৎস্যচাষি উমর ফারুক বলেন, “প্রথমবারের মতো ‘অটোমেটেড ফিশ ফিডার মেশিন’ ব্যবহার করছি। প্রায় ৪৫ হাজার টাকা মূল্যের এই মেশিনে ১২০ কেজি পর্যন্ত খাবার রাখা যায়।
“মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাছকে খাবার সরবরাহ করে। বিদ্যুৎ না থাকলেও সোলারের মাধ্যমে এটি চালানো যায়। এতে শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমেছে, খাদ্যের অপচয় রোধ হয়েছে এবং সময় ও অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “পুকুরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করায় মাছের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়েছে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সময় ও শ্রম সাশ্রয়ের পাশাপাশি মাছের খাদ্যের অপচয় কমছে। ‘এয়ারেটরের’ মাধ্যমে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক থাকায় তীব্র গরমেও মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি মাছ চাষে রাসায়নিক ও মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারও কমছে।
আধুনিক পুকুর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব ব্যবহার কমিয়ে রোগ প্রতিরোধে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি অটোমেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি খামারের জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং পরিবেশবান্ধব মাছ চাষ সম্প্রসারণে কাজ চলছে।
মাছ চাষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পুকুরে সিসি ক্যামেরাও স্থাপন করা হয়েছে। এতে চুরি ও অন্যান্য ঝুঁকি কমছে। শ্রমিক সংকট মোকাবিলা এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতেও এসব প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

এছাড়া নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে পরিত্যক্ত বাড়ির ছাদ ও উঠানে ট্যাংকে মাছ চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলার প্রথমবারের মতো একোয়াপনিক্স পদ্ধতিতে মাছ ও সবজির সমন্বিত চাষ করা হচ্ছে। রাজারহাট উপজেলায় পাঁচটি ছাদ ও উঠানে স্থাপিত অস্থায়ী ট্যাংকে গড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার করে ভিয়েতনাম কই, ট্যাংরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হচ্ছে।
চাষি অনিতা রাণী বলেন, “আমার তিনতলার ছাদটি আগে পরিত্যক্ত ছিল। আরডিআরএস ও পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের সহায়তায় এখন সেখানে একোয়াপনিক্স পদ্ধতিতে মাছ ও সবজির সমন্বিত চাষ করছি। অস্থায়ী দুটি ট্যাংকে ভিয়েতনাম কই এবং ট্যাংরা মাছ চাষ করা হচ্ছে।
“পাশাপাশি ছাদ বাগানে মরিচ, শাকসবজি ও বিভিন্ন ফলের গাছ লাগানো হয়েছে। ছাদে মাছ ও সবজি চাষে আলাদা কোনো শ্রমিকের প্রয়োজন হয় না। বাড়ির কাজ শেষে অবসর সময়ে মাছের খাবার দেওয়া হয়। এতে পরিবারের খাদ্য চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।”
আরডিআরএস বাংলাদেশের মৎস্য টেকনিক্যাল অফিসার মোজাম্মেল হক বলেন, “দারিদ্র্যপীড়িত এই জেলার মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণ এবং অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে কাজ করছে আরডিআরএস বাংলাদেশ ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন।”
রাজারহাট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এমদাদুল হক বলেন, “উপজেলার বিভিন্ন পুকুরে প্রথমবারের মতো আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে মাছ উৎপাদন করা হচ্ছে। এটা মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। এতে করে মৎস্যজীবিদের সময়, অর্থ এবং ভোগান্তিও কমে আসবে।”