Published : 21 Mar 2026, 02:08 PM
নিরামিষভোজীদের পাঁচটি বিশেষ ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় অনেক কম– খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা নিয়ে করা যুগান্তকারী এক গবেষণায় এমনই তথ্য উঠে এসেছে।
গার্ডিয়ান লিখেছে, ১৮ লাখেরও বেশি মানুষের দীর্ঘ কয়েক বছরের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা এ গবেষণায় দেখা গেছে, মাংসভোজীদের তুলনায় নিরামিষভোজীদের অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের ঝুঁকি ২১ শতাংশ, প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি ১২ শতাংশ ও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি ৯ শতাংশ কম।
যুক্তরাজ্যে ক্যান্সারে যত মৃত্যু হয় তার প্রায় এক পঞ্চমাংশই ঘটে এ তিন ধরনের ক্যান্সারের কারণে। গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘ব্রিটিশ জার্নাল অফ ক্যান্সার’-এ।
গবেষণায় বলা হয়েছে, নিরামিষভোজীদের কিডনি ক্যান্সারের ঝুঁকি ২৮ শতাংশ ও ‘মাল্টিপল মায়োলোমা’ বা রক্তকণিকার এক ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি ৩১ শতাংশ কম।
‘ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড’-এ থাকাকালীন এ গবেষণাটি পরিচালনা করা প্রধান গবেষক ড. অরোরা পেরেজ কর্নগো বলেছেন, “যারা নিরামিষভোজী তাদের জন্য গবেষণাটি সুখবর। কারণ তাদের এমন পাঁচটি বিশেষ ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি কম থাকে, যার মধ্যে কয়েকটি সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায়।”
গবেষণায় সার্বিকভাবে নিরামিষভোজী হওয়াকে সুরক্ষামূলক মনে হলেও বিজ্ঞানীরা এর নেতিবাচক দিকও খুঁজে পেয়েছেন। মাংসভোজীদের তুলনায় নিরামিষভোজীদের খাদ্যনালীর সাধারণ ক্যান্সার বা ‘স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা’র ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ।
গবেষক দলটির ধারণা, নিরামিষভোজীদের শরীরে ভিটামিন বি’র মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি এর কারণ হতে পারে।
মাংসভোজীদের তুলনায় ভিগান বা যারা মাছ, মাংস, ডিম বা দুধসহ কোনো প্রাণিজ পণ্যই খান না তাদের কোলন বা অন্ত্রের ক্যান্সারের ঝুঁকি ৪০ শতাংশ বেশি।
গবেষকদের মতে, এর কারণ হতে পারে তাদের দেহে ক্যালসিয়ামের স্বল্পতা বা দৈনিক গড় গ্রহণ ৫৯০ মিলিগ্রাম এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের অভাব, যেখানে যুক্তরাজ্যে দৈনিক ৭০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়।
গবেষকরা বলছেন, মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নাকি নিরামিষ খাবারের বিশেষ কোনো গুণ ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে তা নিশ্চিতে আরও গবেষণার প্রয়োজন। ক্যান্সারের ধরনভেদে এ প্রশ্নের উত্তর ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড’-এর এপিডেমিওলজি বা রোগতত্ত্ব বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও এ গবেষণার সহ গবেষক টিম কি বলেছেন, “আমার মনে হয় মাংসের কারণেই এ পার্থক্য তৈরি হয়েছে। তবে, এমনটি কেবলই আমার মতামত। আমরা এমন কিছু সরাসরি পরীক্ষা করে দেখিনি।”
লাল মাংস ও প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়ার সঙ্গে অন্ত্রের ক্যান্সারের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে তবে এখন পর্যন্ত খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে অপেক্ষাকৃত বিরল ক্যান্সারগুলোর সম্পর্ক নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কারণ, আগের বিভিন্ন গবেষণাতে সাধারণত নিরামিষভোজী ও ভিগানদের সংখ্যা খুব কম থাকত।
এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য সর্বশেষ এ গবেষণায় বিশ্বজুড়ে খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণার তথ্য ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে গবেষকরা প্রায় ১৬.৪ লাখ মাংসভোজী, ৫৭ হাজার ১৬ জন মুরগিভোজী (যারা লাল মাংস খান না), ৪২ হাজার ৯১০ জন মৎস্যভোজী (যারা মাছ খান তবে মাংস নয়), ৬৩ হাজার ১৪৭ জন নিরামিষভোজী এবং ৮ হাজার ৮৪৯ জন ভিগানের তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
এসব ব্যক্তিদের গড়ে ১৬ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ক্যান্সার ঝুঁকির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন অন্য বিষয়গুলোও, যেমন দেহের ওজন বা বিএমআই ও ধূমপানে বিষয়টি গবেষণায় বিবেচনায় নিয়েছেন গবেষকরা।
‘ওয়ার্ল্ড ক্যান্সার রিসার্চ ফান্ড’-এর অর্থায়নে পরিচালিত এ গবেষণায় পাচনতন্ত্র, ফুসফুস, প্রজননতন্ত্র, মূত্রনালী ও রক্তসহ মোট ১৭ ধরনের ক্যান্সার নিয়ে গবেষণা চালানো হয়েছে।
মাংসভোজীদের তুলনায় নিরামিষভোজীদের অন্ত্রের ক্যান্সারের ঝুঁকি কম হওয়ার তেমন কোনো প্রমাণ এ গবেষণায় মেলেনি।
কারণ হিসেবে অধ্যাপক কি বলেছেন, এ গবেষণায় অংশগ্রহণকারী মাংসভোজীরা অন্যান্য আধুনিক দলের তুলনায় লাল মাংস ও প্রক্রিয়াজাত মাংস বেশ কম পরিমাণে খেয়েছেন।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এসব ফলাফল আগের গবেষণাগুলোর, যেখানে লাল ও প্রক্রিয়াজাত মাংসের সঙ্গে অন্ত্রের ক্যান্সারের সম্পর্ক প্রমাণ করেছিল এর সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যহীন নয়।
“মাংসভোজী দলটিতে যদি এমন মানুষ বেশি থাকতেন যারা প্রচুর পরিমাণে মাংস খান, তবে ফলাফল হয়ত ভিন্ন হতে পারত।”
গবেষণায় উঠে এসেছে, যারা কেবল মাছ খান বা পেসকাটারিয়ান তাদের স্তন, কিডনি ও অন্ত্রের ক্যান্সারের ঝুঁকি কম। অন্যদিকে, যারা কেবল মুরগির মাংস খান তাদের প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কম।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের গড়ে ১৬ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ফলে, বিজ্ঞানীদের জন্য ক্যান্সারের বিভিন্ন ফলাফল নিবিড়ভাবে নজরদারি করা সহজ হলেও এর ভিন্ন দিকও আছে।
১৯৯০ বা ২০০০-এর দশকে যখন লোকজনের তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছিল সে তুলনায় বর্তমান সময়ের খাদ্যাভ্যাসে অনেক পরিবর্তন এসেছে। যেমন, বর্তমানে অতি প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার বেড়েছে। আবার এখনকার ‘ভিগান’ পণ্যগুলোতে, যেমন ওট মিল্ক প্রায়ই বাড়তি ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান মেশানো থাকে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ অ্যাবারডিন’-এর ‘রোয়েট ইনস্টিটিউট’-এর পরিচালক অধ্যাপক জুলস গ্রিফিন এ গবেষণাটিকে চমকপদ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি এ গবেষণায় জড়িত ছিলেন না।
তিনি বলেছেন, “এ গবেষণায় অভাব ছিল এমন এক দলের সঙ্গে তুলনার, যারা এনএইচএস এর ‘ইটওয়েল’ নির্দেশিকা মেনে চলেন। এ নির্দেশিকায় পরিমিত পরিমাণে মাছ-মাংস খাওয়া হয়, যা দেহকে প্রয়োজনীয় পুষ্টিও যোগায়। সাধারণের মধ্যে খাদ্যাভ্যাসজনিত ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানোর জন্য সম্ভবত এটিই সবচেয়ে আদর্শ ডায়েট।”