Published : 27 Aug 2025, 04:51 PM
চকলেটের নিখুঁত স্বাদের রহস্য উন্মোচনের দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের এ উদ্ভাবন অবাক করতে পারে অনেককে।
মিষ্টিজাতীয় এ খাবারটি তৈরি হয় কোকো বিন বা কোকো ফলের বীজ দিয়ে, যা গাছ থেকে সংগ্রহের পর পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত ফারমেন্ট বা গাঁজনের জন্য রেখে দেওয়ার পর তা প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
তবে নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে, চকলেটের স্বাদ কেমন হবে তা নির্ভর করে গাঁজনের সময় কাজ করা মাইক্রোবস বা অণুজীবের ওপর, কোকো বীজের প্রকৃতি বা জিনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর নয়।
‘ইউনিভার্সিটি অফ নটিংহ্যাম’-এর বায়োবিজ্ঞান বিভাগের ড. ডেভিড গোপলচন বলেছেন, তাদের গবেষণার ফলে এমন চকলেট তৈরি করা সম্ভব হবে যার ‘স্বাদ ও গুণমান সব সময় একইরকম থাকবে’।
ড. গোপলচন বলেছেন, এ গবেষণার অনুপ্রেরণা ত্রিনিদাদে ‘কোকো রিসার্চ সেন্টার’-এ কাজ করার সময় পেয়েছিলেন তিনি।
“আমার আগের কর্মস্থলে অতিরিক্ত চকলেট থাকত আর আমি সেগুলো চেখে দেখার সুযোগ পেতাম। তখন আমি মাদাগাসকার, ইকুয়েডর, পেরুর মতো বিভিন্ন দেশের চকলেটের স্বাদ নিতে পারতাম, যা পরে গবেষণার অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।”
“এসব চকলেটের স্বাদ আলাদা ছিল... তখনই আমার মাথায় প্রশ্ন এল এ স্বাদের পার্থক্য কেন হচ্ছে? এর পেছনে আসল কারণ কী?”
তিনি বলেছেন, প্রচলিত বিশ্বাস হচ্ছে এ স্বাদের পার্থক্য মূলত বিভিন্ন অঞ্চলে জন্মানো কোকো গাছের জিনগত পার্থক্যের কারণেই হয়।
তবে ড. গোপলচন বলেছেন, এ ব্যাখ্যা ‘ঠিক মিলে যাচ্ছিল না’। কারণ কেবল কোকো গাছের জাত নয়, বরং স্থানভেদে স্বাদ বদলে যাচ্ছে। ফলে এ স্বাদের পার্থক্যের পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে।
স্বাদে পার্থক্যের রহস্য খুঁজতে কলম্বিয়ায় একটি গবেষণা চালান গবেষক ড. গোপলচন, যেখানে সানতান্দের, হুইলা ও আনতিওকিয়া নামের তিনটি ভিন্ন অঞ্চলের চকলেট খামারের সঙ্গে কাজ করেন তিনি।
ড. গোপলচন বলেছেন, “আমরা আগেই জানতাম কোকো বিন ঠিকভাবে গাঁজন করা না হলে সেই চকলেটের স্বাদ চকলেটের মতো হবে না। কারণ এটি চকলেট তৈরির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
“আরেকটি বিষয় আমাদের জানা ছিল, ফারমেন্টেশন বা গাঁজন মূলত মাইক্রোবস বা অণুজীবের কারণে ঘটে।”
ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়ায় কী ঘটছে তা জানার জন্য ডিএনএ সিকোয়েন্সিং ব্যবহার করে কোন কোন অণুজীব এখানে কাজ করছে তা খতিয়ে দেখেছে গবেষণা দলটি। একইসঙ্গে কোকো বিনের রাসায়নিক পরিবর্তনও বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা।
ড. গোপলচন বলেছেন, আনতিওকিয়া থেকে আসা চকলেটের স্বাদ অন্য দুই অঞ্চলের থেকে ‘অন্যরকম’ ছিল এবং সেখানে থাকা অণুজীবের ধরনও বেশ আলাদা ছিল।
বাইরে প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে অণুজীব সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে নিয়ে আসেন গবেষকরা। এরপর এসব অণুজীবকে নতুন কোকো বিনের সঙ্গে মিলিয়ে ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়া আবার শুরু করেন।
ড. গোপলচন বলেছেন, “আমরা দেখেছি বিভিন্ন কোকো বিন ল্যাবে ঠিক তেমনই ফারমেন্ট হতে শুরু করল যেমনটি আমরা মাঠে দেখেছি।”
তবে কেবল তা-ই নয়, বরং ল্যাবে তৈরি চকলেটের স্বাদও মাঠের মতোই, যা ছিল ‘খুবই বিস্ময়কর ব্যাপার’।
“পরীক্ষার ওই অংশটি ছিল এমন ধারণারই প্রমাণ, যেখানে প্রকৃতিতে কৃষকেরা যেভাবে প্রাচীন ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় ট্রপিক অঞ্চলে কোকো বিন গাঁজন করেন সেটিকেই আবার ল্যাবে আমরা তৈরি করতে পেরেছি। বিষয়টি তা-ই নয় কি? প্রকৃতির অদ্ভুত ও কঠিন এ প্রক্রিয়াটিকে বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে পুনরায় করা সম্ভবেরই ইঙ্গিত এটি।”
“এখন আমরা এ প্রক্রিয়াটি নিয়মিত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে আবার তৈরি করতে পারি। ফলে আমরা সবসময় একই মানের ও একই রকম স্বাদের চকলেট পেতে পারি।”
ড. গোপলচনের মতে, চকলেটের স্বাদ ঠিকঠাক নিয়ন্ত্রণ করা গেলে তা পুরো চকলেট ইন্ডাস্ট্রিতে ‘বড় ধরনের বদল’ আনবে।
“বর্তমানে চকলেট শিল্পের ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়ার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এ গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানি এমন স্বাদের চকলেট তৈরি করতে পারবে, যা তাদের নিজস্ব ও ইউনিক হবে এবং প্রতিবারই স্বাদ একই রকম থাকবে।”
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার মাইক্রোবায়োলজি’ সাময়িকীতে।