২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

‘শনির চাঁদের কৃত্রিম পরিবেশে’ বেঁচে থাকল পৃথিবীর অণুজীব

সুদূর এনসেলাডাসে হয়ত সরাসরি বসবাসের উপযোগী পরিবেশ নেই। তবে অন্তত কিছু নির্দিষ্ট ধরনের প্রাণের টিকে থাকার মতো অনুকূল পরিবেশ সেখানে থাকতে পারে

‘শনির চাঁদের কৃত্রিম পরিবেশে’ বেঁচে থাকল পৃথিবীর অণুজীব

আড়াই শ বছরেরও বেশি সময় ধরে ৩০০ মাইল চওড়া বরফের গোলকের মতো এনসেলাডাস। ছবি: নাসা

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 29 Sep 2026, 12:07 PM

Updated : 29 Sep 2026, 12:07 PM

শনি গ্রহের উপগ্রহ বা চাঁদ এনসেলাডাসের বরফে ঢাকা পৃষ্ঠ থেকে পানির ফোয়ারা বা বাষ্প উদ্গীরণের দৃশ্য দেখার পর থেকেই পৃথিবীর বাইরে প্রাণ সন্ধানে এটা সৌরজগতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।

সম্প্রতি গবেষকরা দেখেছেন, জাপানের গভীর সমুদ্রের পানিতে বসবাসকারী বিভিন্ন অণুজীব এনসেলাডাসের বরফাবৃত ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত মহাসাগরের মতো চরম প্রতিকূল পরিবেশেও বেঁচে থাকতে পারে। ফলে এই উপগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা আরও জোরালো হল।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, সাগরতলের হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট বা উষ্ণ প্রস্রবণের কাছাকাছি বাস করা এসব অণুজীব হাইড্রোজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডকে মিথেনে রূপান্তর করে টিকে থাকে।

শনির এই উপগ্রহের মহাসাগরের কৃত্রিম লবণাক্ত পরিবেশ তৈরি করে সেখানে পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, এগুলো সেখানেও টিকে থাকে।

এ গবেষণার ফলাফলে ইঙ্গিত মেলে, সুদূর এনসেলাডাসে হয়ত সরাসরি বসবাসের উপযোগী পরিবেশ নেই। তবে অন্তত কিছু নির্দিষ্ট ধরনের প্রাণের টিকে থাকার মতো পরিবেশ সেখানে থাকতে পারে।

মিউনিখের ‘লুডভিগ-ম্যাক্সিমিলিয়ান ইউনিভার্সিটি’র ভূ-মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক উইলিয়াম ওরসি বলেছেন, “বর্তমানে পৃথিবীতে আমরা প্রাণের যে সেলুলার বা কোষীয় সংজ্ঞা জানি তার ভিত্তিতে এ পরীক্ষামূলক ফলাফল বলছে, এই ধরনের কোনো জীব বা এর কাছাকাছি কিছু যদি এনসেলাডাসে থাকত তবে সেটার বেঁচে থাকার ভালো একটা সম্ভাবনা থাকত।”

সৌরজগতের অন্য যে কোনো গ্রহের তুলনায় শনির উপগ্রহের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। গ্যাস দানবীয় গ্রহটিকে ঘিরে থাকা পরিচিত উপগ্রহের সংখ্যা প্রায় ৩০০।

আড়াই শ বছরেরও বেশি সময় ধরে ৩০০ মাইল চওড়া বরফের গোলকের মতো এনসেলাডাসকে খুব একটা বিশেষ কিছু মনে করেননি বিজ্ঞানীরা। তবে রোবটিক মহাকাশযান পৌঁছানোর পর সেই ধারণার পরিবর্তন ঘটে।

২০০০-এর দশক থেকে নাসার ‘ক্যাসিনি’ প্রোব ও পরবর্তীতে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ পর্যবেক্ষণে এনসেলাডাস থেকে বড় আকারের জলীয় বাষ্প ও বরফের কণা ছিটকে বের হওয়ার দৃশ্য এবং এর জমাট বাঁধা পৃষ্ঠের নিচে বড় এক লবণাক্ত মহাসাগরের প্রমাণ মিলেছে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, উপগ্রহটির সমুদ্রের তলদেশ হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট বা উষ্ণ প্রস্রবণে ভরপুর, যা চারপাশের পানিকে উষ্ণ রাখে।

গেল বছর ক্যাসিনি প্রোব এনসেলাডাসের তেমনই এক চমৎকার বাষ্পীয় ফোয়ারার ভেতর দিয়ে উড়ে গিয়েছিল। ওই সময় এর সংগৃহীত নমুনার মধ্যে জৈব পদার্থের উপস্থিতি খুঁজে পান বিজ্ঞানীরা।

ল্যাবরেটরিতে এনসেলাডাসের সমুদ্রের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ তৈরি করতে চেয়েছিলেন ওরসি ও তার সহকর্মীরা।

পানি, লবণ, কার্বনেট ও গুঁড়ো পাথর একসঙ্গে মিশিয়ে তারা কেবল ওই মহাসাগরের চরম ক্ষারীয় পরিবেশই তৈরি করেননি, বরং পানিরাশি ও পাথুরে সমুদ্রতলের মধ্যে ঘটা গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলোও পুনর্নির্মাণ করেছেন।

পাথর ও পানির এসব বিক্রিয়া হাইড্রোজেন উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট সক্রিয় ছিল, যা এনসেলাডাসের মহাসাগরেও ঘটে।

ফলে গবেষকদের মনে প্রশ্ন জাগে, ‘মিথেনোজেন’ নামের পৃথিবীর যেসব অণুজীব হাইড্রোজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডকে মিথেনে রূপান্তর করে বেঁচে থাকে এরা এই কৃত্রিম দ্রবণে টিকে থাকতে পারবে কি না।

অধ্যাপক ওরসি বলেছেন, “বিষয়টি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ অনুমান ছিল।”

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা জাপান ও তাইওয়ানের মধ্যবর্তী ওকিনাওয়া খাদের গভীর সমুদ্রের হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট বা উষ্ণ প্রস্রবণ থেকে সংগৃহীত অণুজীবের ওপর পরীক্ষা চালান।

হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট হচ্ছে সমুদ্রতলের এমন এক উষ্ণ প্রস্রবণ, যেখান থেকে খনিজওয়ালা গরম পানি নির্গত হয়।

পিএইচ মাত্রা ১১-এ পৌঁছানোর পরও অনুজীবগুলো সেই কৃত্রিম সমুদ্রে বেড়েছে, যা এসব জীবের পরিচিত সহ্যক্ষমতার সীমার চেয়ে বেশি। পানির মধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব কম থাকায় এসব অণুজীব নিজেদের বিপাক ক্রিয়াও মানিয়ে নিয়েছে।

গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ।

‘ওপেন ইউনিভার্সিটি’র প্ল্যানেটারি জিওসায়েন্সের অধ্যাপক ডেভিড রদারি বলেন, কৃত্রিম এনসেলাডাস সমুদ্রে ‘মিথেনোজেনেসিস’ প্রক্রিয়ায় এসব অণুজীবের টিকে থাকা সম্ভব, গবেষণায় তা প্রমাণিত হওয়ায় এনসেলাডাসে অণুজীবের অস্তিত্ব ও টিকে থাকার সম্ভাবনা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ‘আরও একটি বড় বাধা দূর হলো’।

অধ্যাপক ওরসি বলেছেন, এনসেলাডাসে যদি কখনও প্রাণের বিকাশ ঘটে থাকেও তবে তা পৃথিবীর প্রাণের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। এ ধরনের জীব কোনোভাবে সেখানে জন্ম নিলেও মিথেন উৎপাদনকারী এসব অণুজীব উপগ্রহটির সমুদ্রে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারবে কি না তা স্পষ্ট নয়।

এসব পরীক্ষা কেবল কয়েক দিন স্থায়ী হয়েছিল। ওরসি প্রশ্ন রেখে বলেছেন, “এরা কি এক বছর টিকতে পারবে? এরা কি ১০ লাখ বছর টিকতে পারবে? আমরা জানি না।”

একই জার্নালে প্রকাশ পাওয়া দ্বিতীয় এক গবেষণা প্রবন্ধে গবেষকদের কেউ কেউ বর্ণনা করেছেন, এনসেলাডাসের বাষ্পীয় ফোয়ারার বরফ কণাগুলো কীভাবে জমে ও ভেঙে সমুদ্রের বিভিন্ন উপাদানকে আলাদা করে ফেলে।

মহাসাগরের ফোঁটাগুলোতে যদি ভিনগ্রহের অণুজীবের টুকরা থাকে তবে তা বরফের কণার ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে ঘনীভূত অবস্থায় পাওয়া যেতে পারে।

‘ফ্রি ইউনিভার্সিটি অফ বার্লিন’-এর প্ল্যানেটারি সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ফ্রাঙ্ক পোস্টবার্গ বলেছেন, এটা প্রাণের সন্ধানের জন্য ‘চমৎকার খবর’, কারণ বর্তমান প্রযুক্তির মাধ্যমেই প্রাণের লক্ষণগুলো তুলনামূলকভাবে সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

এনসেলাডাসকে ঘিরে চলা এ রোমাঞ্চকর বিজ্ঞান গবেষণা সেখানে পুনরায় কোনো অভিযান পরিচালনার আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছে।

‘ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি’ বা ইএসএ-এর প্রস্তাবিত ‘এলফোর’ মিশনে শনি গ্রহকে প্রদক্ষিণকারী একটি অরবিটারের সঙ্গে একটি ল্যান্ডার যোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ল্যান্ডারটি চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করে এর মহাসাগর থেকে উদ্গীরিত বাষ্পে প্রাণের জৈব-চিহ্ন বা বায়োসিগনেচার অনুসন্ধান করবে। তবে এজন্য বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে।

২০৪২ সালের দিকে এ মিশন উৎক্ষেপণের প্রস্তাব করা হয়েছে ও এটা ২০৫০-এর দশকের আগে শনি গ্রহে পৌঁছাবে না।