Published : 10 Aug 2026, 10:20 AM
মঙ্গলাভিযানের জন্য পরীক্ষামূলক কাজে ব্যবহৃত রোভার নিয়ে এবার চাঁদে অভিযানের পরিকল্পনা করছে নাসা। কারিগরি আধুনিকায়ন শেষে পারমাণবিক শক্তিচালিত রোভারটি বরফে ঢাকা চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে নজিরবিহীন অনুসন্ধান চালাবে।
লালগ্রহ মঙ্গলে জটিল মিশন পরিচালনার আগে সব ধরনের কারিগরি পরীক্ষা ও আপডেট যাচাই করতে পৃথিবীতেই ‘কিউরিওসিটি’ ও ‘পার্সিভ্যারেন্স’ রোভারের দুটি হুবহু পূর্ণাঙ্গ রেপ্লিকা তৈরি করেছিল মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা।
প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট প্রতিবেদনে লিখেছে পৃথিবীতেই স্থায়ীভাবে থাকার কথা ছিল এগুলোর তবে এবার এর একটি সংস্করণকে বা দুটির সংমিশ্রণে তৈরি এক হাইব্রিড রোভার ‘প্রমিস’কে চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি।
চাঁদের উদ্দেশ্যে ‘প্রমিস’
জুনের শেষভাগে চাঁদের বুকে ‘প্রমিস’ নামের একটি রোভার পাঠানোর নতুন প্রস্তাবের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে নাসা।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সাগান প্রতিষ্ঠিত অলাভজনক সংগঠন ‘প্ল্যানেটারি সোসাইটি ও বিবিসি’র প্রতিবেদন অনুসারে, পার্সিভ্যারেন্স রোভারের ইঞ্জিনিয়ারিং টেস্ট মডেলটিকেই নতুন রূপ দিয়ে চাঁদ অভিযানের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে।
প্রকল্পটি নিয়ে নাসা প্রকাশিত এক ভিডিওতে প্রথমে মঙ্গলে পার্সিভ্যারেন্সের ঐতিহাসিক অবতরণের দৃশ্য এবং পরবর্তীতে প্রদর্শিত হয় পৃথিবীতে থাকা এর রেপ্লিকা মডেলটি।
নাসার বিজ্ঞপ্তিতে নতুন এ যানটিকে ‘কিউরিওসিটি’ ও ‘পার্সিভ্যারেন্স’-এর টেস্ট মডেল দুটির এক ধরনের ‘হাইব্রিড’ বা মিশ্র রূপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে চাঁদের পৃষ্ঠে পা রাখতে যাওয়া নতুন এ যানে দুটি রোভারেরই ফিচার থাকবে।
‘প্রমিস’ নাম পাওয়ার আগে পার্সিভ্যারেন্সের এ টেস্ট মডেলটির প্রাতিষ্ঠানিক নাম ছিল ‘অপটিমিজম’।
চাঁদে নতুন ঘাঁটি গড়ার পরিকল্পনা সংক্রান্ত এক আপডেটে নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান বলেছেন, “মঙ্গলের বুকে রোভার দুটি পরিচালনা কারণে বছরের পর বছর ধরে পাওয়া অভিজ্ঞতা আমাদের হাতে রয়েছে, পাশাপাশি আমাদের কাছে রয়ে গেছে সরকারি অর্থায়নে তৈরি বেশ কিছু মূল্যবান হার্ডওয়্যার।
“ফলে আমাদের মনে প্রশ্নের উদয় হয় যে, ‘আমরা যদি এগুলোকেই সরাসরি চাঁদে পাঠিয়ে দিই, তবে কেমন হয়?’ এ ঘটনা দ্রুত চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে নজিরবিহীন অনুসন্ধান সক্ষমতা তৈরি করবে।”
ভবিষ্যতে ঘাঁটি গড়ার সম্ভাব্য স্থান হিসেবে চাঁদের দক্ষিণ মেরুকে চিহ্নিত করেছে নাসা। কারণ সেখানকার চরম শীতল ও ছায়াবৃত অঞ্চলে রয়েছে অনেক বরফ-পানি।
‘প্রমিস’ রোভারটিকে চাঁদের এ দক্ষিণ মেরুতে প্রাথমিক সমীক্ষা চালাতে এবং চন্দ্রপৃষ্ঠ ও এর তলদেশের বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করতে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ অভিযানের জন্য রোভারটিতে যুক্ত থাকবে একটি ‘মাল্টি-মিশন রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর’ বা ‘এমএমআরটিজি’, যা জ্বালানি হিসেবে প্লুটোনিয়াম ব্যবহার করবে।
এ জেনারেটরটি তেজস্ক্রিয় প্লুটোনিয়ামের স্বাভাবিক ক্ষয় থেকে উৎপন্ন তাপকে সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তর করবে। ফলে লক্ষ্যে পৌঁছাতে রোভারটির সূর্যালোকের ওপর নির্ভর করার কোনো প্রয়োজনই হবে না।
চন্দ্রঘাঁটি প্রকল্পের প্রোগ্রাম ম্যানেজার কার্লোস গার্সিয়া-গালান বলেছেন, “চাঁদ সংক্রান্ত অভিযানের ক্ষেত্রে রোভারে পারমাণবিক আরটিজি যুক্ত থাকার বড় সুবিধা হচ্ছে, আলোর উপস্থিতি বা উজ্জ্বলতা যেমনই হোক না কেন, আমরা যেখানে খুশি যেতে পারব।
“চাঁদের দীর্ঘ ও চরম শীতল রাত কাটিয়ে টিকে থাকা যে কোনো অভিযানের জন্যই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। তবে এ প্রযুক্তির কারণে সেই দুশ্চিন্তা আমাদের আর থাকছে না।”
কবে নাগাদ চাঁদে যাবে ‘প্রমিস’?
প্রমিস রোভারটি ঠিক কবে নাগাদ চাঁদের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে তা এখনও অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। কারণ, এই মুহূর্তে পুরো বিষয়টি একটি ধারণা বা প্রস্তাবনার পর্যায়ে রয়েছে।
পৃথিবীতে থাকা ‘অপটিমিজম’ বা পার্সিভ্যারেন্সের টেস্ট মডেলটি এখনই মহাকাশে উড়াল দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। মহাকাশে পাঠানোর আগে একে পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকরী চন্দ্র-রোভারে রূপান্তর করতে বেশ কিছু পরিবর্তন ও আধুনিকায়ন প্রয়োজন।
রোভারটিকে অভিযানের উপযোগী করে তুলতে কী কী পরিবর্তন আনা দরকার, সে বিষয়ে নাসা বিস্তারিত আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি।
তবে ‘প্ল্যানেটারি সোসাইটি’র তথ্য অনুসারে, যানটিতে এখনও ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের সেন্সর, মহাকাশ অভিযানের উপযোগী বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা বা কোনো পারমাণবিক জেনারেটর যুক্ত করা হয়নি।
রোভারের বর্তমান বিভিন্ন যন্ত্রাংশ চাঁদের উপরিভাগের ধারালো ও ক্ষতিকর ধূলিকণা সামলে নেওয়ার মতো সক্ষম নয়, অর্থাৎ চাঁদের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে একে বড় এক আপডেটের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
‘প্ল্যানেটারি সোসাইটি’র হিসাব অনুসারে, প্রমিস প্রজেক্টটি বাস্তবায়নে নাসার প্রায় ৭০ থেকে ১৩০ কোটি ডলার খরচ হতে পারে। সব কারিগরি আধুনিকায়ন শেষে ২০৩০ সালের শুরুর আগে চাঁদের উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপণ করা সম্ভব নয়।