Published : 02 Apr 2026, 02:05 PM
পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর বিধিনিষেধ এড়াতে এখন হংকংকেই বিকল্প পথ হিসেবে বেছে নিচ্ছে চীনের মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি। বিশ্ববাজারে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা পেতে হংকং এখন তাদের জন্য প্রধান প্রবেশদ্বার।
তবে বেইজিংয়ের কড়া নিয়ন্ত্রণ আর হংকংয়ের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে এ কৌশল কতটা সফল হবে তা নিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
হংকং আইল্যান্ডের এক হোটেলের লবিতে লিফটের দরজায় একটি রোবট কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল, এরপর মানুষজন বেরিয়ে যাওয়ার পর সুশৃঙ্খলভাবে লিফটের ভেতরে ঢুকে পড়ল।
রোবটের এ চলাফেরা দেখতে সহজ মনে হলেও আদতে তা নয়। আন্তর্জাতিক চেইন হোটেলের ব্যস্ত পরিবেশে কাজ করতে হলে রোবটটিকে এমন এক ভবনের ভেতর দিয়ে পথ চলতে হয়, যা তার জন্য মোটেও থেমে থাকবে না।
মানুষ সবসময়ই এর চলাচলের পথে চলে আসে। ফলে রোবটটিকে সঠিক তলায় যেতে হয় ও সেখান থেকে সঠিক রুমটি খুঁজে বের করার সক্ষমতাও পেতে হয়েছে।
এ রোবটটির নির্মাতা চীনা প্রযুক্তি কোম্পানি ‘ইউঞ্জি’। তারা হংকংকে ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে সফলভাবে ছড়িয়ে পড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
কোম্পানিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট সিই ইউনপেং বলেছেন, “আমাদের লক্ষ্য, আমাদের পণ্যটিকে প্রথমে হংকংয়ে সফল করা এবং তারপর বাইরের বিভিন্ন দেশে এর বিস্তার ঘটানো।”
মূল ভূখণ্ডের চীনা বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানির কাছে হংকং এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এখান থেকে তারা বিনিয়োগ সংগ্রহ করতে, আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের ওপর পণ্যের কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং বিদেশে ব্যবসা বাড়ানোর জন্য বিশ্বস্ততা পেতে পারছে।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমেরিকা ও ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশ এখন চীনা কোম্পানিগুলোর ব্যাপারে আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক।
কিছু বিশ্লেষক বিষয়টিকে ‘চায়না রিস্ক’ বা চীনের ঝুঁকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এসব দেশ আশঙ্কা করছে, এসব কোম্পানির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মদদে গোয়েন্দাগিরি বা তাদের প্রযুক্তি খাতে চীনাদের একাধিপত্য তৈরি হতে পারে।
এর ফলে মূল ভূখণ্ডের চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে পুঁজি সংগ্রহ করা, গ্রাহক পাওয়া ও বিশ্বাসযোগ্যতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। তারা বিকল্প হিসেবে শুরুতেই হংকংয়ের দিকে নজর দিচ্ছে।
শীর্ষ অ্যাকাউন্টিং কোম্পানি ‘প্রাইসওয়াটারহাউসকুপার্স’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত চীনা কোম্পানির সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে এ সংখ্যা ছিল ৩০টি, সেখানে ২০২৫ সালে তা ১৫৩ শতাংশ বেড়ে ৭৬টিতে দাঁড়িয়েছে।
হংকংয়ের বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা ‘ইনভেস্ট হংকং’ বলেছে, এ অঞ্চলে ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণে তারা চীনা কোম্পানিগুলোকে আগের চেয়ে বেশি সহায়তা করছে। এর মধ্যে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি খাতই সবচেয়ে বড় অবস্থানে রয়েছে।
রাজনৈতিক পরামর্শক কোম্পানি ‘ইউরেশিয়া গ্রুপ’-এর পরিচালক শিয়াওমেং লু বলেছেন, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নিউ ইয়র্ক শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার স্বপ্ন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় চীনা বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি এখন তাদের প্রাথমিক শেয়ার ছাড়ার জন্য ‘হংকংয়ের দিকে ঝুঁকছে’।
“বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণের জন্য হংকংই তাদের সেরা আশা। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের এমন এক খেলোয়াড় হিসেবে তুলে ধরতে চায়, যারা পুরোপুরি চীনা মূল ভূখণ্ডের বাজারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়।”
এদিকে, জার্মানভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘মেরকেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজ’-এর ওয়েন্ডি চ্যাং বলেছেন, হংকং এখন ‘চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সংযোগকারী হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলছে’।
শেয়ার বাজারে প্রবেশে দ্রুত ও সহজ নীতিমালাসহ চীনা মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন কোম্পানিকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করতে হংকং নানাভাবে সহায়তা করছে।
হংকংয়ের ওপর এ বাড়তি গুরুত্ব এমন এক সময়ে দেওয়া হচ্ছে যখন দেশকে প্রযুক্তিতে আরও বেশি ‘স্বাবলম্বী’ করে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে বেইজিং সরকার, বিশেষ করে এআই ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে বিদেশি হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা এখন চীনের অর্থনৈতিক নীতির মূল কেন্দ্রে রয়েছে।
বিষয়টি চীনের নতুন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনারও মূল লক্ষ্য। বর্তমান এ পরিকল্পনায় প্রযুক্তিকে কেবল অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে কৌশলগত বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক বাণিজ্য পরামর্শক ‘ডিজিএ গ্রুপ’-এর পার্টনার পল ট্রিওলো বলেছেন, এ পরিস্থিতিতে ‘উচ্চ প্রযুক্তিওয়ালা বিভিন্ন চীনা কোম্পানির কাছে হংকংয়ের কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেড়েছে’।
ফরাসি বিনিয়োগ ব্যাংক ‘নাটিক্সিস’-এর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া হেরেরো বলেছেন, হংকং চীনা কোম্পানিগুলোকে এমন এক প্ল্যাটফর্ম দিচ্ছে, যেখানে তারা আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখার সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারছে। ফলে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকদের কাছে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হচ্ছে।
‘ইউঞ্জি’-এর কাছে বিষয়টির মানে হচ্ছে, তাদের রোবটগুলো যে আন্তর্জাতিক পরিবেশে বাস্তবসম্মতভাবে কাজ করতে পারে, তা প্রমাণ করা। হোটেল, হাসপাতাল ও কারখানার জন্য সার্ভিস রোবট তৈরি করা এ কোম্পানিটি গেল বছরের অক্টোবরে হংকংয়ের শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য, মূল ভূখণ্ডের বাইরে গিয়ে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছানো।
চীনা এআই সফটওয়্যার কোম্পানি ‘মাইনিংল্যাম্প টেকনোলজি’ একই মাসে হংকংয়ে নিজেদের কার্যক্রম শুরু করেছে। হংকংকে ‘ডেটা কমপ্লায়েন্স ট্রান্সফার স্টেশন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এর প্রতিষ্ঠাতা উ মিংহুই।

তিনি বলেছেন, হংকং এমন এক জায়গা, যেখানে তাদের মতো বিভিন্ন চীনা কোম্পানি অন্য দেশে যাওয়ার আগে আন্তঃসীমান্ত ডেটা আদান-প্রদান ও আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন বা কমপ্লায়েন্সের বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা করে নিতে পারে।
তবে কোনো চীনা কোম্পানি হংকংয়ে সফল হলেও বিদেশের বাজারে তাদের বাধার মুখে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ডেটা সুরক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তার অজুহাতে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির ওপর কড়া নজরদারি শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো কিছু দেশ এরইমধ্যে তাদের টেলিকম নেটওয়ার্ক থেকে চীনা সরঞ্জাম সরবরাহকারীদের সরিয়ে দেওয়ার বা নিষিদ্ধের পদক্ষেপ নিয়েছে।
এ ছাড়া পশ্চিমা বিভিন্ন দেশের চীনা কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা ও পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ‘লাকিন কফি’ কেলেঙ্কারিটি এখনও সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। ওই চীনা কোম্পানিটি তাদের বিক্রির হিসাবে জালিয়াতির কথা স্বীকার করেছিল।
এ জালিয়াতি ফাঁস হওয়ার পর ২০২০ সালে নিউ ইয়র্কের ‘নাসডাক’ শেয়ার বাজার থেকে কোম্পানিটিকে বের করে দেওয়া হয়।
এদিকে, হংকং আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের কাছে আগের মতো আর আগ্রহের কেন্দ্রে নেই। ২০১৯ সালের বড় গণতন্ত্রপন্থি বিক্ষোভের পর কর্তৃপক্ষ সেখানে কঠোর এক জাতীয় নিরাপত্তা আইন ও নতুন স্থানীয় নিরাপত্তা আইন জারি করেছে।
নিরাপত্তা ও সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় এরইমধ্যে কয়েক ডজন অধিকারকর্মী, বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিককে গ্রেপ্তার বা জেলে দেওয়া হয়েছে।
বেইজিং ও হংকংয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এসব পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল। তবে সমালোচকদের মতে, এর ফলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে।
পল ট্রিওলো বলেছেন, হংকংয়ে ঘাঁটি গড়লেও অনেক চীনা কোম্পানিকে বেইজিংয়ের তৈরি করা নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়, যার মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা নিয়ন্ত্রণ ও এআই ব্যবহারের শর্তাবলি অন্যতম।
“হংকং আসলে এসব কোম্পানির জন্য কোনো ভূ রাজনৈতিক ঢাল নয়, বরং তাদের বিভিন্ন ঝুঁকিকে কেবল আংশিকভাবে কমাতে পারে।”