Published : 15 Aug 2026, 01:05 PM
এ সপ্তাহে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের আকাশে দেখা যাওয়া সূর্যগ্রহণটি কেবল এক মনোমুগ্ধকর মহাজাগতিক দৃশ্যই ছিল না, বরং সূর্যকে আরও গভীরভাবে জানার এক অনন্য সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট প্রতিবেদনে লিখেছে, বুধবার সন্ধ্যায় লাখ লাখ মানুষ আকাশে চোখ রেখেছিলেন। তারা প্রত্যক্ষ করেছেন কীভাবে চাঁদ ধীরে ধীরে সূর্যের সামনে এসে সূর্যকে আড়াল করে দেয়।
চাঁদ সূর্যের অংশ গ্রাস করার সময় এক বিরল দৃশ্যের তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে দিনের আলো ঝাপসা হয়ে আশপাশে নেমে আসে এক অদ্ভুত ও রহস্যময় আমেজ।
তবে এই লাখ লাখ দর্শকের মধ্যে অনেকেই ছিলেন বিজ্ঞানী। গ্রহণের সময় সংগৃহীত নানা তথ্য ব্যবহার করে আমাদের এ নিকটতম তারাটিকে আরও ভালোভাবে বুঝতে গবেষণা চালাবেন।
পৃথিবীর বুকে প্রাণের সঞ্চারে সূর্যের ভূমিকা কেন্দ্রীয় হলেও এবং এমনটা প্রতিদিন আমাদের চোখে ধরা দিলেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সূর্য এখনও রহস্যের সাগরে ঘেরা। এ সূর্যগ্রহণই সেই রহস্যের জট খুলতে সাহায্য করতে পারে।
মানুষের পাশাপাশি বিজ্ঞানীদের কাছেও এ সূর্যগ্রহণের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব অপরিসীম। চাঁদ ঠিক নিখুঁতভাবে সূর্যের সামনে চলে আসায় কেবল সূর্যের একদম বাইরের বায়ুমণ্ডলীয় স্তর, যা ‘করোনা’ নামে পরিচিত তা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
এ দৃশ্য একদিকে যেমন চমৎকার সব আলোকচিত্র তৈরির সুযোগ দিয়েছে তেমনই গবেষকদের জন্য সূর্যের আশপাশের গ্যাসের এ বলয়টি নিয়ে পড়াশোনার এবং আমাদের তারার ভেতরের কর্মপদ্ধতি বোঝার পথ খুলেছে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে তাদের গবেষণাকাজে সূর্যগ্রহণকে ব্যবহার করে আসছেন। ১৯১৯ সালে ব্রাজিলে দেখা যাওয়া পূর্ণগ্রাস এক সূর্যগ্রহণই প্রথম আইনস্টাইনের ‘আপেক্ষিকতা তত্ত্ব’ প্রমাণের সুযোগ করে দিয়েছিল।
সেই গ্রহণের সময় তোলা আলোকচিত্র ব্যবহার করে পরীক্ষা করা হয়েছিল কীভাবে তীব্র মহাকর্ষ বল আলোর গতিপথকে বাঁকিয়ে দেয়, যা দিনশেষে আইনস্টাইনের তাত্ত্বিক গবেষণাকে সত্য বলে প্রমাণ করেছে।
বর্তমান সময়েও সূর্যগ্রহণ জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্য এক অনন্য দুয়ার উন্মোচন করেছে। বিজ্ঞানীরা ‘করোনাগ্রাফ’ নামে বিশেষ এক যন্ত্র ব্যবহার করে সূর্যের বাকি অংশ ঢেকে রেখে কৃত্রিমভাবে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের পরিবেশ তৈরি করতে পারেন।
তবে সেইসব যন্ত্র শতভাগ নিখুঁত নয়। ফলে সূর্যের অতি নিকটবর্তী ‘করোনা’র স্পষ্ট দৃশ্য পেতে সেখানে নানা সীমাবদ্ধতা থেকেই যায়। ফলে ‘করোনা’র একদম ভেতরের গভীর অংশটি নিখুঁতভাবে দেখার একমাত্র উপায় প্রাকৃতিক পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ।
সূর্য কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে তৈরি হওয়া জটিল বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে এর মাধ্যমে। যেমন, সূর্যের উত্তাপ ও বিপুল শক্তি কীভাবে সৌরবায়ুর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের পৃথিবী ও দৈনন্দিন প্রযুক্তি ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে এমনটা বুঝতে ভূমিকা রাখবে।
পৃথিবীও আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করতে পারে। সূর্যগ্রহণের সময় পৃথিবীর নির্দিষ্ট এক অঞ্চল জুড়ে আলোর অনুপাতে একদম ভিন্ন আমেজ দেখা যায়।
আলোর এ স্থানিক পরিবর্তন বা অন্ধকারাচ্ছন্নতাকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন কীভাবে সূর্য আমাদের বায়ুমণ্ডলে প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে, যেখানে সূর্যের শক্তি থেকে তৈরি হয় আধানওয়ালা কণার বিশেষ এক স্তর।
নাসা ও বিশ্বমানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বহু দশক ধরে সূর্যগ্রহণের এসব প্রভাবকে গবেষণার কাজে ব্যবহার করে আসছে। যেমন, ২০২৪ সালে উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত বড় পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় নাসা বেশ কিছু বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছিল।
বায়ুমণ্ডল নিয়ে গবেষণার জন্য তারা বৈজ্ঞানিক বেলুন আকাশে উড়িয়েছিল এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের আশপাশের ‘করোনা’ কীভাবে পরিবর্তিত হয় তা গভীরভাবে পরীক্ষা করতে গ্রহণের গতিপথজুড়ে বিশেষ আলোকচিত্রগ্রাহক দল পাঠিয়েছিল।
এ বছরেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ২০২৬ সালের এই সূর্যগ্রহণের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে নাসা আইসল্যান্ড ও স্পেনে পূর্ণগ্রাস গ্রহণ তৈরির সময় বৈজ্ঞানিক বেলুন ও বিশেষ জেটে করে একাধিক গবেষণা চালিয়েছে, যাতে এই পূর্ণগ্রাস মুহূর্তের বৈজ্ঞানিক সুযোগ শতভাগ গ্রহণ করা যায়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করে সূর্য সম্পর্কে আরও গভীর ও নিখুঁত জ্ঞান পাওয়া সম্ভব। এর মাধ্যমে পাওয়া যাবে প্রয়োজনীয় তথ্য, যার মধ্যে অন্যতম ‘মহাকাশের আবহাওয়া’ সংক্রান্ত আগাম ও নির্ভুল পূর্বাভাস।
এসব পূর্বাভাস পৃথিবীর স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়া বা বিদ্যুৎ সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো বড় বিপর্যয় এড়াতে সাহায্য করতে পারে।
তবে এ বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজ এখানেই থেমে থাকছে না। ২০২৭ সালে আবারও দেখা দেবে সূর্যগ্রহণ। বিজ্ঞানীরা তখন একই ধরনের গবেষণা আরও বড় পরিসরে চালানের পরিকল্পনা করছেন, যা তাদেরকে পর পর ঘটে যাওয়া বিভিন্ন গ্রহণের ডেটা বিশ্লেষণ ও বৈজ্ঞানিক তথ্য মিলিয়ে দেখার সুযোগ করে দেবে।
আরও পড়ুন…
সূর্যের রহস্যভেদে সূর্যগ্রহণকে কাজে লাগাবে বিজ্ঞানীদের এই পরীক্ষা