Published : 27 May 2026, 01:39 PM
প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে ভূগর্ভের গভীরে এক অভূতপূর্ব ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছেন বিজ্ঞানীরা।
স্যাটেলাইটের পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পৃথিবীর তরল বহিঃস্থ কোর বা কেন্দ্রের বড় এক অংশ হঠাৎ করেই তার ঘূর্ণনের দিক পরিবর্তন করে উল্টো দিকে বইতে শুরু করেছে।
পৃথিবীর সুরক্ষাকবচ তথা চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরিকারী এ স্তরের এমন আকস্মিক ও অদ্ভুত আচরণ বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের ধারণাকে যেমন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে তেমনই গভীর ভূগর্ভের রহস্য উন্মোচনে নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ‘সোয়ার্ম’ ও ‘ক্রায়োস্যাট’ মিশনসহ বেশ কিছু স্যাটেলাইট ও ভূপৃষ্ঠের পর্যবেক্ষণ থেকে ১৯৯৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন গবেষণায় এ তথ্য মিলেছে।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘জার্নাল অফ স্টাডিজ অফ আর্থস ডিপ ইন্টেরিয়র’-এ।
পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই হাজার দুইশ কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত এ বহিঃস্থ কোরটি গলিত লোহা দিয়ে তৈরি। কঠিন অভ্যন্তরীণ কেন্দ্র বা ইনার কোরকে ঘিরে উত্তপ্ত এ তরল ধাতুর স্তরের আবর্তনের ফলেই পৃথিবীর চারপাশে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়।
এ চৌম্বক ক্ষেত্রটি সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকর চার্জওয়ালা কণার হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে, যা স্যাটেলাইট, ন্যাভিগেশন সিস্টেম ও আধুনিক প্রযুক্তির সচলতার জন্য জরুরি।
কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীদের অনুমান ছিল, বহিঃস্থ কোরের এ বড় আকারের তরল প্রবাহ তুলনামূলকভাবে বেশ স্থিতিশীল ও তা পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়।
তবে নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১০ সালে বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশের বড় এক অঞ্চলের প্রবাহ হঠাৎ করেই দিক পরিবর্তন করে তীব্র বেগে পূর্ব দিকে বইতে শুরু করেছে। এ নাটকীয় পরিবর্তনের প্রকৃত কারণ কী তা গবেষকরা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেননি।
‘এডিনবার্গ ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক ও এ প্রধান গবেষক ফ্রেডেরিক ডাল ম্যাডসেন বলেছেন, এ আবিষ্কারটি পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তরভাগ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে।
গবেষকরা এখন জানার চেষ্টা করছেন, এ দিক পরিবর্তনটি সাময়িক কোনো বিপর্যয়, কোনো চক্রের অংশ নাকি দীর্ঘস্থায়ী কোনো পরিবর্তনের সূচনা।
গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, কয়েক বছর আগে এ পূর্বমুখী প্রবাহটি এর সর্বোচ্চ গতিতে পৌঁছানোর পর, এখন আবার তা দুর্বল হতে শুরু করেছে। বহিঃস্থ কোরের এই দিক পরিবর্তনের সময়টির সঙ্গে ভূকম্পন ও ভূ-স্থানিক গবেষণায় ধরা পড়া পৃথিবীর ইনার কোর বা অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রের এক অস্বাভাবিক আচরণের মিল রয়েছে। এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, পৃথিবীর গভীরের বিভিন্ন স্তর বিজ্ঞানীদের আগের ধারণার চেয়েও একে অপরের সঙ্গে বেশি সংযুক্ত।
আধুনিক স্যাটেলাইট ছাড়া এ আবিষ্কার কোনোভাবেই সম্ভব হত না। ২০১৩ সালে উৎক্ষেপণ করা ‘সোয়ার্ম’ মিশনে তিনটি স্যাটেলাইট রয়েছে, যেগুলোতে থাকা সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সামান্যতম পরিবর্তনও নিখুঁতভাবে মেপে নিতে পারে।
ভূত্বক, মহাসাগর, বায়ুমণ্ডল ও পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে আসা সংকেতগুলোকে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ভূগর্ভের হাজার হাজার কিলোমিটার গভীরে ঘটে যাওয়া এ নড়াচড়া ট্র্যাক করতে পেরেছেন।
এসব সূক্ষ্ম পরিমাপের সাহায্যেই গবেষকরা বহিঃস্থ কোরের আকস্মিক বিভিন্ন পরিবর্তন শনাক্ত করতে পেরেছেন। একইসঙ্গে গলিত লোহার প্রবাহে তরঙ্গের মতো যে ওলটপালট হচ্ছিল, যা পুরোনো ও অস্পষ্ট তথ্যের কারণে আগে আড়ালে রয়ে গিয়েছিল তা-ও তারা ধরতে পেরেছেন।
এসব ঘটনা ভূপৃষ্ঠের অনেক গভীরে ঘটছে ও মানুষের জন্য কোনো সরাসরি বিপদ তৈরি করছে না। তবে পৃথিবী কীভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য এগুলো জানা জরুরি।
পৃথিবীর বহিঃস্থ কোরের নড়াচড়ার কারণে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রও অনবরত পরিবর্তিত হয়। আর এসব পরিবর্তন মহাকাশযানের কার্যক্রম, স্যাটেলাইট যোগাযোগ ও ন্যাভিগেশন সিস্টেমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, নতুন এ আবিষ্কার প্রমাণ করেছে, পৃথিবীর কেন্দ্র বা কোর আমাদের আগের ধারণার চেয়েও বেশি গতিশীল ও অননুমেয়। আগামী বছরগুলোতে স্যাটেলাইট মিশনগুলো যখন আরও তথ্য সংগ্রহ করতে থাকবে, তখন গবেষকরা পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তর থেকে আমাদের এ গ্রহটিকে নিয়ন্ত্রণ করা রহস্যময় বিভিন্ন শক্তিকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবেন।