Published : 18 May 2026, 11:51 AM
বিশ্বজুড়ে নারীদের মধ্যে যেসব ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি দেখা যায় তার মধ্যে অন্যতম স্তন ক্যান্সার। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীদের এ ক্যান্সার কেন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ছিলেন না।
গত কয়েক দশকে স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসায় বড় অগ্রগতি হলেও প্রতি বছর এ রোগে এখনও বহু নারীর মৃত্যু হচ্ছে, বিশেষ করে এ রোগটি যখন স্তন ছাড়িয়ে দেহের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে তখন ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ প্রতিবেদনে লিখেছে, চিকিৎসকেরা ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার এ প্রক্রিয়াটিকে বলেছেন ‘মেটাস্ট্যাসিস’। এ মেটাস্ট্যাসিসই স্তন ক্যান্সার নিরাময় কঠিন হয়ে ওঠার অন্যতম প্রধান কারণ।
নতুন গবেষণা বলছে, কম বয়সী রোগীদের তুলনায় প্রবীণ বা বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যান্সারের পরিণতি প্রায়ই বেশি মারাত্মক হয়। বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরেই এ বিষয়টি লক্ষ্য করছেন। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে এ রোগটি কেন আরও বিপজ্জনক রূপ নেয় তার সুনির্দিষ্ট কারণ তারা এতদিন পুরোপুরি বুঝতে পারছিলেন না।
অবশেষে আমেরিকার ‘জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি’র ‘লোম্বার্ডি কমপ্রিহেনসিভ ক্যান্সার সেন্টার’-এর একদল বিজ্ঞানী দাবি করছেন, তারা এ জটিল ধাঁধার সমাধান উন্মোচন করতে পেরেছেন।
বিজ্ঞানীদের এ নতুন গবেষণায় ‘রেইজ’ নামের একটি প্রোটিন রিসেপ্টরের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যার পূর্ণ রূপ ‘রিসেপ্টর ফর অ্যাডভান্সড গ্লাইকেশন এন্ড-প্রোডাক্টস’।
গবেষকরা বলছেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ রিসেপ্টরটি এমনভাবে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে, যা দেহে প্রদাহ বাড়িয়ে দিয়ে স্তন ক্যান্সারকে সহজে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে।
এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘কমিউনিকেশনস বায়োলজি’-তে, যা ক্যান্সার ও বার্ধক্যজনিত বিষয়ের ওপর বিশেষায়িত ‘নেচার’ জার্নালের এক বিশেষ সংকলনেও স্থান পাবে।
এ গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন ‘জর্জটাউন লোম্বার্ডি’র অনকোলজি বা ক্যান্সার ও টিউমার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ব্যারি হাডসন।
বয়স বেড়ে যাওয়ার ফলে দেহের ভেতর এমন কিছু পরিবর্তন আসে, যা ক্যান্সারের বিস্তারকে প্রভাবিত করে। তবে, ক্যান্সারের বেশিরভাগ গবেষণাই ল্যাবরেটরির কম বয়সী ইঁদুরের ওপর করা হয়। ফলে বয়স্কদের দেহে যে ধরনের গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক পরিবর্তন ঘটে তা গবেষকদের নজর এড়িয়ে গিয়ে থাকতে পারে।
নতুন গবেষণাটি কোভিড-১৯ মহামারীর সময় তৈরি হওয়া অপ্রত্যাশিত এক পরিস্থিতির কারণে লাভবান হয়েছে। মহামারীর লকডাউনের কারণে ল্যাবরেটরির স্বাভাবিক কাজকর্ম ধীর হয়ে পড়েছিল। ফলে কিছু ইঁদুরের দল মূল পরিকল্পনার চেয়ে বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকার ও বয়স্ক হওয়ার সুযোগ পায়।
এমনটি গবেষকদের জন্য এক বিরল সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, যার মাধ্যমে তারা তরুণ ও বয়স্ক ইঁদুরের দেহে ক্যান্সারের আচরণ সরাসরি তুলনা করার সুযোগ পেয়েছেন।
বিজ্ঞানীরা এ গবেষণায় ‘ট্রিপল-নেগেটিভ ব্রেস্ট ক্যান্সার’-এর তিনটি ভিন্ন ভিন্ন মাউস মডেল বা ইঁদুরের কৃত্রিম রূপ ব্যবহার করেছিলেন, যা স্তন ক্যান্সারের অন্যতম মারাত্মক ও আক্রমণাত্মক রূপ।
ট্রিপল-নেগেটিভ স্তন ক্যান্সার বিশেষভাবে বিপজ্জনক। কারণ তা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা দেখায় এবং স্তন ক্যান্সারের অন্যান্য রূপের তুলনায় এর চিকিৎসায় বিকল্পও বেশ সীমিত।
গবেষকরা বলছেন, তরুণ ইঁদুরগুলোর তুলনায় বয়স্ক ইঁদুরগুলোর ফুসফুসে বেশি মাত্রায় ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে। তবে উভয় দলের ইঁদুরের দেহেই মূল টিউমারটি একই গতিতে বড় হয়েছিল।
এ ফলাফল থেকে ইঙ্গিত মেলে, বার্ধক্য কেবল টিউমারের আকার বড় করে না, বরং তা ক্যান্সারের ছড়িয়ে পড়ার বা দেহের অন্যান্য অংশে বিস্তার লাভের সক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয়।
এরপর গবেষক দলটি ‘রেইজ’ রিসেপ্টরের ওপর মনোযোগ দিয়েছে। এ রিসেপ্টরটি কোষের উপরিভাগে থাকে ও দেহের ভেতরে প্রদাহ বাড়ানোর জন্য পরিচিত।
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের সঙ্গে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, অ্যালঝেইমার্স ও ক্যান্সারের মতো বয়সজনিত বহু রোগের যোগসূত্র এরইমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে ইঁদুরের দেহ থেকে ‘রেইজ’ রিসেপ্টরটি অপসারণ বা বাদ দেওয়ার সময় বয়স্ক ইঁদুরগুলোর দেহে ক্যান্সারের নাটকীয় বিস্তার বা মেটাস্ট্যাসিস প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এ থেকে জোরালোভাবে প্রমাণ মেলে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেহে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে ‘রেইজ’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গবেষকরা বলছেন, বয়স বেড়ে যাওয়ার ফলে দেহে ‘এস১০০’ ও ‘এইচএমজিবি১’ নামের প্রদাহজনিত প্রোটিনের মাত্রাও বেড়ে যায়। এসব প্রোটিন ‘রেইজ’ রিসেপ্টরকে সক্রিয় করে তোলে। মূল টিউমার ও দেহের যেসব জায়গায় ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে উভয় স্থানেই এসব প্রোটিনের উপস্থিতি মিলেছে।
প্রদাহজনিত এসব পরিবর্তন দেহের ভেতর এমন পরিবেশ তৈরি করে, যা বিভিন্ন ক্যান্সার কোষকে সহজেই আশপাশের বিভিন্ন টিস্যু গ্রাস করতে ও দূরবর্তী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে।
ড. হাডসন বলেছেন, বার্ধক্য কেবল কাকতালীয়ভাবেই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায় না, বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও প্রদাহজনিত পথগুলোকে এমনভাবে বদলে দেয়, যা টিউমারের বিস্তারে সরাসরি সহায়তা করে।
গবেষকেরা খতিয়ে দেখেছেন গবেষণার এসব ফলাফল মানুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য কি না। এজন্য তারা এক হাজারেরও বেশি রোগীর স্তন ক্যান্সারের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন।
ফলাফলে দেখা গেছে, যেসব রোগীর দেহে ‘রেইজ’ রিসেপ্টর তৈরি করা ‘এজিইআর’ জিনের মাত্রা বেশি ছিল তাদের ক্ষেত্রে এ রোগের পরিণতি বেশি খারাপ। একইসঙ্গে রেইজ রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত প্রদাহজনিত জিনের উচ্চ কার্যকারিতাও রোগীদের বেঁচে থাকার হার কমিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল।
গবেষণাটি স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের দেহেও একই ধরনের জৈবিক প্রক্রিয়া ঘটার ঝুঁকিকে আরও জোরালো করে তোলে।
গবেষকরা বলছেন, টিউমার বা ক্যান্সার কেবল কোষের ভেতরের পরিবর্তন বা মিউটেশনের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয় না, দেহের ভেতরের পরিবেশও এতে বড় ভূমিকা রাখে।
বয়স বাড়া, প্রদাহ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার পরিবর্তন ও মেটাবলিজমের বা বিপাক প্রক্রিয়ার মতো বিষয় ক্যান্সার কি দেহের নির্দিষ্ট জায়গায় থাকবে নাকি অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়বে তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।