Published : 05 Oct 2025, 01:18 PM
বিশ্বের অনেক বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনই আগে থেকে পরিকল্পনা করে হয়নি, এগুলো ঘটেছে হঠাৎ করেই, একেবারে আকস্মিকভাবে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত অনেক প্রযুক্তিই ভুলবশত উদ্ভাবন হয়েছে। যেমন– মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ইংকজেট প্রিন্টার বা ভেলক্রো।
তবে ইতিহাস বদলে দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনগুলোর একটি এসেছে একজন জার্মান পদার্থবিদের হাত ধরে। যিনি আসলে এমনটি উদ্ভাবনের কথা চিন্তাই করেননি। ১৮৯৫ সালে উইলহেল্ম কনরাড রন্টজেন একদম কাকতালীয়ভাবে উদ্ভাবন করেন এক্স-রে, যা যুগান্তকারী বিপ্লব এনে দিয়েছে চিকিৎসা ও বিজ্ঞানের জগতে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় রন্টজেন খ্যাতির পিছনে ছুটছিলেন না বলেই প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তিবিষয়ক সাইট স্ল্যাশ গিয়ার। তিনি কাজ করছিলেন ক্যাথোড রশ্মি নিয়ে। ক্যাথোড রশ্মি হল ইলেকট্রনের এক তরঙ্গ, যা ভ্যাকুয়াম টিউবের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ইউরোপজুড়ে অনেক পদার্থবিদই তখন এটি নিয়ে গবেষণা করছিলেন।
কিন্তু রন্টজেনের পরীক্ষার সময় এমন কিছু একটা ঘটল, যা অন্যরা খেয়াল করেননি। তিনি দেখলেন, ঘরের অন্য পাশে রাখা একটি ফ্লুরোসেন্ট বোর্ড হঠাৎ জ্বলে উঠল, এমনকি তিনি টিউবটি কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছিলেন। তখনই তিনি টের পেলেন, এখান থেকে নিশ্চয়ই কোনো অদৃশ্য রশ্মি বের হচ্ছে, যা ওই বোর্ডে গিয়ে আঘাত করছে।
এই অদৃশ্য আলোকেই পরে ‘ইনভিজিবল লাইট’ বা ‘অদৃশ্য আলো’ বলা হয়। এটি এমন এক ধরনের রশ্মি, যা কঠিন বস্তু ভেদ করে চলে যেতে পারে। রন্টজেন দেখলেন, বিভিন্ন বস্তুকে যখন ওই টিউব আর ফ্লুরোসেন্ট বোর্ডের মাঝখানে ধরা হচ্ছিল তখন বোর্ডে সেইসব জিনিসের ছায়ার মতো ছবি দেখা যাচ্ছে।
এরপর তিনি এক পরীক্ষায় তাঁর স্ত্রী আনা বের্থার হাত একটি ফটোগ্রাফিক প্লেটের সামনে ধরেলেন এবং এক্সপোজ করলেন। ফলাফল দেখে দুজনই স্তব্ধ হলেন। কারণ, প্লেটে কেবল হাতের ছায়া নয়, বরং স্পষ্ট দেখা গেল হাড়ের গঠন ও তার বিয়ের আংটির ছাপও!
হ্যাঁ, একটু ভৌতিক মনে হয়েও এটিই ছিল বৈজ্ঞানিক দুনিয়ার জন্য এক যুগান্তকারী আবিষ্কার, যার সবটাই ঘটেছিল একেবারে দুর্ঘটনাবশত।
নাম কেন এক্স-রে?
রন্টজেন জানতেন না রশ্মিটি আসলে কী, তাই নাম দিলেন “এক্স-রে”। এক্স অক্ষরটি তিনি নিয়েছেন গণিত থেকে, যেখানে কোনো অজানা মান বোঝাতে এক্স ব্যবহার করা হয়। তার সঙ্গে রশ্মির ইংরেজি নাম রে জুড়ে দেন তিনি। ফলে নামটি দাঁড়ায় এক্স-রে।
তবে, ইউরোপের অনেক দেশেই উদ্ভাবকের প্রতি সম্মান দেখিয়ে এখনও একে রন্টজেন-রে নামে ডাকা হয়। আর বাংলায় এ নামটি হচ্ছে রঞ্জন রশ্মি।

কৌতূহল থেকে চিকিৎসায় বিপ্লব
বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন উদ্ভাবন সাধারণত স্বীকৃতি পেতে সময় নেয়। কারণ, নতুন কিছু দেখলেই মানুষের মনে সন্দেহ জাগে। তবে এক্স-রের ক্ষেত্রে তা হয়নি। এর চিকিৎসাগত গুরুত্ব এতটাই স্পষ্ট ছিল যে, চিকিৎসকরা একে প্রায় রাতারাতি ব্যবহার করতে শুরু করেন।
রন্টজেন নিজেই বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি কত বড় একটি আবিষ্কার করে ফেলেছেন। কেবল কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই নিয়ে প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন তিনি। এরপর গোটা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন এই উদ্ভাবনটি যাচাই করে দেখার জন্য।
মানবদেহের ভেতরের অজানা জগৎ, যা আগে কেবল কাটা-ছেঁড়া ছাড়া সম্ভব ছিল না, এখন তা এক্স-রের মাধ্যমে একেবারে চোখের সামনে ধরা দিতে লাগল। কয়েক মাসের মধ্যেই এক্স-রে রন্টজেনের ল্যাব থেকে ছড়িয়ে পড়ল বিভিন্ন হাসপাতালে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে শুরু হল এক নতুন যুগের, যা বদলে দিল চিকিৎসা জগতের চেহারাই।
এ উদ্ভাবনের কয়েক মাসের মধ্যেই ইউরোপ ও আমেরিকার সার্জনরা এক্স-রের ব্যবহার শুরু করেন। তারা মানুষের ভাঙা হাড় চিহ্নিত করতে বা কেউ কিছু গিলে ফেললে পেটের মধ্যে তা শনাক্ত করতে এক্স-রে ব্যবহার করতেন।
একসময় যা ছিল পদার্থবিজ্ঞানের ল্যাবে কৌতূহলের বিষয়, তা দ্রুতই পরিণত হল জীবন রক্ষাকারী এক চিকিৎসা-সরঞ্জামে। ১৮৯৬ সালেই ব্রিটিশ চিকিৎসকরা যুদ্ধক্ষেত্রে এক্স-রে ব্যবহার শুরু করেছিলেন।

এক আকস্মিক প্রতিভার চিরন্তন ছাপ
এক্স-রে এমন এক প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, যা চিকিৎসার জগতকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। তবে এ উদ্ভাবন কেবল শুধু হাসপাতালকেই নয়, বরং নতুন রূপ দিয়েছে পুরো বিজ্ঞান জগৎকেও।
এক্স-রের মাধ্যমে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘রেডিওলজি’ নামের এক নতুন শাখার জন্ম হয়, যেখানে বিকিরণ ব্যবহার করে নির্ণয় করা হয় বিভিন্ন রোগ। সার্জনরা এখন কেবল অনুমান করে নয়, বরং নিশ্চিতভাবেই অপারেশন করতে পারেন।
অর্থোপেডিক্স বা হাড়ের চিকিৎসায় বড় অগ্রগতি হয়, কারণ ভাঙা হাড়গুলো এক্স-রের মাধ্যমে সঠিকভাবে সোজা করা সম্ভব হয়েছে। দন্তচিকিৎসায়ও এক্স-রে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ এতে খোঁড়াখুঁড়ির ঝামেলা ছাড়াই দাঁতের গহ্বর বা ক্ষত সহজেই দেখা যেত।
এক্স-রের প্রভাব কেবল স্বাস্থ্যসেবাতেই থেমে থাকেনি, বিজ্ঞানেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। এক্স-রে প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন বস্তুর গঠন বোঝার কাজ শুরু করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির মাধ্যমে ডিএনএ’র গঠন, বিশেষ করে ‘ডাবল হেলিক্স’-এর খোঁজে মেলে।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে ছাড়াও অনেক শিল্পক্ষেত্র এক্স-রের সুবিধা পেয়েছে। শিল্প রেডিওগ্রাফিতে এক্স-রের ব্যবহার শুরু করেন ইঞ্জিনিয়াররাও। এর সাহায্যে মোটা স্টিলের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করতে পারতেন তারা। ফলে আমাদের বিশ্ব আরও শক্তিশালী ও নিরাপদ অবকাঠামো হয়ে ওঠে।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের জন্যও এক্স-রে কাজে লেগেছিল। পুরাতত্ত্ববিদরা এখন কোনো পুরানো বস্তু নষ্ট না করেই তা পরীক্ষা করতে পারতেন। নিরাপত্তা পরীক্ষণেও এক্স-রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। আধুনিক বিমানবন্দর ও টিএসএ-এর বিভিন্ন স্ক্যানার বিকিরণ ব্যবহার করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
দুর্ঘটনাবশত এক্স-রে উদ্ভাবনের ব্যাপক প্রভাব চিকিৎসা, বিজ্ঞান ও ইঞ্জিনিয়ারিং এসব ক্ষেত্রেই বিপ্লব ঘটিয়েছে। রন্টজেনের এই উদ্ভাবন না হলে এতগুলো অগ্রগতি আসতে অনেক বেশি সময় লাগত।
১৯০১ সালে প্রথমবারের মতো পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন রন্টজেন। আজও এক্স-রে অত্যন্ত জনপ্রিয়, কার্যকরী ও অপরিহার্য বিষয়। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তির অনেকগুলোই এরই ফলাফল। যেমন– সিটি স্ক্যান ও ফ্লুরোস্কপি।