কচ্ছপ জোনাথনের ১৯৪ বছর আয়ুর রহস্য জানা গেল
এই প্রজাতির কচ্ছপ সাধারণত ১০০ বছরের বেশি বেঁচে থাকার জন্য পরিচিত, তবে জোনাথন সেই সময়সীমাকেও অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক স্থলচর প্রাণী ১৯৪ বছর বয়সি এক কচ্ছপের বিস্ময়কর দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যের পেছনের রহস্য উন্মোচনের দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা, যা মানবজীবনের দীর্ঘায়ু নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জোনাথন নামের আলদাব্রা জায়ান্ট কচ্ছপটির বয়স ১৯৪ বছর। যার ব্যতিক্রমী দীর্ঘায়ুর পেছনে রয়েছে জিনগত বৈশিষ্ট্য ও এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ কোষীয় ব্যবস্থাকে তারুণ্যদীপ্ত উপায়ে সচল রাখার এক অসাধারণ সক্ষমতা।
রয়টার্স লিখেছে, এই প্রজাতির কচ্ছপ সাধারণত ১০০ বছরের বেশি বেঁচে থাকে বলে পরিচিত তবে জোনাথন সেই সময়সীমাকেও অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে।
আলদাব্রা অ্যাটল বা গ্র্যানিটিক সেশেলস থেকে ১৮৮২ সালে পূর্ণবয়স্ক প্রাণী হিসেবে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের দূরবর্তী সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নিয়ে আসা হয়েছে কচ্ছপটিকে, যা বর্তমানে গভর্নরের বাসভবন ‘প্ল্যান্টেশন হাউস’-এর ঘেরা আঙিনায় বাস করছে।
‘কালেল’ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত গবেষক ও এ গবেষণার সহ-প্রধান লেখক বেঞ্জামিন ভেইসভিল বলেছেন, “অন্যান্য আলদাব্রা কচ্ছপও জোনাথনের মতো দীর্ঘকাল বেঁচে ছিল বলে দাবি করা হয়ে থাকে। তবে জোনাথনের বয়স সমর্থন করার মতো সবচেয়ে বেশি প্রামাণ্য দলিল রয়েছে।”
বুধবার গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ।
প্রাণীটির এই বিস্ময়কর দীর্ঘায়ুর রহস্য উন্মোচন করতে বিজ্ঞানীরা জোনাথনকে নিয়ে গবেষণা করেছেন। তারা এর জিনোম সিকোয়েন্স ও এপিজিনোম, অর্থাৎ কোন কোন জিন সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় হবে তা নিয়ন্ত্রণকারী রাসায়নিক চিহ্নগুলো বিশ্লেষণ করেছেন।
ভেইসভিল বলেছেন, “আমরা ডিএনএ মেরামত, মাইটোকন্ড্রিয়াল ফাংশন, ইনসুলিন রেগুলেশন ও টেলোমিয়ার ফাংশনের মতো দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত পাথওয়েগুলোতে জোনাথনের জিনোমের পরিবর্তন দেখতে পেয়েছি।”
মাইটোকন্ড্রিয়া কোষের পাওয়ারহাউজ হিসেবে বিবেচিত। ইনসুলিন হরমোন কোষে শক্তি জোগানোর জন্য গ্লুকোজ প্রবেশে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। টেলোমিয়ার হচ্ছে ক্রোমোজোমের (কোষের নিউক্লিয়াসের ভেতরে জিনগত তথ্য বহনকারী গঠন) প্রান্তের প্রতিরক্ষামূলক আবরণ।
গ্যাবোলরা জোনাথনের এপিজিনোমকে কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণ এই চার ধরনের অন্যান্য আলদাব্রা কচ্ছপের সঙ্গে তুলনা করেছেন। জোনাথনকে খাবার দেওয়ার ভান করার সময় তারা অপেক্ষা করছিলেন যতক্ষণ না সে শূন্যে মুখ চালাতে বা কামড়াতে শুরু করে।
এরপর তারা গ্লাভস-পরা হাত দিয়ে জোনাথনের মুখ হাঁ করিয়ে ধরেন এবং একটি বিশেষ সরঞ্জামের সাহায্যে তার জিহ্বার নিচের অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে সেন্ট হেলেনার কর্মকর্তারা রক্ত সংগ্রহের পদ্ধতি ব্যবহার করেননি।
এ গবেষণার ব্যাখ্যায় জিনোমকে একটি রান্নার বই ও এপিজিনোমকে নিজের মার্জিনের হাতের লেখার নোটের সঙ্গে তুলনা করেছেন ভেইসভিল।
জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ার গোলযোগের একটি মেট্রিক বা পরিমাপের কথা উল্লেখ করে ভেইসভিল বলেছেন, “রান্নার বইটি যেমন পুরানো হয়ে গেল নোটগুলোও স্পষ্টভাবে পড়া কঠিন হয়ে ওঠে। আমরা বিষয়টিকে মিথিলেশন এনট্রপি হিসেবে ভাবতে পারি।”
জোনাথনের ‘রান্নার বই’ এর বেশিরভাগ নোটই খুব পুরানো দেখায়। তবে নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে, জিন চালু বা বন্ধ করার ক্ষেত্রে সুইচ হিসেবে কাজ করা ডিএনএর অংশগুলোতে জোনাথনের মিথিলেশন এনট্রপি গবেষণা করা ৫ বছর বয়সি একটি কিশোর কচ্ছপ বাদে অন্য যে কোনো কচ্ছপের চেয়ে কম ছিল।
দেহের এসব অঞ্চল দীর্ঘায়ুর ওপর প্রভাব ফেলে এমন জিনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে।
জোনাথনের দীর্ঘায়ু ও জীবনের গল্প
কচ্ছপটির দীর্ঘকালের চিকিৎসক ও গবেষণাটির সহ-লেখক জো হলিন্স বলেছেন, তরুণ বয়সে জোনাথন চেয়ার উল্টে ফেলা ও ক্রিকেট বলের ওপর শুয়ে থাকার মতো বিভিন্ন দুষ্টুমি করার জন্য পরিচিত ছিল।
বয়স বাড়ার কারণে চোখে ছানি পড়ে সে এখন প্রায় অন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমান জোনাথনকে হলিন্স বর্ণনা করেছেন ‘ভদ্র ও শান্ত দানব’ হিসেবে।
বিশাল আকৃতির এসব কচ্ছপ ঠিক কত বছর বেঁচে থাকতে পারে তা নির্ধারণ করা বেশ কঠিন, কারণ নির্ভরযোগ্য নথিপত্র কম ও অনেক কচ্ছপই গবেষকদের চেয়ে বেশি দিন বেঁচে থাকে।
বিংশ শতাব্দীর আগের রেকর্ড রাখা নিয়েও নানা জটিলতা ছিল। একটি তরুণ কচ্ছপের বয়স তার খোলসের প্লেটে থাকা ‘গ্রোথ রিং’ বা বৃদ্ধির বলয় দেখে অনুমান করা গেলেও বয়স্ক কচ্ছপের বয়স নিশ্চিত করা কঠিন।
নতুন গবেষণাটিতে ব্যতিক্রমীভাবে বয়স্ক কেবল একটি কচ্ছপকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যার ফলে চিহ্নিত বৈশিষ্ট্যগুলো জোনাথনের অনন্য বৈশিষ্ট্য নাকি দীর্ঘজীবী কচ্ছপগুলোর মধ্যে সাধারণ বিষয় তা নিশ্চিত করা যায়নি।
ভেইসভিল বলেছেন, “আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না, আমরা যা পেয়েছি সেটাই এর দীর্ঘায়ুর একমাত্র কারণ।”
এর পেছনে পরিবেশগত কারণও ভূমিকা রাখতে পারে। জোনাথন একটি ক্রান্তীয় দ্বীপে বসবাস করে। পাশাপাশি, প্রাণীচিকিৎসকদের মাধ্যমে যত্নসহকারে তৈরি করা তার একটি আদর্শ খাদ্যতালিকা রয়েছে।
অবাক করা বিষয় হচ্ছে, গবেষণার ফলাফল দীর্ঘজীবী মানুষের ওপর করা গবেষণা থেকে পাওয়া বিভিন্ন ধরনের সঙ্গে ব্যাপকভাবে মিলে যায়। এ থেকে ইঙ্গিত মেলে, বার্ধক্যের কিছু প্রক্রিয়া বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে অভিন্ন হতে পারে।
ভেইসভিল বলেছেন, ১১৪ বা ১১৭ বছর বয়সি এক নারীর ওপর সম্প্রতি পরিচালিত গবেষণায় অস্বাভাবিকভাবে দক্ষ মাইটোকন্ড্রিয়াল ফাংশন দেখা গেছে, যা জোনাথনের দেহের কিছু অঞ্চলের প্রাপ্ত ফলাফলের মঙ্গে মেলে।
অদম্য ক্ষুধা
হলিন্স বলেছেন, বয়স বেশি হলেও জোনাথনের খাবারের প্রতি অদম্য আগ্রহ এখনও অটুট রয়েছে। পশুচিকিৎসক তার নাম ধরে ডাকলে সে মাথা উঁচু করে ও নিজের দীর্ঘ গলা বাড়িয়ে দেয়।
“আমি জানি সে আমাকে চেনে, আমার গলা ও তার প্রতি আমার যত্ন নেওয়ার ধরন সে বোঝে। আমি এও জানি যে, এর পেছনে প্রাণীটির কোনো ভালোবাসা নেই, বরং জোনাথন কেবল সুস্বাদু খাবারের আগমনকে চিনে নেয়।
“অবশ্যই এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। তার প্রতি আমার গভীর মায়া ও ভালোবাসা রয়েছে। সে এক অসাধারণ প্রতীক। আমি জানি ‘আইকন’ শব্দটি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এ বছরই একে ‘আইকন’ মর্যাদা দিয়েছে।”
দ্বীপের বাসিন্দাদের কাছে প্রিয় জোনাথন বিশ্বযুদ্ধ ও সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন দেখেছেন। হলিন্স বলেছেন, “সে স্থিতিস্থাপকতা, দীর্ঘায়ু, সহনশীলতা ও বড় সব ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে অবিচলভাবে বেঁচে থাকার প্রতীক।”
