Published : 11 Dec 2025, 02:22 PM
দশকের পর দশক ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ইউরেনাস আর নেপচুনকে ‘বরফ দৈত্য’ বলে চিনে এসেছেন। ধারণা ছিল দুটো গ্রহ পানি, অ্যামোনিয়া আর মিথেনের মতো বরফজাত উপাদানেই গঠিত। কিন্তু নতুন এক গবেষণা সেই পুরোনো ধারণাকে নড়িয়ে দিয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় আর এনসিসিআর প্ল্যানেটসের গবেষণা দলের দাবি, গ্রহ দুটিতে বরফের চেয়ে পাথরের পরিমাণই হয়তো বেশি। ফলে ‘বরফের দৈত্য গ্রহ’ বিবরণ হয়তো গ্রহ দুটির ভেতরের পুরো গঠনকে বোঝায় না বলে গবেষণা সাইট নোরিজ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সৌরজগতকে সাধারণত তিন ভাগে ধরা হয়। পৃথিবী আর মঙ্গল পাথুরে গ্রহ, বৃহস্পতি আর শনি গ্যাস দৈত্য, আর সূর্য থেকে অনেক দূরে অবস্থানের কারণে ইউরেনাস আর নেপচুনকে বরফ দৈত্য বলা হয়। কারণ ধরা হয়েছিল তাদের গঠনকালেই বরফজাত উপাদান ছিল সবচেয়ে বেশি।
তবে অ্যাস্ট্রনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স সাময়িকীতে প্রকাশিত নতুন গবেষণা বলছে, এই শ্রেণিবিন্যাস সম্ভবত ‘অতি সরল’। ইউরেনাস আর নেপচুন হয়তো বরফের চেয়েও পাথরসমৃদ্ধ, অথবা মাঝামাঝি কোথাও।
গবেষণা দল গ্রহ দুটির ভেতরের গঠন অনুকরণ করতে নতুন ধরনের মডেল তৈরি করেছে। কেউ আগের মতো অনুমাননির্ভর পদ্ধতিতে যায়নি, আবার পুরোপুরি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রিক সরলীকরণও করেনি। বরং তারা হাইব্রিড পদ্ধতি নিয়েছে।
এ গবেষণায় প্রথমে এলোমেলো ঘনত্ব–প্রোফাইল তৈরি করা হয়েছে। এরপর প্রতিটি প্রোফাইল গ্রহের মাধ্যাকর্ষণে কী প্রভাব ফেলতে পারে তা হিসাব করে মহাকাশযানের বাস্তব তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন গবেষকরা। অনেকবার এই প্রক্রিয়া চালিয়ে তারা পক্ষপাতহীন আর বাস্তবসম্মত মডেল তৈরি করেছেন।
ফলাফলে দেখা গেছে, ভেতরের গঠন বহু রকম হতে পারে। শুধু পানি–সমৃদ্ধ নয়, বড় অংশ পাথরও হতে পারে। প্লুটো নিয়ে করা আগের গবেষণার মতোই এতে দেখা যাচ্ছে, অনেক দূরের বরফঢাকা গোলকগুলোর গভীরে আসলে পাথরই প্রধান উপাদান হতে পারে।
ইউরেনাস আর নেপচুনের অদ্ভুত চৌম্বকক্ষেত্র বোঝার বেলাতেও এই মডেল নতুন ব্যাখ্যা দেয়। পৃথিবীর মতো দুইটি স্পষ্ট চৌম্বক মেরুর বদলে বরং বহু মেরুবিশিষ্ট জটিল কাঠামো দেখা যায়। গবেষকদের মতে গভীরে ‘আইনিক ওয়াটার’ নামে পানির এক বিশেষ রূপ এই চৌম্বকীয় ডায়নামো তৈরি করতে পারে। আর, ইউরেনাসে এই স্তর নেপচুনের তুলনায় আরও গভীরে থাকতে পারে। সম্ভবত এ কারণে দুই গ্রহের আচরণেও পার্থক্য দেখা যায়।
তবু কিছু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। বিশাল চাপ আর তাপমাত্রায় কোন উপাদান কীভাবে আচরণ করে সেটি এখনও বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি জানেন না। গবেষকরা আশা করছেন, নতুন ল্যাব তথ্য এলেই মডেল আরও নির্ভুল হবে।
সব মিলিয়ে এই গবেষণা ইউরেনাস আর নেপচুনের গভীর গঠন নিয়ে নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পরের ধাপ এখন নতুন মহাকাশ মিশন। বর্তমান তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না গ্রহগুলো বরফ না পাথর সমৃদ্ধ। ভবিষ্যতের মহাকাশযানই হয়তো নীল মেঘের নিচে লুকিয়ে থাকা এদের প্রকৃত গঠন উন্মোচন করবে।