Published : 20 Apr 2026, 01:39 PM
বড় কোম্পানিগুলো এআই এজেন্ট নিয়ে উচ্চাশা দেখালেও প্রযুক্তিগত জটিলতা ও বিপুল খরচের কারণে তা বর্তমানে যেন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন রূঢ় বাস্তবতা উঠে আসছে সিলিকন ভ্যালিতে আয়োজিত এআই সম্মেলনগুলোয় ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া এ প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যবসায়িক লাভের চেয়ে অর্থের অপচয় আর বিশৃঙ্খলাই বেশি তৈরি করছে।
আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি প্রতিবেদনে লিখেছে, সম্প্রতি অফিসের বিভিন্ন কাজ বিরামহীনভাবে করে দিতে পারে এমন এআই এজেন্ট নিয়ে কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেলেও বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে।
কারণ, এর পেছনের প্রযুক্তিটি এখনও বেশ নড়বড়ে এবং তা কোম্পানির জন্য বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
গেল সপ্তাহে সিলিকন ভ্যালিতে আয়োজিত আলাদা দুটি অনুষ্ঠানে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে, যেখানে এআই এজেন্টের বর্তমান সম্ভাবনা ও নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেছেন বিভিন্ন কোম্পানির নির্বাহী ও প্রকৌশলীরা।
এআই স্টার্টআপ ‘মেইবেল’-এর সিইও কেভিন ম্যাকগ্রা সেশনে বলেছেন, “বর্তমানে এআই নিয়ে আমরা সবচেয়ে বড় যে সমস্যার মোকাবিলা করছি তা হচ্ছে একটি ভুল ধারণা। সব ধরনের কাজই লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এলএলএম দিয়ে সম্পন্ন করতে হবে এমন চিন্তা ভুল।”
ম্যাকগ্রা রসিকতা করে বলেছেন, “আপনার সব টোকেন ও অর্থ এক ‘এআই ক্ল বট’-এর হাতে তুলে দিন, যা কেবল লাখ লাখ টোকেন নষ্টই করবে।” কারণ, কোন কাজগুলো এআই এজেন্টের জন্য সত্যিই উপযোগী তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন কোম্পানির আরও সতর্ক ও সুচিন্তিত হওয়া প্রয়োজন।
সম্প্রতি ‘ওপেনক্ল’-এর উত্থানের পর থেকে প্রযুক্তি বিশ্বে এআই এজেন্ট নিয়ে মাতামাতি বেড়েছে।
ওপেনক্ল এমন এক প্রযুক্তি, যা ব্যবহার করে ডেভেলপাররা বিভিন্ন এআই মডেলের মাধ্যমে একঝাঁক ‘ডিজিটাল অ্যাসিস্ট্যান্ট’ বা ভার্চুয়াল সহকারী তৈরি ও পরিচালনা করতে পারেন। প্রযুক্তি শিল্প এখন এসব এআই এজেন্টকেই পরবর্তী বড় বিপ্লব হিসেবে প্রচার করছে।
মার্চে মার্কিন চিপ নির্মাতা কোম্পানি এনভিডিয়া’র সিইও জেনসেন হুয়াং বলেছিলেন, “এআই এজেন্ট নিশ্চিতভাবেই পরবর্তী চ্যাটজিপিটি হতে যাচ্ছে।”
তবে বুধবার স্যান হোসেতে আয়োজিত ‘জেনারেটিভ এআই অ্যান্ড এজেন্টিক এআই সামিট’-এ গুগল ও কোম্পানিটির ডিপমাইন্ড ইউনিট, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট ও মেটার মতো কোম্পানি কারিগরি কর্মকর্তারা বলেছেন, এআই এজেন্ট তৈরি ও সেগুলো পরিচালনা করা মোটেও সহজ কাজ নয়।
গুগল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার দিপ শাহ পরিচালিত এ সেশনে এসব এআই এজেন্ট চালানোর খরচ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করার নতুন সব কৌশল নিয়ে আলোচনা ছিল।
এআই এজেন্ট পরিচালনা করতে অনেক অর্থ লাগে। এসব ডিজিটাল অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ তদারকির জন্য সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা না থাকলে খরচ কমানোর বদলে উল্টো কোম্পানির বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হতে পারে।
দিপ শাহ বলেছেন, “আপনি যখন একটি মেশিন লার্নিং সিস্টেম বা মাল্টি-এজেন্ট সিস্টেমকে বড় পরিসরে চালু করতে যাবেন তখন আপনাকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। যার মধ্যে প্রথমটিই হচ্ছে এর পরিচালনা খরচ।”
স্টার্টআপ কোম্পানি ‘সিনক্রন’-এর সিইও রবি বুলুসু এআই এজেন্টের জটিলতার বিষয়টি তুলে ধরে বলেছেন, কোম্পানিগুলো যেভাবে তথ্য গুছিয়ে রাখে, প্রযুক্তির প্ল্যাটফর্ম বেছে নেয় এবং তাদের সফটওয়্যার ও জনবল পরিচালনা করে সেই প্রতিটি ক্ষেত্রই আলাদা আলাদা।
এআই এজেন্ট পরিচালনার বিষয়টি এ প্রতিটি ক্ষেত্রের সঙ্গেই গভীরভাবে জড়িয়ে ফলে বুলুসু বলেছেন, “কোনো একটি দিক আলাদাভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। এসব বিষয়ের একটির ওপর অন্যটির নির্ভরশীলতাই কাজটিকে কঠিন ও বিশৃঙ্খল করে তোলে।”
বৃহস্পতিবারও এআই এজেন্টের এ জটিলতার বিষয়টি আলোচনায় ছিল। ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন ভিউতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাংহাইভিত্তিক কোম্পানি ‘থিংকিংএআই’ ও ‘মিনিম্যাক্স’ এসব চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেছে।
‘থিংকিংএআই’ সম্প্রতি নিজেদের ‘এআই এজেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে নতুনভাবে পরিচিত করছে। শুরুতে কোম্পানিটি ‘থিংকিংডেটা’ নামে পরিচিত ছিল এবং মোবাইল গেইমের তথ্য বিশ্লেষণের কাজ করত।
নতুনভাবে পরিচিত করার অংশ হিসেবে ‘মিনিম্যাক্স’-এর সঙ্গে পার্টনারশিপ করেছে ‘থিংকিংএআই। মিনিম্যাক্স জানুয়ারিতে হংকংয়ের শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে।
অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এআই ল্যাব মিনিম্যাক্স চীনের ও তারা ওপেন সোর্স হিসেবে অনেক শক্তিশালী এআই মডেলও বাজারে এনেছে। এ কারণে তাদেরকে চীনের অন্যতম ‘এআই টাইগার’ বলা হয়।
‘থিংকিংএআই’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস হ্যান বলেছেন, এআই এজেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রযুক্তির দিকে এ পরিবর্তনটি করা হয়েছে ভিডিও গেইম খাতের বাইরে অন্যান্য শিল্পে ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর জন্য।
কারণ, অনেক কোম্পানি এআই এজেন্ট নিয়ে খুব আগ্রহী হলেও তাদের তা চালানোর মতো প্রয়োজনীয় দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা নেই।
চীনে ‘ওপেনক্ল’ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও হ্যান মনে করেন, ব্যবসায়িক ব্যবহারের জন্য তা জটিল ও এতে নিরাপত্তার অনেক ত্রুটি থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
“ব্যক্তিগত কাজের জন্য ওপেনক্ল ভালো টুল হতে পারে। তবে তা নিশ্চিতভাবেই বড় কোম্পানির উপযোগী নয়। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আপনাকে অনেক কিছু নিয়ে ভাবতে হয়, যেমন ডেটা মেমোরি, আপনার এজেন্টদের পরিচালনা, বিভিন্ন টিমের মধ্যে সমন্বয় ও যোগাযোগ রক্ষা করা। এখানে সমাধান করার মতো অনেক বিষয় রয়েছে।”
এদিকে, চীনা বিভিন্ন এআই মডেল নিয়ে কোনো জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে থিংকিংএআই-এর ব্যবসায়িক কৌশলে প্রভাব পড়বে কি না সে বিষয়ে হ্যান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে তিনি বলেছেন, তাদের পরিষেবাটি ওপেনএআই ও গুগলের মতো বিভিন্ন কোম্পানির এআই মডেলও সাপোর্ট করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার যদি কখনও সে দেশে চীনের তৈরি ‘ওপেন-ওয়েট’ এআই মডেলগুলো নিষিদ্ধ করে তবে হ্যান রসিকতা করে বলেছেন, তিনি বিষয়টিকে ভালো লক্ষণ হিসেবেই দেখবেন।
“তেমনটা ঘটলে তবে আমি ধরে নেব, আমরা সত্যিই সফল হয়েছি।”