Published : 24 Feb 2026, 05:25 PM
সফল জরায়ু প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মা হয়েছেন এক ব্রিটিশ নারী। বলা হচ্ছে, জন্মগতভাবে জরায়ুহীন এ নারীর মাধ্যমেই যুক্তরাজ্যে যুগান্তকারী এক চিকিৎসা যাত্রার সফল সমাপ্তি ঘটল।
ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান লিখেছে, যুক্তরাজ্যে এই প্রথম মৃত দাতার জরায়ু প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ‘হিউগো’ নামের এক শিশুর জন্ম হয়েছে, যা এখন ব্রিটিশ চিকিৎসা বিজ্ঞানের নতুন ইতিহাসের অংশ।
লন্ডনের ‘কুইন শার্লট অ্যান্ড চেলসি হসপিটাল’-এ হিউগো পাওয়েলের জন্ম হয়। শিশুটির ওজন ৬ পাউন্ড ১৩ আউন্স। একজন মৃত নারীর কাছ থেকে পাওয়া জরায়ু ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে নিয়েছিলেন হিউগোর মা গ্রেস বেল।
যুক্তরাজ্যে মৃত নারীর জরায়ু ব্যবহার করে এটিই প্রথম সফল জন্মদান। এর আগে পুরো ইউরোপে কেবল দুটি এমন ঘটনা ঘটেছে।
পেশায় আইটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার গ্রেস বেল ‘মেয়ার রকিটানস্কি কুস্টার হাউসার সিন্ড্রোম’ নামের এক বিরল শারীরিক অবস্থা নিয়ে জন্মেছিলেন। এ সমস্যার কারণে জন্ম থেকেই তার জরায়ু গঠনহীন ছিল।
কৈশোরে গ্রেস বেলকে বলা হয়েছিল, তিনি কখনোই সন্তান ধারণ করতে পারবেন না। হিউগোর জন্মকে ‘অলৌকিক ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন গ্রেস।
“আমি কখনো ভাবিনি এমনটি সম্ভব হবে। আমি এখন আমার জীবনের সবচেয়ে সুখী মুহূর্ত কাটাচ্ছি।”
২০২৪ সালে জরায়ু প্রতিস্থাপনের কয়েক মাস পর প্রজনন চিকিৎসা নিতে শুরু করেন গ্রেস। এরপর গেল ডিসেম্বরে হিউগোর জন্ম হয়।
গ্রেস বলেছেন, তিনি প্রতিদিন তার জরায়ু দাতা নারী ও তার পরিবারের মহানুভবতার কথা ভাবেন।
“আমার দাতা নারী ও তার পরিবারকে ধন্যবাদ জানানোর মতো কোনো ভাষাই যথেষ্ট নয়। একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের প্রতি তাদের এই দয়া ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কারণেই মা হওয়ার আমার আজীবনের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি।”
ওই একই দাতার আরও পাঁচটি অঙ্গ অন্য চারজন ব্যক্তির শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, এর ফলে অন্যদের জীবনও বেঁচেছে।
দাতা নারীর মা-বাবা বলেছেন, “মেয়েকে হারানো আমাদের পৃথিবীকে এমনভাবে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে যা ভাষায় প্রকাশ কঠিন। অঙ্গদানের মাধ্যমে সে অন্য পরিবারকে সময়, আশা, সুস্থতা ও এখন নতুন জীবনের এক অমূল্য উপহার দিয়ে গেছে।
“মা-বাবা হিসেবে আমরা তার রেখে যাওয়া এ উত্তরাধিকার নিয়ে গর্বিত, যা সহমর্মিতা, সাহস ও ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
“চলে যাওয়ার পরও সে মানুষের জীবনকে স্পর্শ করে চলেছে।”
গ্রেস বেল ও তার সঙ্গী স্টিভ পাওয়েল তাদের সন্তান হিউগোর মাঝের নাম রেখেছেন রিচার্ড। চিকিৎসক অধ্যাপক রিচার্ড স্মিথ-এর সম্মানে এমনটি করেছেন তারা।
‘ওম্ব ট্রান্সপ্লান্ট ইউকে’ চ্যারিটির ক্লিনিক্যাল লিড ও ‘ইম্পেরিয়াল কলেজ হেলথকেয়ার এনএইচএস ট্রাস্ট’-এর একজন কনসালট্যান্ট গাইনোকোলজিক্যাল সার্জন স্মিথ।
সন্তানের জন্মের সময় উপস্থিত থাকা অধ্যাপক স্মিথ বলেছেন, “বিষয়টি এক অবিশ্বাস্য যাত্রা ছিল। আমাদের পুরো দলটি এ দিন দেখার জন্য বছরের পর বছর ধরে একসঙ্গে কাজ করেছে, যা আমার কাছে দুর্দান্ত ও অসাধারণ এক মুহূর্ত।”
দম্পতিটি সন্তান নেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ করার দিকে প্রতিস্থাপিত জরায়ুটি গ্রেসের দেহ থেকে অস্ত্রোপচার করে সরিয়ে ফেলা হবে। এর কারণ, যাতে তাকে সারাজীবন ‘ইমিউনোসপ্রেসেন্ট’ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে রাখার ওষুধ খেয়ে যেতে না হয়।
২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যের প্রথম জরায়ু প্রতিস্থাপনটি হয়েছিল গ্রেস ডেভিডসন নামের আরেকজন রোগীর ক্ষেত্রে। তার বড় জীবিত বোন এমির কাছ থেকে তিনি জরায়ু গ্রহণ করেছিলেন।
গোটাবিশ্বে এ পর্যন্ত মৃত দাতার জরায়ু ব্যবহার করে প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি শিশু জন্মগ্রহণ করেছে। জরায়ু প্রতিস্থাপনের দুই-তৃতীয়াংশই হয় জীবিত দাতার মাধ্যমে এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ হয় মৃত দাতার মাধ্যমে।
জরায়ু দান সাধারণ অঙ্গদানের সম্মতির মধ্যে পড়ে না, অঙ্গদাতা হিসেবে নাম রেজিস্ট্রি করা থাকলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না।
‘অপ্ট-আউট’ বা যেখানে ধরে নেওয়া হয় সবাই দাতা হতে রাজি সেখানেও পদ্ধতিও প্রযোজ্য নয়। সম্ভাব্য দাতার পরিবারের কাছে বিশেষভাবে জানতে চাওয়া হয়, তারা জরায়ু দান করতে আগ্রহী কি না।