Published : 22 Dec 2025, 03:52 PM
কসমেটিক সার্জনরা লেজার ব্যবহার করে ত্বকের বলিরেখা মুছে দেন, ঠিক তেমনই লেজার রশ্মি ব্যবহার করে ঐতিহাসিক এক স্মৃতিস্তম্ভ থেকে দশকের পর দশক ধরে জমে থাকা ময়লার আস্তরণ তুলে এর আসল রূপ ফিরিয়ে আনছেন রোমের প্রত্নতাত্ত্বিকরা।
এবার মার্কাস অরেলিয়াসের স্তম্ভ পরিষ্কারের কাজে বড় পরিসরে লেজার ক্লিনিং প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন ইতালির কর্মীরা। এক হাজার আটশ ৪০ বছরের পুরানো এই অনন্য স্থাপত্যটি নির্মিত হয়েছিল দানিউব নদী তীরবর্তী বর্বর গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে সম্রাট অরেলিয়াসের বিজয় উদযাপন করতে। এখন সেই স্তম্ভে জমে থাকা শত বছরের ময়লার আস্তরণ সরাতেই এ আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
হাতে ধরা এসব ছোট লেজার ডিভাইস থেকে নির্গত কম্পমান আলোক রশ্মি যখন পাথরের ওপর পড়ে তখন এর থেকে তৈরি হওয়া তাপে দূষণের ফলে জমে থাকা কালো ময়লার স্তর আলগা হয়ে উঠে আসে। এর মাধ্যমেই বেরিয়ে আসে ভেতরে লুকিয়ে থাকা ধবধবে সাদা ‘কারারা’ নামের মার্বেল।
প্রকল্পটির প্রধান স্থপতি মার্তা বাউমগার্টনার বলেছেন, “চিকিৎসকরা যেমন লেজার দিয়ে শরীরের ক্ষতি না করে অবাঞ্ছিত অংশ সরিয়ে ফেলেন আমাদের কাজটিও ঠিক তেমনই।
“এই সংস্কার কাজে লেজারের কার্যকারিতা দেখে আমরা মুগ্ধ। পুরো স্তম্ভের বাইরের দিকের কারুকার্যময় বা খোদাই করা অংশ পরিষ্কার করতে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা।”
প্রায় ১৮০ খ্রিস্টাব্দের দিকে খোদাই করা এই পেঁচানো নকশা স্তম্ভটির চারপাশ ২৩ বার ঘুরে একদম ওপর পর্যন্ত উঠে গিয়েছে। প্রায় একশ ৩০ ফুট উঁচু এই স্তম্ভে দুই হাজারেরও বেশি প্রতিকৃতি খোদাই রয়েছে, যেখানে দেবতা, সৈন্য ও পশুর ছবি ফুটে উঠেছে। এখানে বেশ কয়েকটি জায়গায় স্বয়ং সম্রাট অরেলিয়াসেরও দেখা মিলেছে।
খোদাই করা এসব কারুকাজে যুদ্ধের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে, যার জ্যান্ত বিভিন্ন দৃশ্য রোমান ইতিহাসের ওই যুগ সম্পর্কে গবেষকদের অমূল্য তথ্য দিয়েছে, যেখানে দেখা গিয়েছে, কারও গলা কেটে বা মাথা দ্বিখণ্ডিত করা হচ্ছে বা একজন নারীকে তার চুল ধরে টেনে হিঁচড়ে দাসত্বে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
শহরের ওই এলাকা থেকে প্রাচীন রোমের অন্যান্য নিদর্শন অনেক আগেই হারিয়ে গিয়েছে। তবে স্মৃতিস্তম্ভটি এখনও তার আদি স্থানেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। স্তম্ভটি প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকারি বাসভবনের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে, যার ঠিক পাশেই রয়েছে দেশটির পার্লামেন্ট।
এ সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে এ বছরের মার্চে, যা আগামী বছরের শুরুর দিকে শেষ হওয়ার কথা। এ কাজে মোট প্রায় ২৩ লাখ ডলার ব্যয় হচ্ছে, যা মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেওয়া সহজ শর্তের ঋণ ও অনুদান থেকে মিলেছে। কোভিড-১৯ মহামারীর ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ইতালিকে এই তহবিল দিয়েছিল ইইউ।
স্থপতি বাউমগার্টনার বলেছেন, “আমরা মোটা অংকের অর্থ সহায়তা পেয়েছি। এ এমন এক সুযোগ, যা কোনোভাবেই হাতছাড়া করা যায় না।”
ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে এ স্তম্ভটির প্রথম সংস্কার কাজ পরিচালনা করেছিলেন পোপ সিক্সটাস পঞ্চম। ওই সময় স্তম্ভের চূড়ায় থাকা সম্রাট অরেলিয়াসের আদি মূর্তিটি সরিয়ে সেখানে সেন্ট পলের একটি মূর্তি স্থাপন করেছিলেন তিনি, যা আজও সেখানে বহাল রয়েছে।
সবশেষ ১৯৮০-এর দশকে স্তম্ভটি পরিষ্কার করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমা আর প্রকৃতির বৈরী আবহাওয়া নিরন্তর এর ওপর প্রভাব ফেলে চলেছে স্তম্ভটির ওপর। সংস্কারকারীরা কাজ করতে গিয়ে দেখেছেন মার্বেল পাথরের কিছু অংশ মূল কাঠামো থেকে আলগা হয়ে খুলে আসতে শুরু করেছে, যা দ্রুত সারানো জরুরি হয়ে পড়েছিল।
বাউমগার্টনার বলেছেন, “আশা করছি ভবিষ্যতে আর কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যার মুখে পড়তে হবে না। এখন থেকে স্তম্ভটিতে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা ও প্রয়োজন অনুসারে ব্যবস্থা নিতে পারব আমরা।”