Published : 04 Feb 2026, 10:39 AM
ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা ও প্রাইভেসি নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বড় ধরনের আইনি চাপের মুখে পড়েছে মেটা। হোয়াটসঅ্যাপের বিতর্কিত প্রাইভেসি পলিসি নিয়ে এক শুনানিতে ভারতের আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ব্যবহারকারীদের প্রাইভেসি অধিকার নিয়ে কোনো ধরনের আপস হবে না।
মঙ্গলবার ভারতবর্ষের সুপ্রিম কোর্ট মার্কিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জায়ান্টটিকে বেশ কড়া ভাষায় বলেছে, মেটাকে ভারতীয় ব্যবহারকারীদের ‘প্রাইভেসি অধিকার নিয়ে ছেলেখেলা খেলতে’ দেবে না তারা। পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপ ঠিক কীভাবে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে অর্থ আয় করে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিচারকরা।
প্রযুক্তি সাইট টেকক্রাঞ্চ প্রতিবেদনে লিখেছে, মেটার ২০২১ সালের বিতর্কিত প্রাইভেসি পলিসির কারণে আরোপিত এক জরিমানার বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানির সময় এমন মন্তব্য করে আদালত। ভারতের মতো বাজারে কার্যত যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে হোয়াটসঅ্যাপ, সেখানে তথ্য শেয়ারের বিষয়ে ব্যবহারকারীরা আসলে কতটুকু বুঝে বা স্বেচ্ছায় সম্মতি দিতে পারেন বারবার সেই প্রশ্ন তুলেছেন বিচারকরা।
৫০ কোটিরও বেশি ব্যবহারকারী থাকায় হোয়াটসঅ্যাপের সবচেয়ে বড় বাজার ও মেটার বিজ্ঞাপন ব্যবসার প্রসারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ভারত। এ মামলায় প্ল্যাটফর্মটি থেকে তৈরি হওয়া ‘মেটাডেটা’র বাণিজ্যিক মূল্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিচারকরা।
তারা জানতে চেয়েছেন, কীভাবে এসব তথ্য মেটার বিজ্ঞাপন ও এআই প্রযুক্তিতে ব্যবহার করে অর্থ আয় সম্ভব।
শুনানি চলাকালীন প্রধান বিচারপতি সুরিয়া কান্ত বলেছেন, আপিলটি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় মেটা ও হোয়াটসঅ্যাপকে ব্যবহারকারীদের ‘একটি তথ্যও’ শেয়ার করতে দেবে না সুপ্রিম কোর্ট। হোয়াটসঅ্যাপের প্রাইভেসি নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের কাছে বাস্তবে কোনো বিকল্প পছন্দ বা সুযোগ নেই।
মেসেজিং পরিষেবাটিকে কার্যত একচেটিয়া ব্যবসা হিসেবে বর্ণনা করে বিচারপতি কান্ত প্রশ্ন তুলেছেন, কীভাবে ‘রাস্তায় ফল বিক্রি করা একজন দরিদ্র নারী’ বা একজন গৃহকর্মীর কাছ থেকে আশা করা যায় যে, তারা তাদের তথ্যের ব্যবহার সম্পর্কে বুঝতে পারবেন।
অন্যান্য বিচারকরাও মেটার কাছে জানতে চেয়েছেন, মেসেজ কনটেন্টের বাইরে ব্যবহারকারীর তথ্য কীভাবে বিশ্লেষণ করে কোম্পানিটি।
বিচারপতি জয়মালিয়া বাগচী বলেছেন, ব্যবহারকারীর আচরণের তথ্যের বাণিজ্যিক মূল্য ও লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার খতিয়ে দেখতে চায় আদালত। নামপরিচয়হীন বা আলাদা করে রাখা তথ্যেরও আর্থিক মূল্য রয়েছে।
সরকারি আইনজীবীরা আরও বলেছেন, ব্যক্তিগত তথ্য কেবল সংগ্রহই করা হচ্ছে না, বরং বাণিজ্যিকভাবে সেটির শোষণও হচ্ছে।
মেটার আইনজীবীরা বলেছেন, প্ল্যাটফর্মটির বিভিন্ন মেসেজ ‘এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড’, ফলে খোদ কোম্পানিও সেগুলো দেখতে পায় না। এ বিতর্কিত প্রাইভেসি নীতি ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা দুর্বল করেনি বা চ্যাটিংয়ের কনটেন্ট বিজ্ঞাপনের কাজে ব্যবহারের সুযোগ দেয়নি।
এ মামলার সূত্রপাত ২০২১ সালে হোয়াটসঅ্যাপের এক প্রাইভেসি পলিসি আপডেট থেকে, যেখানে ভারতীয় ব্যবহারকারীদের জন্য মেটার সঙ্গে আরও বড় পরিসরে তথ্য শেয়ার করার শর্ত মেনে নেওয়া বা পরিষেবাটি ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল।
ভারতের প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রক সংস্থা পরবর্তীতে ২১৩ কোটি রুপি জরিমানা আরোপ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, এ নীতিটি মেসেজিং বাজারে হোয়াটসঅ্যাপের আধিপত্যের অপব্যবহার করেছে।
সেই রায়টি আপিলেও বহাল থাকায় মেটা ও হোয়াটসঅ্যাপ তা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। মেটার আইনজীবীরা আদালতকে বলেছেন, জরিমানার অর্থ এরইমধ্যে পরিশোধ করেছে তারা।
মেটা ও হোয়াটসঅ্যাপ যাতে তাদের তথ্য ব্যবহারের বিভিন্ন প্রক্রিয়া আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ পায় সেজন্য মামলাটি ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত করেছে সুপ্রিম কোর্ট।
প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরামর্শে এই মামলায় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কেও একটি পক্ষ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি হয়েছে আদালত, যা এই আইনি প্রক্রিয়ার পরিধি আরও বাড়িয়েছে।
এ বিষয়ে টেকক্রাঞ্চের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি মেটা।