সুপারমার্কেটের ফ্রিজও হ্যাকড হলে অন্য প্রযুক্তির কী অবস্থা?
ইন্টারনেটে যুক্ত স্মার্ট যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে রেফ্রিজারেটর, ঘরের কেন্দ্রীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, এমনকি কাপড় ধোয়ার ওয়াশিং মেশিনও।
ইউরোপের বিভিন্ন সুপারমার্কেটের রেফ্রিজারেটর ও ডিপ ফ্রিজে সন্দেহজনক সাইবার হামলার ঘটনা ইন্টারনেটে যুক্ত যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। শুধু সুপারমার্কেটের শীত-তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই নয়, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে ঘরের দৈনন্দিন ব্যবহার্য প্রযুক্তিও এমন হামলার ঝুঁকিতে থাকতে পারে।
ইন্টারনেটে যুক্ত স্মার্ট যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে রেফ্রিজারেটর, ঘরের কেন্দ্রীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, এমনকি কাপড় ধোয়ার ওয়াশিং মেশিনও। এসব যন্ত্র দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হলেও ইন্টারনেটে সংযুক্ত থাকার কারণে সেগুলোতে সাইবার হামলার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
তবে কোনো যন্ত্র ইন্টারনেটে যুক্ত থাকলেই হ্যাকাররা সহজে সেটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে, বিষয়টি এমন নয়। বড় প্রযুক্তি ব্র্যান্ডগুলো সাধারণত তাদের পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা ব্যবস্থা নেয়।
এরপরও অতীতে কিছু যন্ত্রে নিরাপত্তা দুর্বলতা খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। ২০১৫ সালে গবেষকরা দেখিয়েছিলেন, স্যামসাংয়ের একটি স্মার্ট রেফ্রিজারেটরের নিরাপত্তা ত্রুটি কাজে লাগিয়ে ইন্টারনেটে আদান-প্রদান করা তথ্য হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব।
তবে, নভেম্বরে সুপারমার্কেটগুলোতে চালানো সাইবার হামলার সঙ্গে বাসাবাড়ির ব্যবহৃত রেফ্রিজারেটর বা অন্য গৃহস্থালি যন্ত্রকে লক্ষ্যবস্তু করার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের সাবেক প্রধান নির্বাহী সিয়ারান মার্টিন মনে করেন, ইন্টারনেটে যুক্ত যন্ত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্মাতাদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
তিনি বলেন, “শুরু থেকেই যেন আমরা আরও নিরাপদ যন্ত্র ও পণ্য পাই, সেজন্য বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছে আমাদের আরও বেশি দাবি জানানো প্রয়োজন।”
ভোক্তাদের যন্ত্রের সফটওয়্যার নিয়মিত আপডেট রাখা এবং যেখানে সম্ভব মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
মার্টিন বলেন, “আমি জানি, বিষয়টি বিরক্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু এতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে।”
যুক্তরাজ্যে ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে নির্দিষ্ট কিছু স্মার্ট ভোক্তা পণ্য নির্মাতার জন্য ন্যূনতম সাইবার নিরাপত্তার মান মেনে চলা বাধ্যতামূলক হয়েছে। এসব নিয়মের মধ্যে পাসওয়ার্ড ও নিরাপত্তা আপডেটসংক্রান্ত শর্তও রয়েছে।
তবে, এসব ব্যবস্থায় সহজেই হ্যাক করা সম্ভব, এমন নয়। যদিও দুর্বল পাসওয়ার্ড কিংবা সফটওয়্যারের নিরাপত্তা ত্রুটি কাজে লাগিয়ে হামলাকারীরা সেগুলোতে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে।
সুপারমার্কেটগুলোতে আগের সাইবার হামলার পর সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করার বিষয়ে বড় খাদ্য বিক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছে যুক্তরাজ্য সরকার।
ব্রিটিশ রিটেইল কনসোর্টিয়ামের প্রধান নির্বাহী হেলেন ডিকিনসন বলেছেন, সাইবার হামলা খুচরা বিক্রেতাদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। এ ধরনের হামলা মোকাবেলায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করছে এবং নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার কাজ করছে।
খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় সাইবার হামলার প্রভাব পড়ার ঘটনা অবশ্য এবারই প্রথম নয়।
২০২৫ সালের মে মাসে যুক্তরাজ্যের সুপারমার্কেট এমঅ্যান্ডএস এবং কো-অপ র্যানসমওয়্যার হামলার শিকার হয়েছিল। এর ফলে দোকানগুলোতে কিছু পণ্যের নতুন সরবরাহ পৌঁছাতে সমস্যা হয়েছে, তাজা খাবারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিভিন্ন সুপারমার্কেটের তাক খালি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন ক্রেতারা।
সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি সেনটিনেলওয়ানের গবেষক টম হেগেল মনে করেন, যন্ত্রপাতির নিরাপত্তার দায়িত্ব কার, তা খুচরা বিক্রেতাদের স্পষ্ট করতে হবে।
তিনি বলেন, “খুচরা বিক্রেতাদের যে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, তা হলো এসব যন্ত্রপাতির নিরাপত্তার দায়িত্ব কার? সেগুলো মেরামতের দায়িত্ব কার, শুধু সেটি জানলেই হবে না।”
তার মতে, ইন্টারনেট সংযোগ দৈনন্দিন প্রযুক্তির ব্যবহার সহজ করে। তবে সেই সুবিধার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।
হেগেল বলেন, “একবার কোনো হামলাকারী এসব নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ পেয়ে গেলে, বরফ গলানোর মতো স্বাভাবিক কাজও বিঘ্ন ঘটানোর হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “একটি সেটিং পরিবর্তন করেই পণ্যের মজুত নষ্ট করে দেওয়া সম্ভব। এতে শুধু কম্পিউটার ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয় না, বাস্তব পণ্যেরও ক্ষতি হয়।”
গাড়ি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানির সরবরাহ ব্যবস্থাও কি ঝুঁকিতে?
ঘরের বাইরেও শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি ও যানবাহন দূর থেকে পরিচালনার জন্য ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করা হয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ কেন মুনরো এ প্রসঙ্গে ২০১৫ সালের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। ওই সময় গবেষকরা গাড়ির ইন্টারনেট সংযুক্ত বিনোদন ব্যবস্থার মাধ্যমে দূর থেকে একটি জিপ গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। ঘটনাটি গাড়ির নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে আসে।
মুনরো বলেন, “সৌভাগ্যবশত, গাড়ি নির্মাতারা বিষয়টি বুঝতে পেরেছিল এবং সমস্যার সমাধান করেছিল।”
বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানির সরবরাহ ব্যবস্থার যন্ত্রপাতি পর্যবেক্ষণেও মোবাইল সংযোগ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। এর ফলে প্রকৌশলীরা দূর থেকেই এসব ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
মুনরোর মতে, যুক্তরাজ্যের বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহকারী সংস্থাগুলো সাধারণত এসব সংযোগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তার মান এক রকম নয়।
তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, ছোট এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন না পাওয়া সেবাদাতা সংস্থাগুলো নিয়ে। এসব সংস্থা এখনও পুরোনো ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি জেডস্কেলারের বিশেষজ্ঞ অলিভিয়ের ডালোয়ের মতে, যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকলে ইন্টারনেটে যুক্ত যে কোনো কারখানা বা যন্ত্রপাতি একই ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। গাড়ি নির্মাণশিল্প থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ ও পরিবহন অবকাঠামোও এর বাইরে নয়।
