সাইবার হামলার জেরে জাপানে ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন গ্রাহকরা
প্রযুক্তি ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করতে এআই ব্যবহার করে তৈরি সাইবার হামলার সিমুলেশনের জন্য বিশেষ দল গঠনের ঘোষণাও দিয়েছে দেশটির সরকার।
সাইবার হামলার মুখে ইন্টারনেট সেবা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়া ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পদক্ষেপ নিচ্ছে জাপানের বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি।
জাপানের অনলাইন আর্থিক সেবা দাতা কোম্পানি ‘জিএমও ইন্টারনেট গ্রুপ’ বলেছে, তাদের ‘ফরেন এক্সচেঞ্জ’ বা বৈদেশিক মুদ্রা ট্রেডিং সেবায় অননুমোদিত প্রবেশের কারণে গ্রাহকদের যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করা হবে।
পাশাপাশি শুভেচ্ছা স্মারক হিসেবে সব গ্রাহককে ৫ হাজার ইয়েন বা ৩২ ডলার করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন কোম্পানিটির সিইও মাসাতোশি কুমাগাই। রোববার প্রকাশ পাওয়া এক ব্লগে তিনি এই তথ্য জানান।
ইন্টারনেট অবকাঠামো ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্রেডিং পরিচালনা করা বড় এই প্রযুক্তি জায়ান্টের সিইও মাসাতোশি কুমাগাই বলেছেন, “ইন্টারনেট ব্যবস্থা নিজেই এখন ভেঙে পড়তে শুরু করেছে।”
রয়টার্স লিখেছে, পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষায় মারাত্মক দুটি ত্রুটি গোটাবিশ্বের লাখ লাখ ওয়েবসাইটে সাইবার হামলার ঝুঁকি তৈরি করেছে। পিএইচপি’র ওপরই ইন্টারনেট জগতের বড় অংশ গড়ে উঠেছে।
শুক্রবার প্রযুক্তি ব্যবস্থার এসব দুর্বলতা চিহ্নিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে তৈরি সাইবার হামলার সিমুলেশনের জন্য বিশেষ দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে জাপান সরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বর্তমানে সফটওয়্যারের দুর্বলতা খুঁজে বের করা থেকে শুরু করে ভুয়া ফিশিং ক্যাম্পেইন তৈরির মতো বিভিন্ন কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়েছে।
এর মাধ্যমে সাইবার অপরাধ যেমন দ্রুত ও কম খরচে করা যাচ্ছে তেমন এগুলো শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সার্বিকভাবে জাপানি বিভিন্ন কোম্পানি মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে।
কুমাগাই বলেছেন, “ইন্টারনেট এখন দিন দিন এমন হাতিয়ারে রূপ নিচ্ছে, যা দুর্বৃত্তরা মানুষকে হুমকি দিতে ও লুটপাট চালাতে ব্যবহার করছে।”
এ ঘটনার পর টোকিও শেয়ারবাজারে সূচক ০ দশমিক ২ শতাংশ বাড়লেও জিএমও’র শেয়ারে ধস নেমেছে।
শুক্রবার বাজার বন্ধ হওয়া পর্যন্ত ২৬০ কোটি ডলারের কোম্পানিটির শেয়ারদর প্রায় ১৬ শতাংশ কমে গত চার মাসের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে।
পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষার নিরাপত্তাত্রুটির কথা সামনে আসার পর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ হ্যাকিংয়ের চেষ্টা চালানো হয়।
গেল সপ্তাহে জাপান ও ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বহু সরকারি ও বেসরকারি ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
সাইবার প্রতিরক্ষা জোরদারের দাবি
সাইবার হামলার মুখে সম্প্রতি সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর জাপান সরকারকে সাইবার নিরাপত্তা বিধিনিষেধ আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন কুমাগাই।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে হুমকির উৎস নিষ্ক্রিয় করতে প্রতিপক্ষের সার্ভারে পাল্টা হামলা চালানোর মতো কড়া পদক্ষেপ।
কুমাগাই লিখেছেন, “জাপানকে রক্ষা করতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের এখনই একসঙ্গে কাজ করার উপযোগী সময়।”
জিএমও বলেছে, তারা সাইবার হামলার পেছনে থাকা মূল চক্র বলে ধারণাকৃত এক পক্ষের কাছ থেকে মুক্তিপণ দাবি পেয়েছে। দাবি না মানলে কোম্পানি ও গ্রাহকদের গোপন তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
তারা কোনো অন্যায্য দাবিতে সায় দেবে না ও পুলিশসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সাহায্য নিয়ে এই ঘটনার মোকাবিলা করবে। তবে কোম্পানিটির পক্ষ থেকে পিএইচপি ত্রুটির সঙ্গে এই হামলার সরাসরি সংযোগের কোনো উল্লেখ করা হয়নি।
আগামী ছয় মাসের জন্য বিনামূল্যে বিকল্প সেবা দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে জিএমও বলেছে, ক্ষতিপূরণ ও শুভেচ্ছা স্মারক প্রদানের ফলে তাদের আর্থিক উপার্জনে কী পরিমাণ প্রভাব পড়বে তা আপাতত হিসেব করা সম্ভব হচ্ছে না।
কুমাগাই বলেছেন, তাদের কোম্পানিতে কর্মরত ‘হোয়াইট-হ্যাট’ হ্যাকাররা আগেই কিছু নিরাপত্তা ত্রুটি চিহ্নিত করেছিলেন। তবে সে অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়ার গতি যথেষ্ট ছিল না।
গ্রাহকদের তথ্য সুরক্ষায় দুর্বলতা
সাম্প্রতিক বড় আকারের সাইবার হামলা জাপানি বিভিন্ন কোম্পানির গ্রাহক তথ্য ভাণ্ডার সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। এসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে কোম্পানিগুলোর খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
‘ইওয়াইকসমো সিকিউরিটিজ’-এর অ্যানালিস্ট শোইচি আরিসাওয়া বলেছেন, “কোম্পানিগুলোতে এরইমধ্যে সাধারণ মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে তারা যদি তা আরও জোরদার করতে চায়, তবে অতিরিক্ত খরচের বোঝা বেশ বড় হতে পারে।”
নিরাপত্তা পর্যালোচনা কোম্পানি ‘ট্রেন্ডএআই’-এর তথ্য বলছে, ২০ অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে মোট ৭২৩টি সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘন সংশ্লিষ্ট ঘটনা ঘটেছে, যা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বার্ষিক মোট সংখ্যারও বেশি।
অন্যদিকে, টাইমস কার-শেয়ারিং সেবাদাতা কোম্পানি ‘পার্ক২৪’ গত মাসে তাদের গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ঘটনায় ক্ষতিপূরণ হিসেবে গ্রাহকপ্রতি ৩ হাজার ইয়েন করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
কোম্পানিটি বলেছে, রেজিস্ট্রেশন যাচাইকরণ শেষ হওয়ার পর তারা আর গ্রাহকদের পরিচয়পত্রের ছবি নিজেদের কাছে সংরক্ষণ করবে না।
এ সাইবার হামলার সমাধান ও গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ মেটাতে তাদের প্রায় ৫৫০ কোটি ইয়েন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।
