১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

আসক্তির দায় আদালতে প্রমাণিত, বড় চাপে প্রযুক্তি জায়ান্টরা

সামাজিক মাধ্যম আসক্তি নিয়ে রায় ঘিরে সিলিকন ভ্যালিতে একইসঙ্গে চলছে একযোগে উদ্বেগ আর অস্বীকার।

আসক্তির দায় আদালতে প্রমাণিত, বড় চাপে প্রযুক্তি জায়ান্টরা
অনেকেই আশঙ্কা করছেন এই রায় ভবিষ্যতের এক বড় আইনি ঝড়ের কেবল শুরু। ছবি: জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে তৈরি

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 28 Mar 2026, 03:53 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:15 PM

যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে এক জুরি বোর্ডের রায়ে সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মের নকশা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। রায়ে বলা হয়েছে, প্ল্যাটফর্মগুলোকে আসক্তিমূলকভাবেই নকশা করা হয়েছিল, যা এক তরুণীর মানসিক স্বাস্থ্যে ক্ষতি করেছে।

এ নিয়ে বিবিসিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই রায় সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি করেছে। কেউ বিষয়টিকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করছেন, আবার কেউ আশঙ্কা করছেন এটি কেবল ভবিষ্যতের এক বড় আইনি ঝড়ের শুরু।

মামলার কেন্দ্রে থাকা তরুণীকে ‘কেইলি’ ছদ্মনামে প্রকাশ করা হয়েছে। নয় দিনের আলোচনার পর জুরি সদস্যরা তার তোলা সবগুলো অভিযোগের পক্ষেই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আদালত মেটা ও ইউটিউবকে দায়ী করে ৩০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ এবং আরও ৩০ লাখ ডলার জরিমানা ধার্য করেন।

মেটা ও ইউটিউবের মালিক গুগল বলেছে, তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে। 

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মেটার ভেতরে এই রায়কে হতাশাজনক হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ মামলার আগে কোম্পানিটি নিজেদের অবস্থান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিল।

মেটার যুক্তি ছিল, কেইলির পারিবারিক ও শিক্ষাজনিত সমস্যাগুলো তার সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের আগেই শুরু হয়েছিল। তবে কেইলির দাবি, প্ল্যাটফর্মগুলো তার সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয় এবং তার মধ্যে শারীরীক গঠন ও চেহারা নিয়ে ভুল ধারণা, হতাশা ও আত্মহত্যার চিন্তা তৈরি করেছে।

মামলার আইনজীবী জেইন কনরয় বলেন, “গুগল ও মেটার বিরুদ্ধে দায় প্রমাণে এটি একেবারে পূর্ণ জয়।” 

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে হাজারো মামলা আসতে পারে, আর তা নিয়ে এরইমধ্যে কোম্পানিগুলো হিসাব কষতে বসেছে।

“এই রায়ের প্রভাব থাকবে।”

টিকটক ও স্ন্যাপচ্যাটের মূল কোম্পানি স্ন্যাপও এই মামলায় আসামি ছিল, তবে বিচার শুরুর আগেই তারা সমঝোতায় যেতে পেরেছে। তবুও সামনে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তাদের অংশ নিতে হবে।

এই মামলাগুলোতে নতুন এক আইনি তত্ত্ব পরীক্ষা হচ্ছে, যেখানে বলা হচ্ছে লাভের জন্য সেবার ডিজাইন আসক্তিমূলক করে সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিগুলো ব্যক্তিগত ক্ষতি ডেকে এনেছে।

মেটা বলেছে, তারা প্রতিটি মামলায় নিজেদের জোরালোভাবে রক্ষা করবে। কোম্পানির ভাষ্য, কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যকে একটি মাত্র কারণে সীমাবদ্ধ করা বাস্তব সমস্যাকে আড়াল করতে পারে। একই সঙ্গে তারা দাবি করেছে, অনেক তরুণ ডিজিটাল কমিউনিটির মাধ্যমে সংযোগ ও নিজের জায়গা খুঁজে পায়।

আর গুগল বলেছে, ইউটিউবকে আদালতে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাদের মতে, এটি একটি দায়িত্বশীল স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক মাধ্যম নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক মডেলই এমনভাবে তৈরি, যাতে ব্যবহারকারীরা বেশি সময় প্ল্যাটফর্মে থাকেন। সাবেক টুইটার নির্বাহী ব্রুস ডেইসলি বলেন, “এই ব্যবসাগুলো মূলত মানুষকে আরও বেশি সময় ধরে রাখার জন্য তৈরি।”

আইন বা মামলা যদি এই প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে তা কোম্পানিগুলোর জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো লবিয়িং ও জনসংযোগে বিপুল অর্থ খরচ করে, যাতে নীতিনির্ধারকেরা তাদের প্রতি নমনীয় থাকেন।

এদিকে, মেটা সম্প্রতি আরও একটি মামলায় ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার জরিমানার মুখে পড়েছে, যেখানে অভিযোগ ছিল প্ল্যাটফর্মে শিশু নিপীড়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। যদিও বাদী আইনজীবী বলছেন, এটি রাজ্যের চাওয়া ২০০ কোটি ডলারের তুলনায় অনেক কম।

বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, এই রায়গুলো ভবিষ্যতে টিকে থাকবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে একের পর এক মামলা ও প্রমাণ সামনে আসায় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।