Published : 03 Feb 2026, 01:04 PM
এক সপ্তাহ ধরে বড় ধরনের ধস দেখা গিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ডিজিটাল মুদ্রা বিটকয়েনের দামে, যা বিনিয়োগকারীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বিটকয়েনকে খাদের কিনারে ঠেলে দেওয়ার পেছনে রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
সোমবার বিটকয়েনের দরপতন আরও বেড়েছে। বিশ্বের এই বড় ক্রিপ্টোকারেন্সির দাম ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর এই প্রথম ৮০ হাজার ডলারের নিচে নামল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
‘কয়েনমেট্রিক্স’-এর তথ্য অনুসারে, সোমবার নিউ ইয়র্ক সময় ভোর ৫ টা ৪৩ মিনিটে বিটকয়েন ৭৭ হাজার ৪৯৪ দশমিক ৬৫ ডলারে লেনদেন হচ্ছিল। একপর্যায়ে এর দাম কমে ৭৪ হাজার ৮৭৬ ডলারে আসে। পরে সেই ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে মুদ্রাটি।
‘কয়েনমার্কেটক্যাপ’-এর তথ্য অনুসারে, গত সাত দিনে বিটকয়েনের দাম প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। ফলে বিটকয়েন বাজার ২০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি মূল্য হারিয়েছে। গত সপ্তাহ শেষেই ৮০ হাজার ডলারের নিচে নেমে আসে বিটকয়েনের দাম।
ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ‘নেক্সো’-এর গবেষণা বিশ্লেষক ডেসিভ্লাভা ইয়ানেভা বলেছেন, বিটকয়েনের এই দরপতন মূলত ‘বিশ্ববাজারের বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতার’ সঙ্গে মিলে যায়। ক্রিপ্টো জগতের নির্দিষ্ট কোনো সমস্যা বা বড় কোনো সংকটের কারণে এমনটি ঘটেনি, বরং সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাজারে লেনদেন বা তারল্য কম থাকায় এই পতনের মাত্রা বেড়েছে।
বিটকয়েন সাধারণত শেয়ারবাজারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে, অর্থাৎ শেয়ারবাজারের দাম কমলে বা বাড়লে বিটকয়েনের ওপরও তার প্রভাব পড়ে।
শুক্রবার মাইক্রোসফটের মতো বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির আয় আশানুরূপ না হওয়ায় হতাশ হয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে মাইক্রোসফটের শেয়ারের দাম ১০ শতাংশ কমে যায় ও মার্কিন শেয়ারবাজারে বড় ধস নামে।
এ নেতিবাচক প্রভাব সোমবার ইউরোপ ও এশিয়ার শেয়ারবাজারেও ছড়িয়ে পড়ে। সোমবার সোনা ও রুপার দামও কমেছে। শুক্রবার রুপার দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছিল, যা ১৯৮০ সালের মার্চের পর এর সবচেয়ে বড় পতন।
বিটকয়েনের দরপতনকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে ‘ফোর্সড লিকুইডেশন’। এ প্রক্রিয়ায় কোনো ট্রেডারের ধরা দামের নিচে বিটকয়েন চলে গেলে লোকসান ঠেকাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার পজিশন বা কেনা বিটকয়েন বিক্রি হয়ে যায়।
‘কয়েনগ্লাস’-এর তথ্য অনুসারে, বৃহস্পতিবার থেকে এ পর্যন্ত বিটকয়েনের কেনা-বেচা মিলিয়ে ২০০ কোটি ডলারের বেশি লিকুইডেশন হয়েছে।
ক্রিপ্টো বাজারে লিকুইডেশনের এক ‘ক্যাসকেডিং ইফেক্ট’ বা ধারাবাহিক প্রভাব রয়েছে। যখন অনেক ট্রেডারের পজিশন একসঙ্গে বন্ধ হয় তখন এর দাম খুব দ্রুত নিচের দিকে নামতে থাকে।
এ ছাড়া বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে কেভিন ওয়ার্শ-এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও বিচার-বিশ্লেষণ করছেন। জেরোম পাওয়েলের উত্তরসূরি হিসেবে ফেডারেল রিজার্ভ বা মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী চেয়ারম্যান হতে যাচ্ছেন তিনি।
‘কয়েনশেয়ার্স’-এর তথ্য বলছে, গত সপ্তাহে ডিজিটাল সম্পদ বিনিয়োগ পণ্যগুলো থেকে টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো ১৭০ কোটি ডলার তুলে নেওয়া হয়েছে। এ বছরে এখন পর্যন্ত মোট উত্তোলনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটি ডলারে।
সোমবার ‘কয়েনশেয়ার্স’-এর গবেষণা প্রধান জেমস বাটারফিল বলেছেন, এই খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার ‘তীব্র অবনতির লক্ষণ’ এটি।
জাপানি ক্রিপ্টোভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘বিটব্যাংক’-এর বিশ্লেষক ইউয়া হাসেগাওয়া বলেছেন, বিটকয়েনের এই গণহারে বিক্রির পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে। যেমন ক্রমাগত ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি, মাইক্রোসফটের কারণে প্রযুক্তি শেয়ারের দরপতন ও মূল্যবান ধাতুর (সোনা-রুপা) বাজার ধস, যা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি রক্ষার শেষ আশ্রয়স্থল ছিল।
বাজার অস্থিরতার সময় বিটকয়েনকে নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে প্রচার করা হলেও গত এক বছরে এর দাম প্রায় ২২ শতাংশ কমেছে।
সোমবার বিটকয়েনের পাশাপাশি গত কয়েক দিনের প্রভাবে ইথার ও এক্সআরপি-এর মতো অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সির দামও কমেছে।
‘কয়েনগ্লাস’-এর তথ্য অনুসারে, শনিবার পুরো ক্রিপ্টো বাজার জুড়ে ২৫৬ কোটি ডলারের লিকুইডেশন হয়েছে, যা একদিনের হিসেবে ইতিহাসের দশম বড় ঘটনা।
বিটকয়েনের দাম কি আরও কমতে পারে?
গত মাসেই ক্রিপ্টো বাজারের বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, এ বছর বিটকয়েনের দামে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তাদের পূর্বাভাস অনুসারে, এই দাম ৭৫ হাজার ডলার থেকে ২ লাখ ডলারের মধ্যে যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে।
বিটব্যাংক-এর বিশ্লেষক হাসেগাওয়ার অনুমান, বিটকয়েন সম্ভবত নিজের ‘স্বল্পমেয়াদী সর্বনিম্ন অবস্থানে’ পৌঁছাতে যাচ্ছে, যা হতে পারে ৭০ হাজার ডলারের আশপাশে।
তার মতে, এমনটি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক নির্দেশক। দাম যদি এর চেয়েও অনেক নিচে নেমে যায় এবং সেখানে দীর্ঘক্ষণ ধরে থাকে তবে বুঝতে হবে বাজারের অবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন।
তবে কেউ কেউ বলছেন, বিটকয়েনের দাম আরও অনেক নিচে নামতে পারে। ‘জ্যাকস’-এর প্রধান ইক্যুইটি স্ট্র্যাটেজিস্ট জন ব্ল্যাঙ্ক বলেছেন, বিটকয়েনের দাম এ বছর ৪০ হাজার ডলারে নেমে যেতে পারে।
“এমনটি খুব দ্রুতও হতে পারে, সম্ভবত আগামী ৬ থেকে ৮ মাসের মধ্যে আমরা এই দাম দেখতে পাব।”
আগের বিভিন্ন সময়ের উত্থান-পতনের তথ্য বিশ্লেষণ করে ৪০ হাজার ডলারের সংখ্যাটিতে পৌঁছেছেন ব্ল্যাঙ্ক। অতীতে ‘ক্রিপ্টো উইন্টার’ বা মন্দার সময় বিটকয়েন তার সর্বোচ্চ দাম থেকে ৭০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছিল।
গেল অক্টোবরে বিটকয়েন তার ইতিহাসের সর্বোচ্চ দাম ১ লাখ ২৬ হাজার ডলারে পৌঁছে যায়। সেই হিসেবে ৪০ হাজার ডলারে নেমে আসার মানে হবে বিটকয়েনের প্রায় ৬৮ শতাংশ দরপতন।