Published : 07 Apr 2026, 12:15 PM
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতি ও বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতার মধ্যেও টিকে রয়েছে চীনের এক ইলেকট্রনিক্স কারখানা। এ যেন প্রতিকূলতা জয় করে টিকে থাকার এক রোমাঞ্চকর লড়াইয়েরই গল্প।
রয়টার্স লিখেছে, ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের লক্ষ্য ছিল চীনের উৎপাদন খাতকে ক্ষতির মুখে ফেলা। তবে এক ইলেকট্রনিক্স নির্মাতা কোম্পানির জন্য ২০২৫ সালের ঘটনাবহুল ও অস্থির সময়টি এক বিশেষ উপলব্ধির মাধ্যমে শেষ হয়েছে। তাদের বিশ্বাস, চীন এমন এক জায়গা যার বিকল্প তৈরি করা কঠিন, যদি না পরিস্থিতি খুব বেশি বদলে যায়।
‘এজিলিয়ান টেকনোলজি’ নামের চীনা কোম্পানিটি পশ্চিমা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জন্য পণ্য তৈরি করে। কোম্পানিটির আয়ের অর্ধেকের বেশি আসে মার্কিন অর্ডার থেকে। শুল্কের কারণে কয়েক মাস তাদের অর্ডার বন্ধ ছিল এবং গ্রাহকরা চীন থেকে উৎপাদন সরিয়ে অন্য দেশে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছিল।
শুল্ক আরোপের ফলে অনেক চীনা কোম্পানির অবস্থাই ছিল এইরকম চরম বিশৃঙ্খলার মুখে।
দেশটির সরকারি ‘পারচেজিং ম্যানেজার ইনডেক্স’ বা পিএমআই গেল বছর বড় একটা সময় জুড়ে নিম্নমুখী ছিল, বিশেষ করে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের পর তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে ২০২৫ সালের এপ্রিলে।
তবে বেইজিংও পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। তারা এমন কিছু খনিজ ও ধাতুর ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, যা মার্কিন বিভিন্ন কোম্পানির জন্য জরুরি এবং অন্য কোথাও পাওয়া কঠিন। এ পদক্ষেপের ফলে শুল্কের চাপ কিছুটা কমে আসে। ফলে মার্চে চীনের সরকারি পিএমআই এক বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে।

এ পরিস্থিতির পরিবর্তনের ফলে বার্ষিক তিন কোটি ডলারের ব্যবসা করা কোম্পানি ‘এজিলিয়ান’ আবারও ঘুরে দাঁড়ায়। দেশের বাইরে কারখানা বসানোর চেষ্টা চালিয়ে গেলেও কোম্পানিটি শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছে, ব্যবসার প্রবৃদ্ধির জন্য চীনে তাদের শক্তিশালী অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
শুল্ক আরোপের এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর চীনের উৎপাদন খাতের এই ঘুরে দাঁড়ানো ট্রাম্পকে অবাক করতে পারে। কারণ, তিনি মার্কিন অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত এবং আমেরিকার সক্ষমতা জাহির করতে শুল্ককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন।
‘ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’-এর এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ নিক মারো বলেছেন, “তথ্য-উপাত্ত নিশ্চিত করছে, ট্রাম্পের শুল্ক আসলে চীনের উৎপাদন খাতের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারেনি, বরং এ শুল্কের ফলে বাণিজ্য সম্পর্ক ও সাপ্লাই চেইনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।”
চীনের সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বেড়ে ২১ হাজার ৩৬০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ১৬ হাজার ৯২১ কোটি ডলার।
২০২৫ সালে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ২০ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা নেদারল্যান্ডসের মোট জিডিপির সমান।
তবে ‘এজিলিয়ান’ কোম্পানিটির সিইও ফ্যাবিয়েন গাউসোর্গুস বলেছেন, পরিস্থিতি সবার জন্য সমান নয়। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি ২০ শতাংশ কমেছে, যা মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীল উৎপাদকদের বেশ ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ডংগুয়ানে নিজের কারখানায় বসে গাউসোর্গুসের ভাবনায় মে মাসে ট্রাম্পের চীন সফর। সে সময় কি বড় ধরনের কোনো সমঝোতা হবে?
‘ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’-এর নিক মারো বলেছেন, “আমরা বড়জোর আশা করতে পারি, উভয় পক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করবে। হয়ত এমন কোনো কাঠামো তৈরি হবে, যাতে গত বছরের মতো বাণিজ্যিক উত্তেজনা আর চরম পর্যায়ে না পৌঁছায়।”
অর্থনীতিবিদ ও শিল্প খাতের নির্বাহীরা ধারণা করছেন, ট্রাম্পের এ সফরের মাধ্যমে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যকার উত্তেজনাহীন পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হবে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হে ইয়াদং বলেছেন, গত বৈঠক ও পরবর্তী আলোচনার পর্যায়গুলোতে দুই দেশ যে বিষয়গুলোয় একমত হয়েছে তা বাস্তবায়ন করা উচিত।
পরামর্শক কোম্পানি ‘রোল্যান্ড বার্জার’-এর মহাব্যবস্থাপক ডেনিস ডিপক্স চীনের অবস্থান সম্পর্কে বলেছেন, “চীন দেখিয়ে দিয়েছে, রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজ উপাদান তাদের জন্য শক্তিশালী এক হাতিয়ার, যা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অনেকটা ‘পারমাণবিক অস্ত্রের’ মতো কাজ করছে।”
সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি
বর্তমানে ‘এজিলিয়ান’-এর কর্তারা ট্রাম্পের শুল্ক নীতিকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য উত্তেজনা ঠেকানোর এক নির্দেশিকা হিসেবে দেখছেন।
২০২৪ সালে যখন নির্বাচনী জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বাড়ছিল তখন এজিলিয়ানের গ্রাহকরা শুল্কের হাত থেকে বাঁচতে আগেভাগেই তাদের পণ্য উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন গুদামে পাঠিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান।
কোম্পানিটির ভাইস-প্রেসিডেন্ট রেনড অ্যাঞ্জোরান বলেছেন, অন্যান্য মার্কিন আমদানিকারকদের মধ্যেও একই চিন্তা কাজ করায় গুদাম ভাড়া বা স্টোরেজ খরচ সাঁইসাঁই করে বেড়ে গিয়েছিল।
ট্রাম্প পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পরপরই ‘আতঙ্কিত’ গ্রাহকদের কাছ থেকে মাঝরাতের পর ঘনঘন ফোন আসা শুরু হয়। মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে পরিবার নিয়ে থাকা এক গ্রাহক তো এজিলিয়ানকে সেখানে এক উৎপাদন কেন্দ্র খোলার জন্য জোরাজুরিই শুরু করেছিলেন।
এজিলিয়ান ভারতে একটি শাখা খুললেও বেশিরভাগ গ্রাহক সেখানে কাজ শুরু করতে আপত্তি জানান। তাদের ভয়, ভারতে উৎপাদন গতি ধীর ও কাস্টমস সংক্রান্ত জটিলতায় দেরি হবে।
গাউসোর্গুস বলেছেন, “ভারতে কাজ করতে সময় লাগে। কেবল এক আনুষ্ঠানিক কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হতেই আমাদের এক বছর সময় লেগেছে।”
ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণ
ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পর চীনের ওপর দুই দফায় মোট ২০ শতাংশ শুল্ক বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি গ্রাহকদের চিন্তায় ফেলেছিল। তবুও তারা টিকে ছিল। তবে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল চীনা রপ্তানির ওপর শুল্ক আরও ৩৪ শতাংশ বেড়ে যায়।
এজিলিয়ানের গ্রাহকদের জন্য বিষয়টি ছিল ‘মহা বিপর্যয়’ এবং অনেকেই তাদের অর্ডার বাতিল করে দেন। এর পরপরই ডংগুয়ানের ১২ হাজার বর্গমিটারের কারখানার ভেতরে বিক্রি না হওয়া পণ্যের স্তূপ জমে।
চীনও এর পাল্টা জবাব দেয়। উত্তেজনা এতটাই বাড়ে যে, মাস শেষ হওয়ার আগেই উভয় পক্ষের শুল্ক ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
অ্যাঞ্জোরান বলেছেন, “ওই সময় সবকিছু স্থবির হয়ে পড়েছিল।”
এমন পরিস্থিতিতে কোম্পানিটি মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল এবং সেখানে পার্টনারশিপের জন্য একটি কারখানা খুঁজে পেল। পেনাংকে বেছে নেওয়ার কারণ হচ্ছে তা দক্ষিণ চীন সাগর থেকে বেশ কিছুটা দূরে। আর, দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে।
পাশাপাশি এজিলিয়ান ভারতের ধারওয়াড়ে কারখানা ভাড়ার জায়গা খুঁজছিল। তারা উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেওয়ার কথাও ভেবেছে। তবে সেখানে সাপ্লাই চেইন বা কাঁচামাল সরবরাহের ব্যবস্থাটি অপূর্ণ। ফলে তাদের একদিকে শুল্কওয়ালা চীনা যন্ত্রাংশের ওপরই নির্ভর করতে হবে, অন্যদিকে শ্রমিকের মজুরিও বেশি হবে।
‘প্ল্যান বি’ কি ব্যর্থ?
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে এজিলিয়ানের ভারতীয় দল প্রায় চার হাজার বর্গমিটার আয়তনের একটি শিল্প ভবন খুঁজে পায়। সেখানে কোন কোন পণ্য তৈরি করা সম্ভব, তা নিয়ে তারা আলোচনা শুরু করে। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে গ্রাহকদের কাছেও তখন ভারত একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে উঠে আসছিল।
এরপর মে মাসে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। এর ফলে চীনের ওপর আরোপিত অধিকাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্র। তবে অগাস্টে, ভারতের ধারওয়াড় কারখানাটি তখনও প্রস্তুত না থাকতেই, ট্রাম্প দেশটিকে রুশ তেল কেনা থেকে বিরত রাখতে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন।
তবুও অ্যাঞ্জোরান পিছু হটেননি। তার ভাষায়, “আমরা একটি বহুমুখী উৎপাদনকারী কোম্পানি হতে চাই। আমাদের দৃষ্টি দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যতের দিকে।”
বছরের মাঝামাঝি সময়ে পেনাংয়ে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হয়। সেখানে কাজ করতে গিয়ে দলটি বুঝতে পারে, চীনের তুলনায় অন্যান্য স্থানে ‘প্রতিটি কাজেই অনেক বেশি সময় লাগে’।
শুল্ক হ্রাস
পুরো গ্রীষ্মকাল জুড়ে চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু কাঁচামালের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল, যা প্রায় একচেটিয়াভাবে চীনেই প্রক্রিয়াজাত হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অটোমোবাইল, প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য শিল্প খাত প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়ে।
অক্টোবরে ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার এক বৈঠকের পর শুল্ক ১০ শতাংশ কমানো হয়। ততদিনে এজিলিয়ানের গ্রাহকরা শুল্ক বা উৎপাদন অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
এজিলিয়ান বলেছে, ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধ ছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। এ সময় প্রথমার্ধের তুলনায় তাদের উৎপাদন সময় ২৯ শতাংশ বেড়ে যায়। শুল্ক বেশি থাকলেও তা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসে। গ্রাহকরা তাদের স্থগিত অর্ডারগুলো পুনরায় চালু ও নতুন অর্ডার দিতে শুরু করেন।
অ্যাঞ্জোরান বলেছেন, শুল্ক যদি আবারও ১০০ শতাংশ পর্যায়ে ফিরে যায় তবে মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীল গ্রাহকরা পুনরায় উৎপাদন ও শিপমেন্ট বন্ধ করে দেবেন।
গাউসোর্গুস বলেছেন, এজিলিয়ান একটি ‘বীমা পলিসি’ বা বিকল্প হিসেবে ভারত ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন কারখানায় উন্নয়ন অব্যাহত রাখবে। তবে চীনা যন্ত্রাংশের কম খরচ ও উন্নত মান ডংগুয়ানে তাদের প্রধান কেন্দ্রটিকে অপরিহার্য করে তুলেছে।
তার আশা, আগামী তিন বছরে কোম্পানির আয় ৩০ শতাংশ বাড়বে। তবে ভয় হচ্ছে, ট্রাম্প আবারও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন।
“আমি জানুয়ারিতে ভেবেছিলাম এ বছরটি ভালো যাবে। ঠিক তখনই ইরান যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।”