Published : 19 Aug 2026, 02:18 PM
মহাবিশ্বের শত শত কোটি তারা ও সূর্যকে ধারণ করে রাখা বড় আকারের সর্পিল ছায়াপথ মিল্কি ওয়ে বর্তমানের এই সুবিশাল আকৃতি একদিনে পায়নি। এর রূপান্তরের ইতিহাস বেশ জটিল।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় মিল্কি ওয়ের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ের এক নতুন রহস্য উন্মোচিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
ছায়াপথটির কেন্দ্রের কাছে পুঞ্জীভূত হয়ে থাকা তারাপুচ্ছ পর্যবেক্ষণ করে গবেষকরা প্রমাণ পেয়েছেন, প্রায় ১১ কোটি ৮০ লাখ বছর আগে মিল্কি ওয়ে তার চেয়ে ছোট আরেকটি ছায়াপথকে গিলে ফেলেছিল।
ঘটনাটি ঘটেছিল যখন বর্তমান মহাবিশ্বের বয়স ছিল এর আজকের বয়সের ১৫ শতাংশেরও কম। এটাই মিল্কি ওয়ের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত জানা সবচেয়ে পুরানো ছায়াপথ একীভূত হওয়া বা ‘গ্যালাকটিক মার্জার’-এর ঘটনা।
এ গবেষণা থেকে প্রমাণ মিলেছে, মহাজাগতিক যাত্রায় মিল্কি ওয়ে কেবল নিজের ভেতরে নতুন তারা তৈরি করেই বড় হয়নি, বরং নিজস্ব মহাকর্ষীয় টানে পাশের ছোট ছোট ছায়াপথকে নিজের সঙ্গে বিলীন করেও আয়তন বাড়িয়েছে।
যে ছোট ছায়াপথটিকে মিল্কি ওয়ে গ্রাস করেছিল তা এক ‘ডোয়ার্ফ গ্যালাক্সি’ বা বামন ছায়াপথ। গবেষকদের হিসাব অনুসারে, বিলীন হওয়ার সময় এ বামন ছায়াপথটিতে থাকা বিভিন্ন তারার সম্মিলিত ভর ছিল সূর্যের ভরের প্রায় ৫০ কোটি গুণ, যা ছিল ওই সময়ের মূল মিল্কি ওয়ের আকৃতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
মহাকাশে ভাসমান হাবল ও গাইয়া টেলিস্কোপ ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা মিল্কি ওয়ের কেন্দ্র থেকে ভেতরের ২০ হাজার আলোকবর্ষ এলাকার মধ্যে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন তারাপুচ্ছের (প্রতিটি তারাপুচ্ছ শত শত হাজার তারা ধারণ করে) বয়স, রাসায়নিক গঠন ও গতিপথ বিশ্লেষণ করেছেন।
এক আলোকবর্ষ বলতে আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তা বোঝায়, যা প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার কোটি কিলোমিটার।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মহাবিশ্ব তৈরিকারী ‘বিগ ব্যাং’ বা মহা বিস্ফোরণের প্রায় ২০০ কোটি বছর পর এ দুটি ছায়াপথ একীভূত হয় এবং সে বামন ছায়াপথের বিভিন্ন তারা মিল্কি ওয়ের অংশ হয়ে যায়।
গবেষণায় এ বিলীন হওয়া বামন ছায়াপথটির নাম ‘লো-এনার্জি-ক্রাকেন-হেরাক্লিস’ বা সংক্ষেপে ‘এলকেএইচ’। অতীতে এই ধরনের আদিম একীভূতকরণের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করা তিনটি ভিন্ন গবেষণার নামানুসারে এ নাম দিয়েছেন গবেষকরা।
গবেষণাপত্রটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’তে।
এ গবেষণার প্রধান লেখক ও ইতালির ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স’-এর জ্যোতির্বিজ্ঞানী ডেভিড মাসারি বলেছেন, “আমাদের গবেষণার প্রধান সাফল্য, শৈশবকালে মিল্কি ওয়ের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া প্রথম ছায়াপথ একীভূতকরণের স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ খুঁজে পাওয়া।”
মিল্কি ওয়ের শৈশবকালীন বৃদ্ধি কি কেবল নিজস্ব নতুন তারা তৈরির মাধ্যমে হয়েছিল, না কি কোনো ছায়াপথকে গিলে ফেলার মাধ্যমে– বিজ্ঞানীদের মধ্যে এমন বিতর্ক দীর্ঘদিনের।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী মাসারি বলেছেন, নতুন গবেষণাটি নিশ্চিত করেছে, একীভূত হওয়ার ঘটনাটি শৈশবেই মিল্কি ওয়েকে অনেক সংখ্যক তারা, নতুন তারা তৈরির উপযোগী আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস ও রহস্যময় ‘ডার্ক ম্যাটার’ জোগাড় করে দিয়েছিল।
“তারাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এ একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়াটি বেশ শান্তই ছিল, অর্থাৎ সরাসরি তারায়-তারায় কোনো সংঘর্ষ ঘটেনি। তবে গ্যাসের দিক থেকে এমনটা ছিল যথেষ্ট ‘বিস্ফোরক’। বিলীন হওয়া ‘এলকেএইচ’ ছায়াপথের গ্যাস ও মিল্কি ওয়ের নিজস্ব গ্যাসের প্রচণ্ড সংঘর্ষের ফলেই পরবর্তীতে বহু নতুন তারার জন্ম হয়েছিল।”
তিনি বলেছেন, বামন ছায়াপথটিতে তৈরি এমন অসংখ্য তারা আজও মিল্কি ওয়ের ভেতরের অঞ্চলে, বিশেষ করে তারাপুচ্ছের ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে। তবে ওই অঞ্চলে অতিরিক্ত মহাজাগতিক ধূলিকণা থাকার কারণে এককভাবে সেসব তারাকে শনাক্ত করা বেশ কঠিন।
মহাজাগতিক ইতিহাসে মিল্কি ওয়ে আরও দুটি বড় ছায়াপথকে নিজের মধ্যে বিলীন করে নিয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন।
এলকেএইচ ছায়াপথ গিলে ফেলার প্রায় ১৮০ কোটি বছর পর ‘গাইয়া-সসেজ-এনসেলাডুস’ নামের আরেকটি বামন ছায়াপথকে গিলেছে মিল্কি ওয়ে। প্রায় ৬০০ কোটি বছর ধরে ‘স্যাজিটেরিয়াস’ নামের আরেক বামন ছায়াপথকে নিজের সঙ্গে একীভূত করে চলেছে আমাদের ছায়াপথ।
বিজ্ঞানী মাসারি বলেছেন, “এ ধরনের প্রতিটি একীভূতকরণের ঘটনা আমাদের সৌরজগৎ ও চূড়ান্তভাবে পৃথিবী তৈরির নেপথ্যে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। মিল্কি ওয়ের অতীতের এই একেকটি খণ্ডচিত্র একত্র করা আমাদের সেই চিরন্তন প্রশ্নেরই উত্তর দেয়, ‘আমরা কোথা থেকে এসেছি?’”