Published : 06 Mar 2026, 10:53 AM
পারস্য উপসাগরে এখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ইরানি শাহেদ ড্রোনের গর্জন। দামে কম ও কার্যকর এ ড্রোনটি ‘গরিবের ক্রুজ মিসাইল’ নামে পরিচিত, যা এখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিশোধমূলক কৌশলের প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি প্রতিবেদনে লিখেছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলার পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্র দেশগুলো এখন সেই অশুভ গুঞ্জন শুনতে পাচ্ছে, যা ইউক্রেইনের সৈন্যদের কাছে দীর্ঘদিনের এক আতঙ্কের নাম ‘শাহেদ ১৩৬ কামিকাজে’ ড্রোনের শব্দ।
ইরানে তৈরি ‘শাহেদ’ ড্রোন আধুনিক যুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য এক অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউক্রেইনে নিজেদের দীর্ঘস্থায়ী আক্রমণে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে তেহরানের কৌশলগত অংশীদার রাশিয়া। এসব ড্রোনের মধ্যে দূরপাল্লার ‘শাহেদ-১৩৬’ সবচেয়ে উন্নত ড্রোন, যা এখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার সংখ্যায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রথম দেখায় অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের তুলনায় শাহেদ ড্রোনকে খুব সাধারণ মনে হয়। ফলে এটিকে ‘গরিবের ক্রুজ মিসাইল’ বলে বর্ণনা করেছেন একজন বিশ্লেষক।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্যাট্রিয়ট’ মিসাইলের মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাহায্যে বিভিন্ন মিত্র দেশ অধিকাংশ ড্রোন ভূপাতিত করতে পারলেও অনেক শাহেদ ড্রোনই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পেরেছে।
মঙ্গলবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শনাক্ত হওয়া ৯৪১টি ড্রোনের মধ্যে ৬৫টি তাদের ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছে। ফলে বন্দর, বিমানবন্দর, হোটেল ও ডেটা সেন্টার ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ড্রোনের কার্যকারিতার মূল চাবিকাঠি এর সংখ্যা। এগুলো তৈরি করা তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও খুব দ্রুত অনেক উৎপাদন করা সম্ভব, বিশেষ করে এগুলো ঠেকাতে যে অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয় তার তুলনায়।
এ সুবিধার কারণে বিভিন্ন ড্রোন ঝাঁকে ঝাঁকে পাঠিয়ে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দিশেহারা করে দেওয়া সহজ। এ ছাড়া প্রতিটি ড্রোন ধ্বংস করতে গিয়ে প্রতিপক্ষকে তাদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে অনেক খরচ করতে হয়।
ওয়াশিংটনের ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রকল্পের বিশ্লেষক পাত্রিশিয়া বাজিলচিক বলেছেন, “শাহেদ-১৩৬ ড্রোন রাশিয়া ও ইরানের মতো দেশগুলোকে খুব কম খরচে শত্রুর ওপর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এগুলো শত্রুকে সাশ্রয়ী ড্রোনের পেছনে দামী মিসাইল নষ্ট করতে, নিজেদের শক্তির জানান দিতে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে স্থায়ী এক মানসিক আতঙ্ক তৈরিতে বাধ্য করেছে।”
ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা
মার্কিন সরকারি প্রতিবেদন অনুসারে, শাহেদ-১৩৬ ‘ওয়ান ওয়ে’ বা একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন, যা ‘ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি’র সঙ্গে যুক্ত ইরানি প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিগুলো তৈরি করেছে।
‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসিস’-এর ইরান প্রোগ্রামের সিনিয়র ডিরেক্টর বেহনাম বেন তালেবলু বলেছেন, ব্যালিস্টিক মিসাইলের তুলনায় এসব ড্রোন নিচ দিয়ে ও ধীরগতিতে ওড়ে, সামান্য যুদ্ধাস্ত্র বহন করে এবং এগুলো স্থির লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য তৈরি।
প্রকাশ্যে আসা তথ্য অনুসারে, প্রতিটি শাহেদ ড্রোনের দাম ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলারের মধ্যে। এর বিপরীতে, একটি ব্যালিস্টিক বা ক্রুজ মিসাইলের দাম ৪০ লাখ থেকে কোটি ডলার।
সেই অর্থে, শাহেদ ও এর সমজাতীয় বিভিন্ন ড্রোন ‘গরিবের ক্রুজ মিসাইল’ হিসেবেই কাজ করে, যা খুব কম খরচে শত্রুকে আঘাত ও নাজেহাল করার সুযোগ করে দেয়। ইরানের জন্য এ খরচের সুবিধাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও উন্নত অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের বাজেট নথি অনুসারে, পারস্য উপসাগরীয় দেশ ও ইসরায়েলের ব্যবহৃত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধকারী মিসাইলের দাম ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
খরচের এ বড় ব্যবধান ইরানের শত্রুদের জন্য গুরুতর সমস্যা তৈরি করেছে। ফলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় মিসাইলের সংখ্যা সীমিত থাকে এবং প্রতিটি ড্রোন ঠেকাতে অনেক সম্পদ খরচ হয়ে যায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে তেহরান এসব ড্রোন ব্যবহার করে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্লান্ত ও দুর্বল করে দিতে পারে, যাতে পরবর্তীতে আরও বড় ও ধ্বংসাত্মক হামলা চালানো সহজ হয়।
‘সিএসআইএস’-এর বিশ্লেষক বাজিলচিক বলেছেন, “মূল কৌশলটি হচ্ছে যুদ্ধের শুরুর দিকে এসব ড্রোন ব্যবহার করে ফেলা এবং দীর্ঘমেয়াদী লড়াইয়ের জন্য ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো জমিয়ে রাখা।”
তিনি বলেছেন, ইরানের এ গণ-ড্রোন হামলা অব্যাহত রাখার সক্ষমতা নির্ভর করবে তাদের মজুত, সরবরাহ ব্যবস্থা রক্ষার সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের যন্ত্রাংশের জোগান বা উৎপাদন কেন্দ্রগুলো কতটা সফলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে তার ওপর।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘকাল ধরেই ইরানের শাহেদ-১৩৬ উৎপাদন ব্যাহত করার চেষ্টা করে আসছে। সম্প্রতি তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেশ কিছু সন্দেহজনক যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে রাশিয়ার ড্রোন উৎপাদনের চিত্র থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধের সময় এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এ ধরনের ড্রোন বড় পরিসরে তৈরি করা সম্ভব।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, বুধবার পর্যন্ত ইরান এই যুদ্ধে ২ হাজারেও বেশি ড্রোন উৎক্ষেপণ করেছে। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের কাছে ড্রোনের বড় মজুত রয়েছে এবং তারা প্রতি সপ্তাহে আরও কয়েকশ ড্রোন তৈরি করতে পারে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষক জোজে পেলায়ো বলেছেন, “উপসাগরীয় দেশগুলো যদি তাদের ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধকারী মিসাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক না হয় তবে সেগুলো দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।”
তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এ সংকট এখনই চরম আকার না নিলেও তা জরুরি, বিশেষ করে হেজবুল্লাহ ও হুথিদের মতো ইরানের মিত্ররা যদি বিভিন্ন দিক থেকে একযোগে আক্রমণ শুরু করে তবে এই মিসাইল মজুত কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যেতে পারে।

আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের নতুন অনুষঙ্গ শাহেদ?
শাহেদ-১৩৬ ড্রোনটি প্রথম ২০২১ সালের দিকে উন্মোচিত হয়। তবে ২০২২ সালে ইউক্রেইন আক্রমণে রাশিয়া যখন ইরানের সরবরাহ করা এসব অস্ত্র মোতায়েন শুরু করে তখন তা বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে আসে।
এরইমধ্যে হাজার হাজার ড্রোন হাতে পেয়েছে ক্রেমলিন এবং ইরানের নকশার ওপর ভিত্তি করে নিজস্ব উৎপাদন শুরু করেছে রাশিয়া, যা এ ড্রোনের সহজলভ্যতা ও ব্যাপকভাবে তৈরির সক্ষমতারই প্রতিফলন।
কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, ইরান এসব ড্রোনের ক্ষেত্রে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের ব্যাপক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে। ফলে ড্রোনে জ্যামিংরোধী অ্যান্টেনা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রতিরোধী নেভিগেশন এবং নতুন ধরনের শক্তিশালী যুদ্ধাস্ত্র যোগের মতো পরিবর্তন এনেছে ইরান।
এ যুদ্ধাস্ত্র সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ কেজি বিস্ফোরক বহন করে, বিশেষ করে ঝাঁকে ঝাঁকে আক্রমণের সময় এগুলো বেশ শক্তিশালী আঘাত হানতে পারে। এর উন্নত বিভিন্ন সংস্করণ ১ হাজার ২০০ মাইল পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে পারে।
‘সেন্টার ফর ন্যাভাল অ্যানালাইসিস’-এর মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ মাইকেল কনেল বলেছেন, শাহেদ-১৩৬ এতটাই কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এ প্রযুক্তির ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা নিজস্ব সংস্করণ তৈরির পাশাপাশি ইরানের লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের সংস্করণে তৈরি ড্রোন মোতায়েন করেছে।
গেল সপ্তাহ শেষে ইরানের ওপর হামলার সময় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড নিশ্চিত করেছে, তারা প্রথমবারের মতো যুদ্ধে শাহেদের আদলে তৈরি কম খরচের ‘ওয়ান ওয়ে’ বা একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন ব্যবহার করেছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন এখন নিয়মিত অনুষঙ্গ হয়ে ওঠায় তা ঠেকাতে বিভিন্ন পদ্ধতিও ক্রমাগত বিবর্তিত হচ্ছে।
এদিকে, কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, ভূপৃষ্ঠের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেও শাহেদসহ অন্যান্য ইরানি ড্রোন হামলা ঠেকিয়েছে তারা।
এ ছাড়া শাহেদ ড্রোনের জিপিএস লক্ষ্য করে ইলেকট্রনিক যুদ্ধকৌশল, স্বল্পপাল্লার মিসাইল ও ইসরায়েলের ‘আয়রন বিম’-এর মতো লেজার রশ্মি ব্যবস্থা ব্যবহার করা প্রথাগত মিসাইল প্রতিরক্ষার চেয়ে অনেক বেশি সাশ্রয়ী।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোতে বর্তমানে দ্রুত ও বড় পরিসরে ড্রোন ধ্বংসের সক্ষমতার অভাব রয়েছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের পেলায়ো বলেছেন, এ ধরনের ব্যবস্থা তৈরি ও মোতায়েন করতে সম্ভবত আরও কয়েক বছর সময় লাগবে।
“বাহরাইন, কুয়েত ও আরব আমিরাতের মতো যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে ড্রোন হামলা ঠেকাতে বাড়তি সুবিধা পায়। তবে একযোগে বড় ধরনের ও দীর্ঘস্থায়ী হামলা ঠেকাতে তা এখনও যথেষ্ট নয়।”