Published : 28 Jun 2026, 05:09 PM
ক্ষতিগ্রস্ত হলে লিথিয়াম ব্যাটারিতে আগুন ধরে যাওয়ার চিরচেনা ঝুঁকি দূর করতে সিরামিক প্রযুক্তির নতুন এক ব্যাটারি তৈরি করেছেন চীনের গবেষকরা।
চীনা বিজ্ঞানীরা সিরামিকভিত্তিক এমন এক লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি তৈরি করেছেন, যা উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। তাদের দাবি, নতুন এ উদ্ভাবন ব্যাটারির নিরাপত্তাকে ‘অভাবনীয় মাত্রায় উচ্চ’ স্তরে নিয়ে যাবে।
বর্তমানে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি বা ইভি ছাড়াও দৈনন্দিন জীবনের স্মার্টফোন, হাতঘড়ি ও মেডিকেল ইমপ্ল্যান্ট বা দেহে প্রতিস্থাপনযোগ্য চিকিৎসা যন্ত্রের মতো বিভিন্ন গ্যাজেটে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যবহৃত হয় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
এসব ব্যাটারিকে নির্দিষ্ট আকারের চেয়ে ছোট করা বেশ কঠিন। এগুলোর ভেতরে থাকা তরল ইলেকট্রোলাইট লিক বা চুইয়ে পড়ার ঝুঁকি এবং কোনো কারণে ব্যাটারিটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাতে আগুন ধরে যাওয়ার মতো মারাত্মক নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কাও থাকে।
ফলে এমন ধরনের ব্যাটারির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে, যা আকারে হবে ছোট, ধারণ করবে উচ্চ ঘনত্বের শক্তি এবং যে কোনো প্রতিকূল পরিবেশেও নিরাপদে ব্যবহার করা যাবে।
‘সিংহুয়া ইউনিভার্সিটি’র বিজ্ঞানীরা বলেছেন, তাদের তৈরি সিরামিক লিথিয়াম-আয়ন মাইক্রো-ব্যাটারিটি সর্বোচ্চ ১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা পর্যন্ত স্থিতিশীলভাবে কাজ করতে পারে ও শতভাগ নিরাপদ।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘ম্যাটার’-এ।
গবেষণা অনুসারে, নতুন ব্যাটারিটি ৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদী তাপীয় ধাক্কা বা থার্মাল শক সহ্য করতে পারে, যার ফলে এর কার্যসক্ষমতার কোনো ক্ষতি হয় না।
সাধারণ বিভিন্ন লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির তুলনায় এর সহনশীলতা কয়েক গুণ বেশি। কারণ প্রচলিত ব্যাটারিগুলো সাধারণত মাইনাস ২০ ডিগ্রি থেকে সর্বোচ্চ ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে নিরাপদে কাজ করতে পারে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, “ব্যাটারিটি বিস্তৃত তাপমাত্রার মধ্যে কোনো ধরনের বাড়তি চাপ ছাড়াই স্থিতিশীল কার্যসক্ষমতা দেখায়, যা অতি-ক্ষুদ্র বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের জন্য নিরাপদ ও যান্ত্রিকভাবে শক্তিশালী পাওয়ার সলিউশন বা শক্তির উৎস দেবে।”
প্রচলিত ব্যাটারিগুলোতে বৈদ্যুতিক প্রবাহ তৈরিতে বিভিন্ন লিথিয়াম আয়ন তরল ইলেকট্রোলাইটের মধ্য দিয়ে চলাচল করে। তবে উচ্চ তাপমাত্রা বা কোনো ধরনের শারীরিক আঘাতের সংস্পর্শে এলে এ তরল ইলেকট্রোলাইট লিক হতে বা এতে আগুন ধরে যেতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, এ দুর্বলতার কারণে বর্তমান বিভিন্ন ব্যাটারি ‘নিরাপত্তা ও তাপীয় সহনশীলতার দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে’।
“এ সীমাবদ্ধতা ফায়ার অ্যালার্ম ও মনিটরিং সিস্টেম, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টারনেট অফ থিংস সেন্সর, মহাকাশ গবেষণা সরঞ্জাম এবং সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিভিন্ন জায়গাতে এ ধরনের ব্যাটারির ব্যবহারকে সীমিত করে দেয়।”
এর তুলনায় সলিড-স্টেট লিথিয়াম কোষগুলোতে তরল ইলেকট্রোলাইটের পরিবর্তে কঠিন চার্জ-পরিবাহী মাধ্যম ব্যবহৃত হয়েছে, যা উচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
এ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এর ‘পুরুত্ব ও শক্তির মধ্যকার ভারসাম্য রক্ষা করা’। কারণ ব্যাটারিটিকে যত বেশি পাতলা বা ক্ষুদ্র করার চেষ্টা করা হয় এর যান্ত্রিক দৃঢ়তা বা স্থায়িত্ব ততটাই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
চ্যালেঞ্জটি কাটিয়ে ওঠার জন্য বহুস্তরওয়ালা, সম্পূর্ণ সিরামিক-ভিত্তিক মাইক্রো লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি তৈরি করেছেন চীনা বিজ্ঞানীরা। এতে ব্যাটারির কর্মসক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এর বিভিন্ন স্তরের মধ্যকার পারস্পরিক সংযোগকে উন্নত করা হয়েছে।
উল্লিখিত গবেষণার ফলে এমন এক ধরনের ব্যাটারি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, যা একটির ওপর আরেকটি স্তরীভূত করা যায় এবং বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে এর স্তরগুলোকে প্রয়োজনমতো সমন্বয় করে নেওয়া সম্ভব।
নতুন এ ডিভাইসটি সম্পর্কে গবেষকরা বলেছেন, “ব্যাটারিটি সম্পূর্ণ অগ্নিনিরোধক ও দীর্ঘ সময় ধরে বাইরের আগুনের সংস্পর্শে থাকার পরেও এর কাঠামোগত অখণ্ডতা থাকে।
“পাশাপাশি, উন্মুক্ত বাতাসেও এর স্থায়িত্ব চমৎকার। ফলে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দিক থেকে নতুন ব্যাটারিটি তরল, পলিমার বা কম্পোজিট ইলেকট্রোলাইটওয়ালা বিভিন্ন ব্যাটারির তুলনায় অনেক এগিয়ে।
“দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় প্রযুক্তিটি পরিধানযোগ্য সেন্সর, আইওটি ডিভাইস ও মহাকাশ গবেষণার ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জামগুলোতে, বিশেষ করে উচ্চ তাপমাত্রার পরিবেশে শক্তির নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে কাজ করবে।”