Published : 28 Jun 2026, 03:32 PM
ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে প্রায় দুই হাজার বছর আগে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া প্রাচীন রোমান শহর হারকুলেনিয়ামের আস্ত এক পাণ্ডুলিপি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ পড়তে পেরেছেন গবেষকেরা।
রয়টার্স লিখেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক ইমেজিং প্রযুক্তির সাহায্যে এ বিস্ময়কর সাফল্যের পর প্রাচীন নিদর্শন অক্ষত রেখেই ভেতরের গোপন ইতিহাস ও দর্শন উন্মোচনের এক নতুন যুগ শুরু হল।
এ সাফল্য ৭৯ খ্রিষ্টাব্দের সেই ভয়াবহ দুর্যোগে পম্পেইয়ের সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাওয়া রোমান শহর হারকুলেনিয়ামে পাওয়া শত শত প্রাচীন পাণ্ডুলিপি উদ্ধারের পথকে আরও প্রশস্ত করল।
এসব পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া বিভিন্ন লেখা উদ্ধারে নতুন প্রযুক্তির প্রচার করছে ‘ভিসুভিয়াস চ্যালেঞ্জ’ নামের এক সংগঠন।
এ গবেষণার গতি বাড়াতে সংগঠনটি বলেছে, তারা এ প্যাপিরাস কাগজের সব ধরনের ডেটা, কোড ও মডেল অনলাইনে উন্মুক্ত করবে। একইসঙ্গে অন্য যে কোনো স্ক্রোল বা এসব লেখার দীর্ঘ পাতা সম্পূর্ণ পড়তে পারা প্রথম ব্যক্তি বা দলকে ১০ লাখ ডলার পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে তারা।
‘ইউনিভার্সিটি অফ কেনটাকি’র কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও এ প্রকল্পের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ব্রেন্ট সিলস বলেছেন, “কেবল এক বছর আগেও আমাদের কারো পক্ষে এমনটা বিশ্বাস করা সম্ভব ছিল না যে, শত শত কলামের লেখা সংবলিত আস্ত এক স্ক্রোল সম্পূর্ণ অক্ষত রেখে বা না খুলে এভাবে পড়া সম্ভব।
“তবে আমরা দেখিয়েছি, এমনটা সম্ভব। আমার অনুমান, এ সংগ্রহের প্রতিটি স্ক্রোল আমরা পড়তে পারব।”
উদ্ধারকৃত পাঠে নৈতিকতা, শিল্পকলা ও মানব আচরণের বিশ্লেষণ
কয়লা হয়ে যাওয়া ভঙ্গুর বিভিন্ন স্ক্রোল সামান্যতম ক্ষতি না করে খোলা একেবারে অসম্ভব। ফলে গবেষকেরা এর পরিবর্তে হাই-রেজোলিউশন স্ক্যান ও কম্পিউটেশনাল প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েছেন, যার মাধ্যমে বিভিন্ন স্ক্রোলকে ‘ভার্চুয়ালি বা ডিজিটাল উপায়ে উন্মুক্ত’ করা হয়েছে এবং প্যাপিরাসের বিভিন্ন স্তরে থাকা কালির অস্তিত্ব শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৫টি প্যাপিরাস স্ক্রোল ও স্ক্রোলের খণ্ডাংশ স্ক্যান করা হয়েছে। তবে এখনও ৬০০টিরও বেশি স্ক্রোল না খোলা অবস্থায় রয়ে গেছে।
এ ছাড়া, যে প্রাচীন ভিলা বা প্রাসাদে এগুলো মিলেছিল সেটিরও বড় অংশ এখনো খনন করা বাকি। ফলে সেখানে আরও নতুন স্ক্রোল খুঁজে পাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
হারকুলেনিয়ামের এসব প্রাচীন গ্রন্থ উন্মোচনের কাজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গবেষকদের এরইমধ্যে ১৮ লাখ ডলার পুরস্কার দিয়েছে ‘ভিসুভিয়াস চ্যালেঞ্জ।
এ প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা স্পনসর ও মার্কিন প্রযুক্তি নির্বাহী ন্যাট ফ্রিডম্যান বলেছেন, এ নতুন ধারণা আরও বড় ধরনের অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাবে।
আরও বেশি কম্পিউটিং বিশেষজ্ঞকে এ কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, “আমরা মনে করি বর্তমানে আমাদের হাতে যেসব অ্যালগরিদম রয়েছে সেগুলোর উন্নতি করা সম্ভব এবং আমরা যে কালি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করছি সেটিকেও অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে।”
বৃহস্পতিবার উপস্থাপিত নতুন এসব উপাদানের মধ্যে এপিকিউরিয়ান দার্শনিক ফিলোডেমাসের লেখা ‘অন ভাইসেস, বুক ১’ থেকে নেওয়া ৭০টি কলামের পাঠ্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
যীশু খ্রিষ্টের জন্মের দুইশো থেকে তিনশ বছর আগের এক প্রাচীন নথি থেকেও ২০টি কলাম জুড়ে প্রায় ১.৫ মিটার পাঠযোগ্য লেখা উদ্ধার করা হয়েছে, যা এখন পর্যন্ত ভার্চুয়ালি উন্মোচন করা সবচেয়ে প্রাচীন হারকুলেনিয়াম স্ক্রোল। এসব লেখাতেও নৈতিকতা, শিল্পকলা ও মানুষের আচরণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
‘ভিসুভিয়াস চ্যালেঞ্জ’-এর প্রধান প্যাপি্রোলজিস্ট ফেডেরিকা নিকোলার্ডি বলেছেন, এসব নতুন প্রযুক্তি সবকিছু বদলে দিচ্ছে।
তিনি বলেছেন, এ গবেষণার অগ্রগতি এখন বরফধসের মতো দ্রুত গতিতে বাড়ছে। গবেষকরা গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সম্পূর্ণ এক স্ক্রোল ভার্চুয়ালি খুলে ফেলেছেন, যা থেকে প্রায় ১৪০ কলামের নতুন লেখা মিলেছে। অথচ কিছুদিন আগেও তারা এসব স্ক্রোলের কেবল ১০ শতাংশ কলাম উদ্ধার করতে পেরেছিলেন।
“আক্ষরিক অর্থেই বৃহস্পতিবার মাউন্ট ভিসুভিয়াসের সামনে দাঁড়িয়ে কোনো কিছু বা বলা ভালো সবকিছুই বদলে গেছে।”