Published : 04 Jul 2026, 11:41 AM
বেশিরভাগ মানুষই এই বিশ্বাস নিয়ে বড় হন যে, কলেজ বা ইউনিভার্সিটির শিক্ষা সফল ক্যারিয়ার ও জীবনের চাবিকাঠি। তবে যখন দেখা যায়, বিশ্বে মোট বিলিয়নেয়ার সংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষ করেননি, তখন এই বিশ্বাস অনেকের কাছেই কিছুটা মিথ বলেও মনে হতে পারে।
প্রযুক্তি বিষয়ক সাইট এমএসএন-এর প্রতিবেদন থেকে এমন কিছু মানুষের কথা জেনে নেওয়া যাক যারা ডিগ্রি ছাড়াই শত শত কোটি ডলার সম্পদের মালিক হয়েছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বকে বদলেও দিয়েছেন।
বিল গেটস
নিজের মাইক্রোসফট সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পুরো মনোযোগ দেওয়ার জন্য ‘হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি’ ছেড়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সফটওয়্যার কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস।
বর্তমানে গেটসের সম্পদের পরিমাণ ১৩ হাজার পাঁচশ কোটি ডলার। একটানা ১৩ বছর বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির খেতাব ধরে রেখেছিলেন তিনি। দানবীর হিসেবে পরিচিতি রয়েছে গেটসের। বিশ্বের নানা দেশে দারিদ্র্য ও রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নিজেদের এই বিপুল পরিমাণের সম্পদ ব্যবহার করছেন গেটস ও তার সাবেক স্ত্রী মেলিন্ডা।
স্টিভ জবস
স্টিভ জবসকে ধনী বলার চেয়ে সম্ভবত শীর্ষ প্রভাবশালী বলাই যুক্তিসংগত।
কলেজের ডিগ্রি শেষ না করেও প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৭২ সালে তিনি রিড কলেজে ভর্তি হলেও মাত্র এক সেমিস্টার পর নিয়মিত পড়াশোনা ছেড়ে দেন। পরে আগ্রহের বিষয়গুলোতে অনানুষ্ঠানিকভাবে ক্লাস করতেন। এর মধ্যে ক্যালিগ্রাফির একটি কোর্স ভবিষ্যতে ম্যাকিন্টশ কম্পিউটারের টাইপোগ্রাফি নকশায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল।
১৯৭৬ সালে স্টিভ ওজনিয়াক ও রোনাল্ড ওয়েনের সঙ্গে মিলে অ্যাপল প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। তার নেতৃত্বে ম্যাকিন্টশ, আইম্যাক, আইপড, আইফোন ও আইপ্যাডের মতো পণ্য ব্যক্তিগত কম্পিউটার ও স্মার্টফোন শিল্পে বড় পরিবর্তন আনে। ১৯৮৫ সালে অ্যাপল ছাড়লেও পরে নেক্সট প্রতিষ্ঠা করেন এবং পিক্সারকে বিশ্বের অন্যতম সফল অ্যানিমেশন স্টুডিওতে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৯৭ সালে অ্যাপলে ফিরে এসে প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়াতে নেতৃত্ব দেন। ২০১১ সালে তার মৃত্যু হলেও প্রযুক্তি শিল্পে তার প্রভাব এখনো স্পষ্ট। মৃত্যুকালে তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ছিল আনুমানিক প্রায় ১০২ কোটি ডলার। বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের একজন না হলেও উদ্ভাবন, পণ্যের নকশা এবং ব্যক্তিগত কম্পিউটার ও স্মার্টফোনের বিকাশে তার অবদান প্রযুক্তি শিল্পের গতিপথ বদলে দিয়েছে।
মার্ক জাকারবার্গ
দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময়ই ‘হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি’ ছেড়েছেন ফেইসবুকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও এর মূল কোম্পানি মেটার সিইও মার্ক জাকারবার্গ। নিজের ডর্ম রুম থেকে শুরু করা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটিতে পুরোপুরি মনোনিবেশের জন্য হার্ভার্ড ছেড়েছিলেন তিনিও।

বিস্ময়করভাবে বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৭ হাজার নয়শ ৭০ কোটি ডলার। কোম্পানির প্রায় ১৩ শেয়ারের মালিক তিনি। তবে ২০১৫ সালে তিনি ও তার স্ত্রী প্রিসিলা চ্যান ঘোষণা দিয়েছিলেন, জীবদ্দশায় মেটায় থাকা তাদের ৯৯ শতাংশ শেয়ার দান করে দেবেন।
ল্যারি এলিসন
দুইবার কলেজ ছেড়ে দেওয়ার পর এবং দত্তক নেওয়া বাবার কাছ থেকে ‘তুমি কিছুই হতে পারবে না’ এমন কথা শোনার পরও বিশ্বের দ্বিতীয় বড় সফটওয়্যার কোম্পানি গড়ে তোলেন ল্যারি এলিসন। এরই মাধ্যমে শত শত কোটি ডলারের মালিক হয়ে ওঠেন।
১৯৭৭ সালে ওরাকল প্রতিষ্ঠা করা ল্যারি আজও তিনি কোম্পানিটির চেয়ারম্যান ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন। বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ ১৭ হাজার ছয়শ ৬০ কোটি ডলার।
মাইকেল ডেল
‘টেক্সাস ইউনিভার্সিটি’র ডর্ম রুম থেকে নিজের কম্পিউটার কোম্পানি শুরু করেছিলেন মাইকেল ডেল। পরে কলেজ ছেড়ে দিয়ে পুরো মনোযোগ দিয়েছিলেন ব্যবসার দিকে।
এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় পিসি উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর একটি ‘ডেল কম্পিউটার্স ইনকর্পোরেটেড। মাইকেলের সম্পদের পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার আটশ ৪০ কোটি ডলার।
জ্যাক ডরসি
কলেজ ডিগ্রির প্রয়োজনই ছিল না টুইটারের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও পেমেন্ট কোম্পানি ‘স্কয়ার’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জ্যাক ডরসির।
‘মিসৌরি ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’তে পড়াশোনা করার পর ‘নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি’তে পড়তে আসেন ডরসি। পরে টুইটার তৈরির জন্য কলেজ ছাড়েন। ২০২১ সালে টুইটার থেকে সরে আসেন ডরসি এবং বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় চারশ ২০ কোটি ডলার।
জান কৌম
২০১৪ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মোবাইল মেসেজিং পরিষেবা ফেইসবুকের কাছে প্রায় দুই হাজার দুইশো কোটি ডলার নগদ ও শেয়ারে হোয়াটসঅ্যাপকে বিক্রি করেন প্লাটফর্মটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা জান কৌম, যা ২০২৪ সালের দামে প্রায় দুই হাজার নয়শ কোটি ডলারের সমান।
‘স্যান হোসে স্টেট ইউনিভার্সিটি’ ছেড়ে আসা কৌম ২০০৭ সাল পর্যন্ত নয় বছর ইয়াহু’তে কাজ করেছেন। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ফেইসবুকের ৬০ লাখেরও বেশি শেয়ার একজন অজানা ব্যক্তির কাছে দান করেছিলেন তিনি। এরপরও বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় এক হাজার ছয়শ ১০ কোটি ডলার।
ডাস্টিন মস্কোভিটজ
‘হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি’র ডর্ম থেকে মার্ক জাকারবার্গের সঙ্গে ফেইসবুক শুরু করতে সাহায্য করা তার রুমমেট ডাস্টিন মস্কোভিটজ এখন প্রায় একশ ৭৯ কোটি ডলারের মালিক।
ইউনিভার্সিটি ও ফেইসবুক ছাড়ার পর ওয়ার্কফ্লো সফটওয়্যার কোম্পানি ‘আসানা’ প্রতিষ্ঠা করেন মস্কোভিটজ। বর্তমানে তার মোট সম্পদের বেশিরভাগই আসে তার ফেইসবুকে ২ শতাংশ শেয়ার থেকে।
ট্রাভিস কালানিক
নিজের প্রযুক্তি স্টার্টআপ ‘স্কাওর’ ও ‘রেডসউশ’-এ মনোযোগ দিতে কলেজ ছাড়েন ট্রাভিস কালানিক। তবে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত ২০০৯ সালে উবার প্রতিষ্ঠার জন্য।
২০১৭ সালে উবারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং ২০১৯ সালে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ থেকেও পদত্যাগ করেন কালানিক। উবারে নিজের ৪ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে শত কোটি ডলার আয় করেছেন। বর্তমানে ‘ক্লাউডকিচেনস’ নামের আন্তর্জাতিক এক ভার্চুয়াল রেস্তোরাঁ কোম্পানির সিইও হিসেবে কাজ করছেন কালানিক। তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় তিনশ ৬০ কোটি ডলার।
গেব নিউয়েল
‘হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি’তে পড়লেও শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা ছেড়ে দিযেছিলেন গেব নিউয়েল। ১৯৯৮ সালে ‘ভালভ কর্পোরেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় চারশ ৩০ কোটি ডলার।
বর্তমানে কোম্পানিটির সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নিউয়েল। ‘স্টিম’ নামের এক ডিজিটাল গেইম স্টোরের মাধ্যমে পিসি গেইম বিক্রিতে বড় ভূমিকা রয়েছে এ কোম্পানির, যেটি ‘ভিডিও গেইম দুনিয়ার আইটিউনস’ হিসেবে পরিচিত।
স্টিভেন স্পিলবার্গ
সাধারণ গ্রেডের কারণে তিন বারের বেলাতেও কলেজে পড়ার সুযোগ পাননি স্টিভেন স্পিলবার্গ। শেষ পর্যন্ত যখন তিনি কলেজে ভর্তির সুযোগ পান তখন ছোট এক সিনেমা তৈরির কাজে কলেজ ছেড়ে দিয়েছিলেন, যা তাকে ‘ইউনিভার্সাল’-এ কাজের সুযোগ এনে দিয়েছিল।
১৯৯৪ সালে জেফ্রি ক্যাটজেনবার্গ এবং আরও একজন কলেজ ছেড়ে দেওয়া বিলিয়নেয়ার ডেভিড গেফেনের সঙ্গে মিলে ‘ড্রিমওয়ার্কস স্টুডিওস’ প্রতিষ্ঠা করেন স্পিলবার্গ। আজ তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় চারশ ৮০ কোটি ডলার।

ওপরা উইনফ্রে
মিডিয়া দুনিয়ার বড় নাম ওপরা উইনফ্রে বর্তমানে প্রায় তিনশ কোটি ডলার সম্পদের মালিক। তবে তার সফলতার পথ মোটেই সাধারণ ছিল না। দারিদ্র্যের মধ্য থেকে উঠে আসা উইনফ্রে ‘টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি’তে পড়া শুরু করলেও ১৯ বছর বয়সে প্রথম রেডিওতে চাকরি পাওয়ার পর কলেজ ছেড়ে দেন।
তবে ১৯৮৭ সালে সমাপনী বক্তৃতার জন্য উইনফ্রেকে আমন্ত্রণ জানালে ‘টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি’তে ফিরে যান তিনি।
নিজের টিভি শো, অস্কার মনোনয়ন ও নিজের কোম্পানি থাকার পরও পড়াশোনা শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন উইনফ্রে। তার চূড়ান্ত প্রবন্ধ জমা দেওয়ার পর তাকে সেই ডিগ্রি দিয়েছিল ইউনিভার্সিটি, যার জন্য তিনি মূলত পড়াশোনা শুরু করেছিলেন এবং কেবল তখনই তিনি সেই সমাপনী বক্তৃতা দিতে রাজি হয়েছিলেন।
গৌতম আদানি
দ্বিতীয় বর্ষে পড়াকালীন ‘গুজরাট ইউনিভার্সিটি’ ছেড়ে মুম্বাই চলে যান ভবিষ্যত ভারতের ব্যবসায়ী গৌতম আদানি। প্রথমে হীরা ব্যবসায় কাজ শুরু করেন তিনি এবং পরবর্তী সময়ে নিজের কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন।
আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে কয়লা বাণিজ্য, কয়লা খনি, তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান, বন্দরের কাজ, লজিস্টিকস, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গ্যাস বিতরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নজর দিয়েছেন আদানি। বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় আট হাজার তিনশ ৪০ কোটি ডলার।