Published : 30 May 2026, 11:58 AM
পুরুষের তুলনায় নারীর চেহারাকে মানুষ বেশি আকর্ষণীয় বলে মনে করেন এবং খোদ নারীরাও অন্য নারীদের রূপের প্রশংসায় বেশি পঞ্চমুখ হন বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সৌন্দর্যের এ ধারণাগত ব্যবধান বা দৃষ্টিভঙ্গি কমতে থাকে এবং মানুষের বয়স আশির কোঠায় পৌঁছালে এ পার্থক্য প্রায় পুরোপুরি মুছে যায়- এমনটাও বলছেন গবেষকরা।
গবেষণাটি সমাজে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত ‘জেন্ডার অ্যাট্রাক্টিভনেস গ্যাপ’ বা লিঙ্গভিত্তিক সৌন্দর্যের ব্যবধানের অস্তিত্বকেই নিশ্চিত করেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যে নারীদের যে ‘উত্তম লিঙ্গ’, জার্মান ভাষায় ‘দাস শ্যোনে গেশলেখট’ বা ফরাসিতে ‘ল্য বো সেক্স’ হিসেবে বর্ণণা করা হয়েছে এ গবেষণা তারই প্রতিফলন। ইউরোপের বাইরেও বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এমন ধারণার বিস্তর উদাহরণ রয়েছে।
জার্মানির ‘ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এম্পিরিক্যাল অ্যাসথেটিকস’-এর রিসার্চ ফেলো ড. ইউজেন ওয়াসিলিভিটস্কি বলেছেন, “জোরালো এক মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা এটি এবং সব সংস্কৃতিতেই এর মিল পাওয়া যায়। অন্য সব প্রভাবক বাদ দিলেও পুরুষের চেয়ে নারীর চেহারাকে মানুষ সবসময়ই বেশি আকর্ষণীয় বলে রায় দেন।
“তবে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে, নারীরাই অন্য নারীদের সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি রেটিং বা নম্বর দিয়েছেন, আর পুরুষদের দিয়েছেন সবচেয়ে কম।”
মানুষের এ আচরণের সঙ্গে প্রাণিজগতের বেশ অমিল রয়েছে।
ভিক্টোরিয়ান আমলের প্রকৃতিবিদ ও বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইন সমগ্র প্রাণিজগত পর্যবেক্ষণের সময় দেখেছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। বন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে পুরুষদের দেহেই থাকে রাজকীয় কেশর, উজ্জ্বল রঙের মুখমণ্ডল বা চমৎকার রঙিন পালক, যেমন ময়ূর।
ডারউইনের মতে, এগুলো প্রকৃতির ‘সেক্সুয়াল সিলেকশন’ বা যৌন নির্বাচনের ফল, যেখানে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও জমকালো সাজের পুরুষ প্রাণীটিই নারী সঙ্গীকে আকৃষ্ট করে সবচেয়ে বেশি বংশবৃদ্ধি করার সুযোগ পেত। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এই সৌন্দর্যের আকর্ষণ ও মূল্যায়নের হিসাবটা একেবারেই আলাদা।
প্রাণিজগতের সাধারণ নিয়মের ক্ষেত্রে মানুষ এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ বলেও মনে করতেন ডারউইন। প্রাণীদের মতো এখানে নারী সঙ্গীর পছন্দ বিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং পুরুষরা সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত নারীকে পাওয়ার জন্য একে অপরের সঙ্গে লড়াই বা সমাজে যাদের ধন-সম্পদ ও ক্ষমতা বেশি তারাই নারী সঙ্গীকে আকৃষ্ট করতে পারতেন। মানুষের এই ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিবর্তনবাদীরা সেই সময় থেকেই বিতর্ক করে আসছেন।
ড. ওয়াসিলিভিটস্কি বলেছেন, “তৎকালীন গবেষকরা নারীদের ‘উত্তম বা সুন্দর লিঙ্গ’ হিসেবে একদম ধরেই নিয়েছিলেন এবং কোন বিবর্তনীয় নীতির কারণে এমনটা ঘটেছে তা নিয়ে নানাজন নানা তত্ত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু আদতে এ সৌন্দর্যের ব্যবধান আসলেই কতটা সত্য তা নিয়ে কখনো বাস্তব পরীক্ষা বা যাচাই করা হয়নি।”
এ সত্যটি উন্মোচনের জন্য ড. ওয়াসিলিভিটস্কি ও তার সহকর্মীরা বিশ্বের ৭৬টি দেশে পরিচালিত ৫২টি গবেষণা থেকে আকর্ষণীয় চেহারার নিয়ামক নিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ডেটাসেট তৈরি করেছেন।
এ বড় ডেটাসেটে প্রায় ৩০ হাজার মূল্যায়নকারীর দেওয়া ১৭ হাজার চেহারার ১৫ লাখের বেশি রেটিং বা স্কোর অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গবেষণার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, একজন গড়পড়তা নারীর চেহারা প্রায় ৬০ শতাংশ পুরুষের চেহারার চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হিসেবে নারীদের কাছে রেটিং পেয়েছে। সৌন্দর্যের এ ব্যবধান পশ্চিমা দেশগুলোতে বেশি স্পষ্ট।
মানুষের যৌন দৃষ্টিভঙ্গি বা ওরিয়েন্টেশনের কারণে এ ব্যবধানে সামান্য তারতম্য হলেও সব ধরনের মানুষের মধ্যেই এ প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। পুরুষ ও নারীরা যখন নিজেদের চেহারার মূল্যায়ন বা রেটিং নিজে করেছেন তখন এ সৌন্দর্যের ব্যবধানটি একবারে উধাও হয়ে গেছে।
নারীদের এগিয়ে থাকার এ প্রবণতার পেছনে আংশিকভাবে কাজ করে মুখের হাড় বা কাঠামোর লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য। সাধারণত পুরুষদের মুখমণ্ডল কিছুটা চারকোণা বা আয়তাকার আর নারীদের মুখমণ্ডল হয় গোলাকার।
গবেষণার ফলাফল বলছে, পুরুষ ও নারী উভয় পক্ষই গোলাকার চেহারাকে বেশি আকর্ষণীয় বলে মনে করেন।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী ‘প্রোসিডিংস অফ দ্য রয়াল সোসাইটি বি’-তে।
নারীদের চেহারার প্রতি এ সার্বজনীন আকর্ষণের সুনির্দিষ্ট কারণ এ গবেষণায় ব্যাখ্যা করা না হলেও ড. ওয়াসিলিভিটস্কির অনুমান, এর পেছনে কেবল সামাজিক সংস্কৃতি ছাড়া আরও গভীর কিছু রয়েছে।
“সাধারণত যখন আমরা পুরো পৃথিবী জুড়ে একই ধরনের প্রবণতা বা প্রভাব দেখতে পাই তখন তার পেছনে কেবল সাংস্কৃতিক কোনো কারণ থাকাটা কঠিন।”
হতে পারে শত-সহস্র বছরের ‘সেক্সুয়াল সিলেকশন’ নারীদের মুখের এ আকর্ষণীয় গঠন তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে ওয়াসিলিভিটস্কি সতর্ক করে বলেছেন, “আমরা আমাদের ডেটা থেকে সরাসরি এই সিদ্ধান্ত টেনে নিতে পারি না, আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।”
আরেকটি সম্ভাবনা হতে পারে, গোলাকার চেহারার প্রতি মানুষের আকর্ষণের ভিন্ন কারণ রয়েছে, সম্ভবত এ ধরনের চেহারা শিশুদের নিষ্পাপ মুখের সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়।
আমেরিকান লেখক সুসান সনট্যাগ ১৯৭২ সালে তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড অফ এইজিং’-এ যুক্তি দিয়েছিলেন, সমাজ নারীর মূল্যকে তার সৌন্দর্যের সঙ্গে ও সৌন্দর্যকে তার যৌবনের সঙ্গে তুলনা করে। কিন্তু পুরুষদের ক্ষেত্রে এমন কোনো কঠোর মানদণ্ড চাপিয়ে দেওয়া হয় না।
বর্তমান গবেষণাতেও দেখা গেছে, ১৮ বছর বয়স থেকে শুরু করে বয়স যত বাড়তে থাকে পুরুষের তুলনায় নারীর চেহারার প্রতি মানুষের এই বাড়তি আকর্ষণ ততটাই কমতে থাকে। অবশেষে ৮০ বছর বয়সে গিয়ে এই ব্যবধান একবারে শূন্যে নেমে আসে।
ড. ওয়াসিলিভিটস্কি বলেছেন, “মুখের বয়স যত বাড়ে পুরুষ ও নারীর চেহারার আকর্ষণীয়তার মধ্যকার ব্যবধানটি ততটাই ফিকে হয়ে আসে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষ ও নারীর মুখের গাঠনিক বিভিন্ন পার্থক্য সংকুচিত হয়ে প্রায় একই রকম হতে শুরু করে। আর সম্ভবত এ কারণেই রূপের সেই ব্যবধানটি একসময় পুরোপুরি হারিয়ে যায়।”