Published : 17 Apr 2026, 11:35 AM
প্রতিবেশী দেশে ব্যাপক সংক্রমণ আর জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই ম্যালেরিয়া নির্মূলের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে একটি দেশ। ওষুধ প্রতিরোধী মশা আর সীমান্ত দিয়ে আসা অনিয়ন্ত্রিত সংক্রমণ রুখতে অভিনব কৌশল নিয়েছে আফ্রিকার দক্ষিণের একটি দেশ।
শত বাধার পরও দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ ইসোয়াতিনি এখন সম্পূর্ণ ম্যালেরিয়ামুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। সেই লক্ষ্যে ফ্রিজারে টিউবের ভেতরে করে গরুর রক্ত ব্যবহার করছে তারা। মশার কলোনিকে খাওয়ানোর জন্য বরফ জমাট এ রক্ত গলিয়ে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান প্রতিবেদনে লিখেছে, দেশটির সিফোফেনেনি শহরের এক সাধারণ ভবনে তৈরি হয়েছে ‘ন্যাশনাল ইনসেক্টারি’ বা জাতীয় পতঙ্গাগার। সেখানকার মশাগুলোর দেখভাল করেন নমবুসো প্রিন্সেস ভেম্বি।
ম্যালেরিয়া নির্মূলের লড়াইয়ে থাকা দেশটির এই কর্মী বলেছেন, “রক্ত দেওয়ার জন্য চাইলে আপনি নিজের হাতও ব্যবহার করতে পারেন।”
সাবেক সোয়াজিল্যান্ড বা বর্তমানে ইসোয়াতিনি নামে পরিচিত ১২ লাখ মানুষের এ দেশ এখন নানামুখী সমস্যার মুখে রয়েছে। ম্যালেরিয়া দূর করার পথে জলবায়ু পরিবর্তন, বিদেশি সহায়তায় কাটছাঁট ও মশা নিধনের ওষুধের বিরুদ্ধে মশার প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তোলার মতো চ্যালেঞ্জ যেমন আছে তেমনই পার্শ্ববর্তী দেশগুলো যেখানে ম্যালেরিয়া বেশি সেখান থেকে আসা অভিবাসীদের মাধ্যমে নতুন করে সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে।
২০২৪ সালে ইসোয়াতিনিতে কেবল ৩৬২ জন ম্যালেরিয়া রোগী শনাক্ত হয়েছিল। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ মোজাম্বিকে এই সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৬ লাখ, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ সংক্রমণের তালিকায় রয়েছে। অন্যদিকে প্রতিবেশী দক্ষিণ আফ্রিকায় ৪ হাজার ৬৩৯ জন রোগী পাওয়া গেছে।
অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে যাতায়াত করা মানুষের রক্তের মাধ্যমে ম্যালেরিয়ার পরজীবী খুব সহজেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, যা মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
ম্যালেরিয়ার মৌসুম এখন আরও দীর্ঘ হচ্ছে, যা ঠিক আখ কাটার সময়ের সঙ্গে মিলে যায়। এ সময় শ্রমিকরা দীর্ঘ সময় মাঠে কাজ করেন।
গবেষণাগারে বসে ভেম্বি বলেছেন, মশা ধরার জন্য তাদের দল প্রতিদিন বিভিন্ন ‘সেন্টিনেল সাইট’ বা নজরদারি কেন্দ্রে ফাঁদ পাতে। সেখান থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন মশা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে পরীক্ষা করা হয়। মশার গায়ের রং ও ডানার ধরন দেখে এদের প্রজাতি চেনা যায়। বর্তমানে ব্যবহৃত মশা মারার ওষুধগুলো কতটা কার্যকর তা পরীক্ষা করতেও কিছু মশা ব্যবহৃত হয়।
“সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি।”
তিনি বলেছেন, আগে যেসব এলাকায় ম্যালেরিয়া ছড়ানোর মতো মশা ছিল না তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে এখন সেখানেও সেসব প্রজাতির মশা পাওয়া যাচ্ছে।
ইসোয়াতিনির ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির একটি দল উত্তরের হোহো অঞ্চলে একজন রোগীকে দেখতে এসেছে। গত সপ্তাহ থেকে অসুস্থ বোধ করছিলেন তিনি। ওই নারী বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন এবং তার শরীরে কাঁপুনি ছিল। প্যারাসিটামল খেয়ে একদিনের মতো মাথাব্যথা কম থাকলেও দ্রুতই তার অবস্থার অবনতি হয়। স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পরীক্ষার পর তার ম্যালেরিয়া ধরা পড়ে।
পরীক্ষার ফল আসার সঙ্গে সঙ্গেই জাতীয় ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ দলের কাছে একটি ফোন অ্যালার্ট বা সতর্কবার্তা চলে যায়। আজ ওই এলাকায় লিফলেট, ম্যালেরিয়া পরীক্ষার কিট ও মশা মারার স্প্রে নিয়ে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। বর্তমানে ওই নারী সুস্থ হয়ে উঠছেন।

প্রধান ম্যালেরিয়া নজরদারি কর্মকর্তা নমসেবো দ্লামিনি বলেছেন, কয়েক সপ্তাহ পর যখন অনেক মানুষ আক্রান্ত হবে তখন ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে এখনই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া বেশি কার্যকর।
“আপনি যখনই মনে করবেন, আমরা ম্যালেরিয়া নির্মূলের একদম কাছাকাছি পৌঁছে গেছি তখনই এমন কিছু ঘটে, যা সব হিসেব ওলটপালট করে দেয়। যেমন চরম আবহাওয়া, যা মশার বংশবিস্তারের হার বাড়িয়ে দেয় বা মানুষের খুব কাছেই মশার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করে।”
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেছেন, বন্যার ফলে হঠাৎ করেই আশপাশের নিচু জায়গাগুলো ডোবায় পরিণত হয় এবং সেখানে পানি জমে থাকে। ফলে মশার বিভিন্ন প্রজনন ক্ষেত্র মানুষের বসতির আরও কাছে চলে আসে।
“কাজটি কঠিন, তবে আমাদের যা সম্পদ আছে তা দিয়েই আমরা এই চ্যালেঞ্জ ঠেকাতে প্রস্তুত।”
তবে, এ এলাকায় গত প্রায় চার বছর ম্যালেরিয়ার কোনো রোগী ছিল না।
দ্লামিনি বলেছেন, “আমার জানামতে কাছের কোনো রোগী হয়ত দুই-তিন কিলোমিটার দূরে ছিল। ফলে এ এলাকাটি এখন আমাদের বিশেষ তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু। আমরা বোঝার চেষ্টা করছি, হঠাৎ করে কোথা থেকে এখানে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ল।”
ম্যালেরিয়া ঋতুভিত্তিক রোগ।
দ্লামিনি বলেছেন, সংক্রমণের সবচেয়ে খারাপ মাসগুলোতে তারা প্রায় ৫০ জন রোগী দেখেন। তবে অগাস্ট ও সেপ্টেম্বরের মতো শুষ্ক সময়ে তা কমে কেবল ৩ জনে দাঁড়ায়। এখন ম্যালেরিয়ার মৌসুম আগের চেয়ে দীর্ঘ হচ্ছে। আগে মার্চের দিকে সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকত। তবে এখন মে মাসের ফসল কাটার সময় পর্যন্ত অনেক রোগী পাওয়া যাচ্ছে।
এ অঞ্চলে বেশ কিছু খামারে গাঁজার অবৈধ চাষ হয়। এসব খামারে মোজাম্বিক থেকে আসা শ্রমিকরা কাজ করেন। তারা অনেক কম মজুরিতে কাজ করতে রাজি হন।
ম্যালেরিয়ার পরজীবী বহনকারী কোনো শ্রমিককে যদি মশা কামড়ায় তবে সেই মশা অন্যদের কামড়েও রোগটি ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে নির্দিষ্ট এলাকায় অনেক মানুষ একসঙ্গে আক্রান্ত হন।
চাষি ও শ্রমিকরা অনেক সময় স্বাস্থ্য ক্লিনিক বা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ভয় পান। তারা অনেক সময় মাঠ পাহারা দেওয়ার জন্য মশারি ছাড়াই বাইরে ঘুমান, অথচ ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে মশারি প্রধান হাতিয়ার।
দ্লামিনি বলেছেন, “প্রতিবারই আমাদের সামনে নতুন নতুন সমস্যা হাজির হচ্ছে। আর সেগুলো ঠেকাতে আমাদের নতুন নতুন কৌশল তৈরি করতে হচ্ছে।”
ম্যালেরিয়া নজরদারি দলটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরামর্শ ও পরীক্ষার সুবিধা দিচ্ছে। তারা বাড়ির মালিকদের দেখিয়ে দিচ্ছেন কোথায় মশা বংশবিস্তার করতে পারে, যেমন উল্টে না রাখা ট্রলি, যেখানে সহজেই পানি জমে।
ম্যালেরিয়ার মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই এখানকার বাড়িগুলোতে মশা মারার ওষুধ স্প্রে করা হয়েছিল। তবে সেই রাসায়নিকের কার্যকারিতা থাকে কেবল তিন মাস।
যেহেতু এখানে এখন একজন ম্যালেরিয়া রোগী মিলেছে। ফলে বাসিন্দাদের ঘরের আসবাবপত্র দেয়াল থেকে সরিয়ে রাখতে বলা হয়েছে, যাতে দেয়ালের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত নতুন করে কীটনাশক ছিটানো যায়।
স্প্রে করার কাজটি ঠিকমতো হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করতে ল্যাবরেটরি থেকে আনা মশা দেয়ালের নির্দিষ্ট অংশে রেখে পরীক্ষা করা হয়।
ইসোয়াতিনির ম্যালেরিয়া কর্মসূচিতে অর্থায়ন করে এইডস, যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে গঠিত ‘গ্লোবাল ফান্ড’। সংগঠনটির অনুদান ব্যবস্থাপনা প্রধান মার্ক এডিংটন বলেছেন, ম্যালেরিয়া নির্মূল করা প্রত্যাশার চেয়েও কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশ্বে টানা ছয় বছর ধরে ম্যালেরিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
যার মধ্যে বিদেশি সহায়তায় কাটছাঁট বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দাতারা তাদের প্রতিশ্রুতি অনুসারে অর্থ না দেওয়ায় গত বছর ‘গ্লোবাল ফান্ড’কে নিজেদের অনুদান থেকে প্রায় ১৪০ কোটি ডলার কাটছাঁট করতে হয়েছে।
এডিংটন বলেছেন, “আপনি যদি কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে দেখেন, যেমন আমাদের ও সম্ভবত আমেরিকার পক্ষ থেকে ম্যালেরিয়া তহবিলে অর্থায়ন কমেছে; ওষুধ ও কীটনাশকের বিরুদ্ধে মশার প্রতিরোধ সক্ষমতা বেড়েছে; জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও চরম আবহাওয়ার ঘন ঘন পরিবর্তন এসব মিলিয়ে ফলাফল মোটেও ভালো নয়। পরিস্থিতি সত্যিই উদ্বেগজনক।”
ইসোয়াতিনির কর্মকর্তাদের মতে, সহায়তায় কাটছাঁটের ফলে ম্যালেরিয়া সেবায় সামান্য প্রভাব পড়েছে, বিশেষ করে কর্মীদের প্রশিক্ষণের সুযোগ কিছুটা কমেছে।
দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী মদুডুজি মাৎসেবুলা আশা করছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু হলে স্বাস্থ্য নজরদারি আরও সহজ হবে। সরকার ভ্রমণ নথিপত্র ও পাসপোর্ট পাওয়া আরও সহজ করার চেষ্টা করছে, যাতে মানুষ অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি না দেন। কারণ, অবৈধভাবে যাতায়াত করলে রোগ ছড়ানোর বিষয়টি ট্র্যাক করা কঠিন হয়ে পড়ে।
“আমাদের লক্ষ্য ম্যালেরিয়া পুরোপুরি নির্মূল করা এবং এমনটি করতে আমরা সম্ভাব্য সব পথ অবলম্বন করব। আমরা এ বিষয়ে খুবই আশাবাদী ও বিশ্বাস করি, এতে সাফল্য অর্জন সম্ভব।”