Published : 23 Nov 2025, 06:58 PM
প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম রোমাঞ্চকর শিল্প স্থাপনা দ্বিতীয় বৃহত্তম জলপাই তেলের মিলের খোঁজ পাওয়া গেছে মধ্য তিউনিসিয়ার কাসেরিন অঞ্চলে।
আবিষ্কারটি আন্তর্জাতিক এক প্রকল্পের অংশ, যার সম্মিলিতভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছে ‘কা’ ফোসকারি ইউনিভার্সিটি অফ ভেনিস’, তিউনিসিয়া ও স্পেনের বিভিন্ন গবেষণা দল।
এ খননকাজটি প্রাচীন রোমান বসতি ‘সিলিয়াম’কে কেন্দ্র করে চলছে, যা আলজেরিয়ার সীমার কাছে অবস্থিত ও এক সময় কৃষি ও সমৃদ্ধ বাণিজ্যের জন্য পরিচিত ছিল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
এ অঞ্চলটি জেবেল সেমমামা পর্বতমালার মধ্যে অবস্থিত। এখানে ভূদৃশ্য মূলত উচ্চ সমভূমির মাধ্যমে গঠিত, শীতকালে খুব ঠাণ্ডা হয়, গ্রীষ্মকালে খুব গরম থাকে, ও বৃষ্টিপাত খুবই কম।
এ পরিবেশ জলপাই গাছের জন্য উপযোগী ছিল, যা রোমান উত্তর আফ্রিকার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রোমে জলপাই তেলের প্রধান সরবরাহকারীদের মধ্যে একটি ছিল তিউনিসিয়া।
এ সীমান্ত এলাকা এক সময় স্থানীয় নুমিডিয়ান সম্প্রদায়ে ‘মুসুলামি’ নামে পরিচিত ছিল, যা ধীরে ধীরে রোমান কর্মকর্তা, সাবেক সেনা ও স্থানীয় মানুষদের সম্মিলিত বাণিজ্যের ও বসবাসের স্থান হয়ে ওঠে।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলছেন, এখানে অনেক স্থাপনা খ্রিস্টীয় তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত কার্যকর ছিল।
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান হচ্ছে হেনচির এল বেগার, যা প্রাচীন ‘সলটুস বেগুয়েন্সিস’ নামে পরিচিত। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে একজন উচ্চপদস্থ রোমান কর্মকর্তা লুসিলিয়াস আফ্রিকানাসের মালিকানাধীন বড় এক গ্রামীণ সম্পত্তির অংশ ছিল এ জায়গাটি।
এ স্থানে লাতিন ভাষার খোদাই করা বিখ্যাত এক শিলালিপি মিলেছে, যা খ্রিস্টীয় ১৩৮ সালে রোমান সেনেট একটি বাজার অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা লেখা রয়েছে। বাজারটি প্রতি দুই মাসে বসত। এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, বাণিজ্য ও সামাজিক জীবনের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল অঞ্চলটি।
বসতিটি প্রায় ৩৩ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং ‘এইচআর বেগার ১’ ও ‘এইচআর বেগার ২’ নামে দুটি প্রধান অঞ্চলে বিভক্ত।
উভয় অঞ্চলে জলপাই চূর্ণ করা যন্ত্র, সিস্টার্ন ও বড় আকারের এক জলাধার রয়েছে। ‘এইচআর বেগার ১’-এ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারটি মিলেছে, যা তিউনিসিয়ার সবচেয়ে বড় রোমান জলপাই তেলের মিল। বারোটি বিশাল বিম প্রেস দিয়ে সাজানো মিলটি।
‘এইচআর বেগার ২’ নামের মিলটির মধ্যে রয়েছে আটটি প্রেস। এর আকার ও সংখ্যা থেকে ইঙ্গিত মেলে, এ অঞ্চলে জলপাই তেল উৎপাদন কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ ছাড়া এখানে গ্রামীণ এক গ্রামের অবশিষ্টাংশ মিলেছে, যেখানে সম্ভবত কৃষক ও স্থানীয়রা বসবাস করতেন। পাথরের চূর্ণযন্ত্র দেখা মেলায় ধারণা করা হচ্ছে, এ অঞ্চলে জলপাই তেল ছাড়া অন্য শস্যও উৎপাদিত হত।
সাম্প্রতিক ‘গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং’ বা ভূমি-ভেদকারী রেডার জরিপে মাটির নিচে ঘর, রাস্তা ও কর্মক্ষেত্রের ঘন নেটওয়ার্কের দেখা মেলে, যা প্রমাণ করে এ অঞ্চলটি অত্যন্ত সংগঠিত গ্রামীণ বসতি ছিল।
২০২৩ সালে শুরু হওয়া ও ২০২৫ সালে সম্প্রসারিত এই প্রকল্পে তিউনিসিয়া, স্পেন ও ইতালির বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে মিলে খতিয়ে দেখেছেন, প্রাচীন বিভিন্ন সমাজ কীভাবে অপরিহার্য পণ্য, যেমন তেল, উৎপাদন করতেন।
এ স্থান থেকে পরবর্তী সময়ের ছোট আবিষ্কারও পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা, যার মধ্যে বাইজেন্টাইন যুগ ও আধুনিক সময়ের নিদর্শন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সজ্জিত তামা ও পিতলের ব্রেসলেট, চুনাপাথরের প্রক্ষেপণাস্ত্র ও পরে নির্মিত ভবনে পুনরায় ব্যবহৃত রোমান স্থাপত্য উপাদানের খণ্ডাংশ।
‘কা’ ফোসকারি ইউনিভার্সিটি অফ ভেনিস’-এর অধ্যাপক লুইজি স্পের্টি বলেছেন, রোমান আফ্রিকায় কৃষি, বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবন কীভাবে সংগঠিত হয়েছিল তা বোঝার বিরল এক সুযোগ করে দিয়েছে এ গবেষণা। জলপাই তেল রোমান জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। কেবল রান্নার জন্য নয়, গোসল, খেলাধুলা, চিকিৎসা ও বাতি জ্বালানোর জন্যও তা ব্যবহৃত হত।