Published : 08 Oct 2024, 12:17 AM
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সক্ষমতা বাড়ানোসহ পুঁজিবাজারের সার্বিক সংস্কারে পাঁচ সদস্যের টাক্সফোর্স গঠন করা হয়েছে।
'পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্স' নামে এ সংস্কার উদ্যোগে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। টাস্কফোর্সের অধীনে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ‘ফোকাস গ্রুপ’ গঠন করা যাবে, যেটি পুঁজিবাজারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারবে।
সোমবার এক বিজ্ঞপ্তিতে টাস্কফোর্স গঠনের কথা জানিয়ে এর সদস্য তালিকা ও কর্মপরিধি তুলে ধরেছে বিএসইসি।
সদস্য হিসেবে রয়েছেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এ এম মাজেদুর রহমান, নিরীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান হুদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোং এর অংশীদার এ এফ নেসারউদ্দীন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়(বুয়েট) এর অধ্যাপক মোস্তফা আকবর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল-আমিনকে।
গত ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণ আন্দোলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যান। ৮ অগাস্ট সন্ধ্যায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ নেয় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে।
দায়িত্ব নিয়েই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আর্থিক খাতসহ বিভিন্ন খাতের সংস্কারের ঘোষণা দেয়। ইতোমধ্যে পাঁচটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে সরকার। যার মধ্যে আর্থিক খাতের ব্যাংক থাকলেও পুঁজিবাজার সংস্কারের উদ্যোগ ছিল না। এবার পুঁজিবাজার সংস্কারেরও উদ্যোগ নিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বিএসইসির সক্ষমতা বাড়ানো, মার্জিন ঋণ নীতিমালা, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব আবেদন (আইপিও) প্রক্রিয়া, ব্যাংকের বদলে পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়ন বাড়াতে আর্থিক খাতের নীতিমালা সংশোধন, পুঁজিবাজার উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ নির্ধারণের মত বিষয়ে পরামর্শ দিবে এই টাস্কফোর্স।
টাস্কফোর্সের কাজ কী
বিএসইসি বলছে, পুঁজিবাজারের সার্বিক উন্নয়ন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানে পুঁজিবাজারের সুশাসন নিশ্চিত করা তাদের লক্ষ্য।
সাচিবিক সুবিধা বিএসইসি দিবে জানিয়ে টাস্কফোর্সের একটি কর্মপরিধি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এর বাইরেও প্রয়োজনমাফিক প্রস্তাবনাও দিতে পারবে টাস্কফোর্স।
>> সুপারিশ প্রদানসহ অন্যান্য বিষয়াদি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের নিকট হস্তান্তর করবে।
>> টাস্কফোর্সের কার্যালয় টাস্কফোর্সের সুপারিশের ভিত্তিতে বিএসইসি কর্তৃক নির্ধারিত হবে।
>> বিএসইসিসহ পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান যেমন- ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএল, সিসিবিএলসহ বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং অন্যান্য পক্ষসমূহ টাস্কফোর্সের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সরবরাহসহ সকল ধরনের সহযোগিতা প্রদান করবে।
>> ফোকাস গ্রুপ গঠন: টাস্কফোর্সের অধীনে বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক ফোকাস গ্রুপ থাকবে। প্রতিটি ফোকাস গ্রুপ নির্দিষ্ট বিষয়ে কাজ করবে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে টাস্কফোর্সকে সুপারিশ প্রদান করবে। উল্লেখ্য, কমিশনকে অবহিত করে টাস্কফোর্স উপযুক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ফোকাস গ্রুপ গঠন করবে।
>> বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের আকার তথা 'জিডিপি ও বাজার মূলধন' এর অনুপাত কম হওয়ার প্রধান কারণগুলো চিহ্নিত করে উত্তরণের জন্য সরকারের আর্থিক খাতের নীতি প্রণয়নের প্রস্তাবনা।
>> দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নের জন্য সরকারের আর্থিক নীতি প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কমিশনের উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য সুপারিশ প্রণয়ন করা।
>> আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পুঁজিবাজারের সুশাসন উন্নীতকরণের লক্ষ্যে পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি এবং প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণ করা ও সমাধানের সুপারিশমালা প্রণয়ণ।
>> বিএসইসির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ, অভ্যন্তরীণ সুশাসন, অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে প্রযুক্তি ও অটোমেশনের প্রয়োগ, তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অন্যান্য উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামোর সুপারিশ, মানব সম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধি, কমিশনের কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, সেমিনার, কর্মশালায় অংশগ্রহণসহ অভ্যন্তরীণ অন্যান্য বিষয়ে সুপারিশ প্রদান।
>> ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএল, সিসিবিএল এর তদারকি কার্যক্রম বিশ্বমানে উন্নীতকরণসহ উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে যুগোপযোগীকরণের সুপারিশ প্রণয়ন।
>> প্রাইভেট প্লেসমেন্ট/অফার এর মাধ্যমে ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ ইস্যু সংক্রান্ত সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ইস্যু অব ক্যাপিটাল) রুলস, ২০০১ যুগোপযোগীকরণের সুপারিশ প্রণয়ন।
>> তালিকাভুক্ত কোম্পানির স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, করপোরেট ডিজক্লোজার, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের সঠিকতা নিশ্চিতকরণসহ করপোরেট গভর্ন্যান্স, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং বাজারের গভীরতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন।
>> ডেট ও ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ ইস্যুর আবেদনের ক্ষেত্রে দাখিলকৃত তথ্য-উপাত্ত, দলিল-দস্তাবেজ, সম্পদ পুনঃমূল্যায়ন প্রতিবেদন, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে প্রস্তুতকারী পক্ষসমূহ যেমন- ইস্যুয়ার কোম্পানি, ইস্যু ম্যানেজার ও আন্ডার রাইটার (মার্চেন্ট ব্যাংকার), ভেল্যুয়ার এবং অডিটরসহ অন্যান্য পক্ষসমূহের দায়দায়িত্ব ও সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিষয়ে সুপারিশ প্রণয়ন।
>> বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিধিমালা যেমন- সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্চেন্ট ব্যাংকার ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার) বিধিমালা, ১৯৯৬, সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক- ডিলার, স্টক-ব্রোকার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি) বিধিমালা, ২০০০, সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (মিউচ্যুয়াল ফান্ড) বিধিমালা, ২০০১-সহ সংশ্লিষ্ট বিধিমালা যুগোপযোগীকরণের সুপারিশ প্রণয়ন।
>> ডেট ও ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ ইস্যু সংক্রান্ত বিধিবিধানের যেমন- বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক ইস্যু) রুলস ২০১৫, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (রাইট ইস্যু) রুলস, ২০০৬, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ডেট সিকিউরিটিজ), রুলস ২০২১, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ইনভেস্টমেন্ট সুকুক), রুলস ২০১৯, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সম্পদ ভিত্তিক সিকিউরিটি ইস্যু) বিধিমালা, ২০০৪-সহ সংশ্লিষ্ট বিধিমালা যুগোপযোগীকরণের সুপারিশ প্রণয়ন।
>> বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও আস্থা বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শ ও সমন্বয়ের গাইডলাইন ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন।
>> বাজারে কারসাজি, সুবিধাভোগী ব্যবসায় লেনদেন ও অন্যান্য অনিয়মের বিচার ও জরিমানায় সমতা আনয়নের জন্য বিদ্যমান আইনের শাস্তির ধারার অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট পেনাল কোড বা শান্তির বিধিমালা প্রণয়ন করা।
>> মার্জিন রুলস, ১৯৯৯ যুগোপযোগীকরণসহ, বিদ্যমান ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশল এবং আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও বিজনেস ইন্টেলিজেন্স মডিউল সমৃদ্ধ বিশ্বমানের অনলাইন ও অফলাইন সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম বা বাজার তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিরূপণ ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ প্রণয়ন।
>> বর্তমান বাজার কাঠামোর মূল্যায়ন, বাজারের গভীরতা, তারল্য ও পণ্য বৈচিত্র্যকে বিবেচনাপূর্বক দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কীভাবে আরও আকৃষ্ট করা যায় সেই কৌশল প্রণয়নে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান।
>> পুঁজিবাজারের কার্যক্রমে অটোমেশন বৃদ্ধির মাধ্যমে পুঁজিবাজারের সুশাসন এবং বিনিযোগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও উন্নয়ন এবং পুঁজিবাজার উপযোগী ফিনটেক টেকনোলজি প্রচলন এবং পুঁজিবাজারের প্রযুক্তিগত সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নিয়ে সাইবার সিকিউরিটি নিশ্চিত করার জন্য সুপারিশ প্রণয়ন।
>> নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর (বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, আইডিআরএ, এমআরএ, এনবিআর, আরজেএসসি ইত্যাদি) সঙ্গে সমন্বয় সাধনের উপায় নির্ধারণে একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং পদ্ধতি, এসওপি বা নির্দেশিকা প্রণয়ন।
>> তালিকাভুক্ত কোম্পানির সঙ্গে অতালিকাভুক্ত কোম্পানি বা তালিকাভুক্ত কোম্পানির মার্জার, অ্যামালগামেশন, একুইজেশনের মাধ্যমে কোনো শেয়ার ইস্যু সংক্রান্ত বিষয়ে হাই কোর্টে এ সংক্রান্ত স্কিম অনুমোদনের পূর্বে বিএসইসি হতে অনাপত্তিপত্র গ্রহণ বিষয়ে সুপারিশমালা প্রণয়ন।