Published : 20 Jul 2026, 11:11 AM
সংবাদ সম্মেলনে কথা বলতে বলতে বেশ কবারই গলা ধরে এলো লিওনেল স্কালোনি। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল জল। এক পর্যায়ে তো আর নিজেকে ধরেই রাখতে পারলেন না। কান্নার দমকে কথা বলতে না পেরে চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলেন। সংবাদকর্মীরা তুমুল করতালিতে বিদায়ী অভিবাদন জানালেন তাকে। এর আগেই অবশ্য আর্জেন্টিনা কোচ বলে গেলেন, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে চূড়ান্ত করবেন দায়িত্বের ভবিষ্যৎ।
বিশ্বকাপের ফাইনালে মাঠের ফুটবলে যেমন অচেনা ছিল আর্জেন্টিনা, তেমনি ডাগআউটের সামনে চেনা যাচ্ছিল না স্কালোনিকেও। এমনিতে তিনি খুবই স্থিতধী ও ধীরস্থির। হতাশা ও উচ্ছ্বাস, কোনোকিছুর প্রকাশ তার তীব্র নয়। কিন্তু এই ম্যাচে তাকে উত্তেজিত হতে দেখা গেছে বারবার। মেজাজ হারিয়েছেন, চিৎবার করেছেন। এক পর্যায়ে হলুদ কার্ডও দেখেছেন।
ম্যাচের পর অবশ্য বেশ শান্তই হয়ে যান তিনি। চার বছর আগের স্বপ্নময় সময়টা আর ফিরে আসেনি, বরং হৃদয় ভাঙার যন্ত্রণায় দুমড়েমুচড়ে গেছেন। ভাঙা মন নিয়েই সংবাদ সম্মেলনে শোনালেন ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের ভাবনা
“ফেডারেশনের সভাপতির সঙ্গে কথা বলব। আমি কী করতে চাই, সে সম্পর্কে আমার একটি ধারণা আছে। অবশ্যই চুক্তির মেয়াদ শেষ করব। পাশাপাশি আমার মনে হচ্ছে, বিষয়টি নিয়ে ভাবা দরকার, কারণ আমি জানি না, এত বড় কিছু (আবার) করা সম্ভব হবে কি না এবং সম্ভবত আমাদের এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।
প্রেসিডেন্টের কাছে আমি কৃতজ্ঞ যে, তিনি আমাকে এই সুযোগ করে দিয়েছেন, যে কারণে এখন এই অবস্থানে আছি। সেই মুহূর্তে, এটি ছিল সবার জন্য স্বপ্নের জায়গা। আমরা, স্টাফ ও ফুটবলাররা, একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এখন আমার মনে হয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভালোভাবে চিন্তা করার জন্য কিছুটা সময় নেওয়াটাই ন্যায্য।”
২০১৮ বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে আর্জেন্টিনা ছিটকে পড়ার পর স্কালোনিকে ওই বছরের জন্য ভারপ্রাপ্ত কোচ করা হয়। ২০০৬ বিশ্বকাপে খেলা এই সাবেক ফুটবলার তখনও পর্যন্ত কোচ হিসেবে ছিলেন একদম আনকোরা ও অপরিচিত। আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-২০ দলের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
ওই বছরের শেষ নাগাদ তার মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০১৯ কোপা আমেরিকা পর্যন্ত। অনভিজ্ঞ একজনকে দায়িত্ব দেওয়ায় তুমুল সমালোচনায় হয় আর্জেন্টিনার ফুটবল মহলে। ‘অযোগ্য’ কোচ নিয়োগের জন্য ফুটবল কর্তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েগো মারাদোনা বলেছিলেন, “এই লোক এমনকি ট্র্যাফিকও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।”
২০১৯ কোপা আমেরিকায় ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হওয়ার পর আবার সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। তার পরও ২০২২ বিশ্বকাপ পর্যন্ত তার মেয়াদ বাড়ানো হয়।
এরপর কেবলই অবারিত সাফল্যের সময়। ২৮ বছরের খরা কাটিয়ে ২০২১ কোপা আমেরিকা জয় করে আর্জেন্টিনা। ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে জিতে নেয় ২০২২ বিশ্বকাপ। মেয়াদ বাড়ানো হয় তার। সাফল্যের পরিধিও বাড়ে। কোপা আমেরিকার ট্রফি ধরে রাখে তার দল ২০২৪ আসরে।
বিশ্বকাপেও ট্রফি ধরে রাখা থেকে একটি জয় দূরে ছিল স্কালোনির দল। কিন্তু মুখ থুবড়ে পড়তে হলো দুয়ারে এসে।
তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে আগামী ডিসেম্বরে। যদি আর চালিয়ে না যান, তবুও আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সফলতম কোচ তিনিই। কার্লোস বিলার্দোর কোচিংয়ে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন ও ১৯৯০ আসরে রানার্স আপ হয় আর্জেন্টিনা। তবে কোপা আমেরিকা এগিয়ে রাখছে স্কালোনিকে।
স্কালোনি যদি দায়িত্বে রয়ে যান, নতুন করে দল সাজানোয় মন দিতে হবে তাকে। আর্জেন্টিনার গত ৫ বছরের সাফল্যের মূল নায়ক লিওনেল মেসির বয়স পেরিয়েছে ৩৯। তার খেলা চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সামান্যই। ২০২২ এবং ২০২৬ সালের উভয় ফাইনালেই আর্জেন্টিনার একাদশে ছিলেন আটজন। বয়স থাবা দিয়েছে তাদের অনেকের ক্যারিয়ারেই। দলে তাই বড় পরিবর্তন তাই নিশ্চিতভাবেই আসবে।
সেই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার আগে নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া জরুরি মনে করছেন স্কালোনি।
“আমি কখনো কল্পনাও করিনি, আমার স্টাফসহ আমরা কখনও ভাবতে পারিনি যে, এমন একটি জায়গায় এসে পৌঁছাব। সামনে চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক কিছুর প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে মনকে নতুন করে সাজানো, পুনরায় শুরু করা…।
এরকম একটি দল আবার তৈরি করা খুব কঠিন, পুনরায় তৈরি করা সম্ভব নয়। সত্যিই বেদনাদায়ক। আমি খুবই দুঃখিত…।”
এটুকু বলেই কান্নাভেজা চোখে সংবাদ সম্মেলন কক্ষ ছেড়ে যান স্কালোনি। তবে সমর্থকদের প্রতি ভালোবাসা জানান তিনি আগেই।
“আমরা আমাদের সকল সমর্থকের কাছে খুবই কৃতজ্ঞ। সেই সমস্ত মানুষদের ধন্যবাদ, যারা আমাদেরকে সেই প্রাণশক্তি জুগিয়েছেন, যার অভাব আমাদের ছিল। ম্যাচটি যখন খুবই উন্মুক্ত ছিল, তখনও আমরা লড়াই চালিয়ে গেছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি।
“জয়টা তাদেরই প্রাপ্য ছিল। এটাই বাস্তবতা। আমাদের তা মেনে নিতে হবে। কিন্তু সত্যি বলতে, আমরা জয়ের খুব কাছাকাছি ছিলাম। আমি আমার খেলোয়াড়দের এবং সেই সমস্ত মানুষকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, যারা আমাদের আরও একটি বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছাতে দারুণভাবে সাহায্য করেছেন।”